চিকুনগুনিয়ায় আতঙ্ক নয়, স্বাস্থ্যসচেতন হোন

চিকুনগুনিয়ায় আতঙ্ক নয়, স্বাস্থ্যসচেতন হোন

চিকুনগুনিয়ায় আতঙ্ক নয়, স্বাস্থ্যসচেতন হোন

মুনীরউদ্দিন আহমদ : মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। সঙ্গে সঙ্গে জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক। বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপও। বর্ষাকালে ডায়রিয়ার প্রকোপ অন্য সময়ের চেয়ে বেশি থাকে। পানিবাহিত জীবাণু থেকেই ডায়রিয়া ও কলেরা দেখা দেয়। সচরাচর আমাদের দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতা অত্যন্ত কম হওয়ার কারণে পচা-বাসি ও দূষিত খাবারের মাধ্যমে ডায়রিয়া, কলেরা, হেপাটাইটিস ও টাইফয়েডের বিস্তার ঘটে বেশি। তারপর বাড়তি সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া। তাই বর্ষা মৌসুমে এসব রোগ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য অবশ্যই বিশুদ্ধ খাবার ও জীবাণুমুক্ত পানি পানের ব্যাপারে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে। আর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মশামুক্ত পরিবেশ সংরক্ষণ করার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।

চিকুনগুনিয়ার কথা এখন সবার মুখে মুখে। চিকুনগুনিয়া  বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নাম হলেও এর প্রতিরোধে কারো কোনো বিশেষ ভূমিকা দেখছি না। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে চিকুনগুনিয়াকে মোকাবেলা করার মতো জোরালো উদ্যোগ গ্রহণের তেমন কোনো নজির দেখছি না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অসংখ্য মানুষকে বলার পরও তারা ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করছে না। তাদের কয়েকজন মশারি ব্যবহার না করার কারণে পরে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ কোনো কিছুকেই গুরুত্বসহকারে নেয় না। এ কারণে বিপদে পড়লে বা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে পড়ে। তখন ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। নিপসমের অধ্যাপক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে ঠিক এই কথাগুলো তাঁর মতো করে বলেন, ‘ঘরে ঘরে চিকুনগুনিয়া হলেও মানুষ সচেতন হচ্ছে না। এত প্রচার-প্রচারণা চলছে তবু এসবে অনেকেই কান দিচ্ছে না। সতর্কতামূলক প্রচারণাকে মানুষ গুরুত্ব দেয় না—এটা খুব চিন্তার বিষয়। এখনো আমরা বিভিন্ন সার্ভে করতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ঘরে ঘরে এডিস মশার উৎপত্তিস্থল, এমনকি যে ঘরে চিকুনগুনিয়ার রোগী আছে সেখানে তারাও ওই রোগের বাহক এডিস মশা নিধনে বা উৎপত্তিস্থল অপসারণে সচেতন নয়। সবার মধ্যে উদাসীনতা কাজ করছে। এমন হলে সামনের সময়গুলোতে চিকুনগুনিয়া আর ডেঙ্গুর জন্য খুব বিপজ্জনক পরিস্থিতি হতে পারে।’

চিকুনগুনিয়ার আবির্ভাবে নতুন করে এক সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভাইরাসের কারণে সামান্য সাধারণ সর্দি-কাশি-জ্বর হলেও মানুষ ইদানীং তাকে চিকুনগুনিয়া বলে অভিহিত করছে। অন্যদিকে ডেঙ্গুকেও চিকুনগুনিয়া বলে মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কারণ দুটি রোগের কারণই মশা এবং রোগগুলোর উপসর্গও মোটামুটি একই রকম। সমস্যা আরো আছে। শুধু চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গুর কারণে নয়, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, প্রস্রাবের সংক্রমণ বা অন্যান্য জীবাণু সংক্রমণের কারণেও জ্বর হতে পারে। সুতরাং এসব রোগের সুস্পষ্ট পার্থক্য জানতে হবে এবং সেই মোতাবেক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি কথা আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলি ও লিখি। আর তা হলো, রোগের প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই সবচেয়ে উত্তম। বছর কয়েক আগে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হওয়ায় কিছু লোকের মৃত্যু হয়েছিল। কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়লে বা মানুষ মারা গেলে আমরা নড়েচড়ে বসি, রোগ প্রতিরোধ বা প্রতিকারে হাজারো তত্ত্ব, তথ্য, পরামর্শ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলে থাকি। সরকারের পক্ষ থেকেও নানা ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে রোগের প্রকোপ কমে না, মানুষের ভোগান্তিও কমে না। অতীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হওয়ায় কিছু লোকের মৃত্যুর পরপরই মশা নিধনের কর্মসূচিতে ভীষণ তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে যাওয়ার কারণে মশা নিধনের কর্মসূচিতে মন্থরগতি ফিরে এলো আবার। এখন আবার চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সরকার ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা মশা নিধনে ভীষণ তৎপরতা দেখাচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়  উদ্যোগ। মশা মারার জন্য আমরা সবাই ওষুধ ছিটানোর কথা বলছি, কিন্তু মশা প্রতিরোধের জন্য আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের কথা আমরা কয়জন বলছি? এই ঢাকা শহরটাকে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ও আবর্জনাময় করার পেছনে আমাদের সবার কমবেশি অবদান রয়েছে। আমি বলি না, হাজার চেষ্টা করেও মশামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে। তবে আমি মনে করি, আমরা সচেষ্ট হলে, যুক্তিসংগত আচরণ করলে, সুনাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে, একটু সভ্য হতে চেষ্টা করলে, বিবেকবুদ্ধি খাটালে, অতিমাত্রায় স্বার্থপরতা না দেখালে, অন্যের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি মমত্ববোধ থাকলে, পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতন হলে পরিস্থিতি অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকত, আমরা অনেক ভালো থাকতাম এবং অনেক সাধারণ রোগ থেকে বেঁচে থাকতে পারতাম।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সূত্র মতে, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। তবে বেসরকারি সূত্র মতে, এই সংখ্যা লাখের ওপরে হতে পারে বলে পত্র-পত্রিকা লিখেছে। সরকারি ও  বেসরকারি সূত্রে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় এত বড় তারতম্যের কারণটি বোধগম্য নয়।

চিকুনগুনিয়া ভাইরাসজনিত রোগ। মশার মাধ্যমে এই ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এডিস প্রজাতির এডিস অ্যাজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশা থেকেই চিকুনগুনিয়া রোগের সংক্রমণ ঘটে। চিকুনগুনিয়া ভাইরাসটি টোগা ভাইরাস গোত্রের। ভাইরাসটি মশা দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার কারণে একে আরবোভাইরাসও বলা হয়ে থাকে। মনে রাখা দরকার, ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসও এই মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং রোগের লক্ষণও প্রায় একই রকম। এ কারণে চিকুনগুনিয়াকে ডেঙ্গু বলে অনেকেই ভুল করতে পারে। তাই রোগের প্রকৃত ধরন জানার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সংক্রামক মশা কামড়ানোর চার থেকে সাত দিনের মধ্যে দেহে চিকুনগুনিয়ার বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। চিকুনগুনিয়ার উল্লেখযোগ্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে, হঠাৎ করে ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে তীব্র জ্বর। এই জ্বরে অনেকের ক্ষেত্রে কাঁপুনি থাকে, কারো ক্ষেত্রে থাকে না। অন্যান্য জ্বরের মতো চিকুনগুনিয়া জ্বর ঘাম দিয়ে ছাড়ে না। এই জ্বর সর্বোচ্চ সাত দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে জ্বর সেরে যেতে পারে। সাধারণত হাঁটু, গোড়ালি, পিঠ, হাত ও ঘাড়ে ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। শরীরের অস্থিগ্রন্থির তীব্র ব্যথা মাঝেমধ্যে অসহনীয় মনে হতে পারে। মাংসপেশি ও মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, প্রচণ্ড ক্লান্তি বা দুর্বলতা রোগীকে ভীষণ কাহিল করে ফেলে। চিকুনগুনিয়া রোগে র‌্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয় জ্বরের প্রথম থেকে তৃতীয় দিনের মধ্যেই। সাধারণত মুখ, ঘাড় ও পিঠে ফুসকুড়ি দেখা যায় বেশি। তবে পায়ে বা শরীরের অন্য অংশেও এই ফুসকুড়ি হতে পারে। ডেঙ্গুতে র‌্যাশ দেখা দেয় ষষ্ঠ দিনে। ফুসকুড়ির সঙ্গে  চুলকানি থাকাও অস্বাভাবিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে চোখ, হৃপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র ও অন্ত্রের সমস্যার কথাও শোনা যায়। সচরাচর চিকুনগুনিয়ার জটিল আকার ধারণ করার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি না করেই চিকুনগুনিয়া রোগ পুরোপুরি সেরে যায়। জ্বর সেরে গেলেও ব্যথা থাকতে পারে বেশ কিছুদিন। চিকুনগুনিয়ার কারণে মৃত্যুর ঘটনা অনেক বিরল। সাধারণত দুই থেকে তিন দিনেই রোগী সুস্থ হতে শুরু করে। আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস থাকে। এ সময়ের রোগীকে মশা কামড়ালে সেটিও ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ও ভাইরাসটি ছড়ায়। চিকুনগুনিয়ার ভাইরাসবাহী মেয়ে মশার কামড়ে মানুষের মধ্যে এই রোগটি ছড়ায়। সাধারণত দুই জাতের এডিস মশা চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস বহন করে। ডেঙ্গু জীবাণু বহনের জন্যও এডিস মশাকে দায়ী করা হয়।

চিকুনগুনিয়া রোগ নিশ্চিত নির্ণয়ের অন্যতম উপায় হলো কিছু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা। অনেকেই অন্য কোনো রোগকে চিকুনগুনিয়া ভেবে বসে। রক্ত পরীক্ষা, আরএনএ ভাইরাস পরীক্ষা, অ্যান্টিবডি পরীক্ষা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত। ভাইরাস সংক্রমণের কারণে রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। রক্তের সিরামে ইমিউনোগ্লোবিউলিন এম ও ইমিউনোগ্লোবিউলিন এম অ্যান্টিচিকুনগুনিয়া অ্যান্টিবডির উপস্থিতির মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া রোগ নির্ণয় করা হয়।

চিকুনগুনিয়া ভাইরাসজনিত রোগ বলে এই রোগে বিশেষ কোনো ওষুধ কার্যকর নয়। মনে রাখা একান্ত দরকার যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। তাই চিকুনগুনিয়ার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ শুধু অযৌক্তিকই নয়, শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকরও বটে। চিকুনগুনিয়া প্রতিকারে কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই, টিকাও নেই। তবে উপসর্গ দেখে ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, আইবোপ্রফেন, ডাইক্লোফেনাক, কিটোরোলাক, ন্যাপ্রোক্সেন জাতীয় ওষুধ গ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। এসব ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই এমন কাপড়চোপড় পরা দরকার যাতে শরীরে মশা বসতে না পারে এবং কামড়াতে না পারে। দিনের বেলায় যাদের ঘুমানোর অভ্যাস, তাদের অবশ্যই ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা উচিত। শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

চিকুনগুনিয়া ছাড়াও মশা আরো অনেক রোগের কারণ। ম্যালেরিয়া এর মধ্যে অন্যতম। তাই এসব রোগ প্রতিরোধে অনেক রোগের বাহক মশার উৎপত্তি ও প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ অনেক শ্রেয়। তাই আমাদের টার্গেট হওয়া উচিত সব রোগের প্রতিরোধের ব্যবস্থা খোঁজা, প্রতিকার বা চিকিৎসা নয়। মশা কোথায় জন্মায়, কিভাবে এর বংশবিস্তার ঘটে, এসব আমরা অনেকেই জানি। তার পরও প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন, বদ্ধ জলাশয়, পানিসমৃদ্ধ ড্রাম, ফুলের টব, ঘরের আশপাশে পড়ে থাকা মাটির ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, বালতি, পরিত্যক্ত শিশি-বোতল বা কনটেইনার, টায়ার, পলিথিন ব্যাগ, ছোট-বড় গর্ত, নালা বা পুকুরের জমে থাকা পানিতে মশা ডিম পাড়ে ও বংশ বিস্তার করে। তাই ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে যেসব স্থানে মশা জন্মায় ও বংশবিস্তার করে সেসব স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ফেলতে হবে। জলাবদ্ধ জায়গা শুকিয়ে ফেলতে হবে। পরিবেশ দূষণ থেকে বিরত থাকতে হবে, অন্যকেও বিরত রাখতে হবে। তাই পদক্ষেপগুলো বর্ষা শুরুর আগে ও পরে করলে উত্তম। চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়লে ঘরে মশানাশক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। মশানাশক ওষুধ ব্যবহারের সময় শিশুদের দূরে রাখুন।

চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গেলে নিম্নে বর্ণিত পরামর্শগুলো গ্রহণ করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

এক. ঘন ঘন প্রচুর পানি ও তরল খাদ্য খাওয়ার চেষ্টা করুন, যদিও এ সময় কিছুই খাওয়ার প্রবৃত্তি হবে না। মনে রাখবেন, সব রকম ভাইরাস সংক্রমণে শরীরের নিজস্ব মেটাবলিক সিস্টেমে বিঘ্ন ঘটে। ভাইরাসের বংশবিস্তারের জন্য শরীরে পুষ্টি ঘাটতি অবশ্যম্ভাবী। তাই রোগাক্রান্ত অবস্থায় সব রকম পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।

দুই. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। অবশ্য চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে জ্বর ও তীব্র ব্যথা-বেদনার জন্য চলাফেরা বা কাজকর্ম করা সহজসাধ্য নয়। তিন. গিঁটের ব্যথার স্থানে ঠাণ্ডা সেঁক দিতে পারেন। ঠাণ্ডা কিছু দিয়ে জয়েন্ট ও হাড়ের ব্যথার স্থানে ধরে রাখলে আরাম পাবেন। তবে এসব স্থানে গরম সেঁক দেবেন না।

চার. জ্বর ও ব্যথার জন্য শুধু প্যারাসিটামল গ্রহণ করতে পারেন। প্যারাসিটামলের মাত্রা সর্বোচ্চ এক গ্রাম ছয় ঘণ্টা পর পর বা চার বেলা। তবে দিনে চার গ্রামের বেশি প্যারাসিটামল গ্রহণ ঠিক নয়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল প্রদানে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়। প্যারাসিটামল সিরাপ বা সাসপেনশন কেনার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন। নামকরা কম্পানির প্যারাসিটামল সিরাপ বা সাসপেনশন কিনুন, যাতে আপনার শিশু নকল বা ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ বা সাসপেনশন খেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আগেই বলেছি, অ্যাসপিরিন, আইবোপ্রফেন, ডাইক্লোফেনাক, কিটোরোলাক, ন্যাপ্রোক্সেন জাতীয় ওষুধ গ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। অ্যান্টিবায়োটিক, কর্টিকোস্টেরয়েড, অ্যাসপিরিনের মতো নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি ড্রাগের অযৌক্তিক ও যথেচ্ছ ব্যবহার থ্রোম্বসাইটোপেনিয়া (রক্তে প্ল্যাটিলেটের পরিমাণ কমে যাওয়া, যা রক্তক্ষরণ বন্ধে সাহায্য করে) গ্যাস্ট্রাইটিস (পাকস্থলির দেয়ালে প্রদাহ, জ্বালা-যন্ত্রণা ও ক্ষত সৃষ্টি হওয়া), অন্ত্রের রক্তক্ষরণ ও কিডনি বিকলের মতো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা পরে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। তাই চিকুনগুনিয়া চিকিৎসায় এসব ওষুধ ব্যবহারে যথেষ্ট সাবধান হওয়া দরকার। পাঁচ. চুলকানির জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় চুলকানির ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। ছয়. চিকুনগুনিয়া হলে শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রোগীর বয়স খুব কম হলেও সাবধানে থাকা উচিত। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বেশি। শিশুদের চিকুনগুনিয়া হলে তাদের ফ্লুইড খাবারের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। মশারির ভেতরে রাখা, লম্বা জামাসহ হাত-পায়ে মোজা পরিধান, মশা নিরোধক ক্রিম দেহের উন্মুক্ত স্থানে লাগিয়ে রাখা উচিত। শিশুদের ব্যাপারে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেবেন না। পাঁচ দিনের মধ্যে জ্বর না সারলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফেকসাস ডিজিজ, ইতালির ল্যাবরেটরি অব ভাইরোলজির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যু প্রতি এক হাজারে একজন এবং সেটা বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে। তাই তাদের মধ্যে এর লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সাত. ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, হৃদরোগ, ক্যান্সার, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড ইত্যাদির মতো ক্রনিক রোগীরা চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ার কারণে এই ঝুঁকি বাড়ে। বয়স্কদের মধ্যে চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে গর্ভবতী মহিলা, ছোট শিশু, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগী, বয়স্ক মানুষ, ডায়াবেটিস, ডেঙ্গু, টিবি, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, এইডস,  উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানির রোগীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটলে হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে। ওপরে বর্ণিত বেশি ঝুঁকিতে থাকা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগী ও শিশু-বয়স্কদের বেলায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করা আবশ্যক। উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে রক্তচাপ বেশি কমে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, শরীরের কোনো স্থানে রক্তক্ষরণ শুরু হওয়া, চিকিৎসা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময়েও তীব্র ব্যথা ও জ্বরের কোনো উন্নতি না হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। আট. শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সুষম খাবার খান এবং পর্যাপ্ত ব্যায়াম করুন।

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠকের মন্তব্য