এইচএম এরশাদের মৃত্যু : বিভিন্ন মহলের মূল্যায়ন

সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের মৃত্যু : বিভিন্ন মহলের মূল্যায়ন

সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের মৃত্যু : বিভিন্ন মহলের মূল্যায়ন

পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। আজ (রোববার) সকাল পৌণে আটটার দিকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন সাবেক এ সামরিক শাসক। ৪ জুলাই থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। মৃত্যুকালে এরশাদের বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা এইচএম এরশাদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের শীর্ষ নেতারা শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন দিকে তার ভূমিকা নিয়ে রয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর, ক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠনের মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তিনি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এরশাদ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জোটগত রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন সাবেক এ সেনাশাসক।

এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, প্রকৃতির নিয়মে সাবেক সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ মারা গেলেও তার অপশাসনের ভূত বর্তমান শাসকদের অনেকদিন বয়ে বেড়াতে হবে। তার কেনাবেচার রাজনীতি, দল ভাঙার রাজনীতি, রাষ্ট্র প্রশাসনে সামরিকীকরণের যে প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র প্রধানের চারিত্রিক ও নৈতিক পতনের যে নজির, তার মাশুল জনগণকে দিতে হবে। আর আজকের যে সর্বগ্রাসি দুর্নীতি, তার সূত্রপাত এরশাদের শাসনামলে। পরবর্তী তিন দশকে তা ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে, সেখানেও তার ভূমিকা আছে। তাই এরশাদের মৃত্যু হলেও দেশ ও জনগণকে তার তার অপরাজনীতির ফল অনেকদিন ভোগ করতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক বাহিনী থেকে রাজনীতিতে পদার্পন, ক্ষমতা দখল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণ ও উন্নয়নের জন্য তার ভূমিকা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আবার ক্ষমতাহারা এরশাদ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে বার বার অবস্থান পাল্টেছেন, যা তাকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করে। সরকারের অংশীদার হয়েও বিরোধীদলের আসনে থাকা; দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ নেয়া নিয়েও বিতর্কে জড়ান তিনি। তবে সময়ই বলে দেবে, ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করছে এরশাদকে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগ লাভ করেন তিনি। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এরশাদ পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়েন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল পদে নিয়োগ পান তিনি। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে এরশাদকে সেনাবাহিনীর প্রধান করা হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের হাতে নিহত হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এর প্রায় ১০ মাস পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৮৬ সালের পহেলা জানুয়ারি পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় পার্টি গঠন করেন এরশাদ। ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এরশাদ। যদিও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জোটগত রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন তিনি।

গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে গ্রেফতার হন এরশাদ। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলা করে সরকার। কারাগারে থেকেই ১৯৯১ সালে ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে তিনি রংপুরের পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান।

২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে অনেকটা নাটকীয় ঘটনার মধ্যদিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এরশাদ। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় জাতীয় পার্টি সরকারের অংশ নিয়েও সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদ যায় এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি।

পাঠকের মন্তব্য