জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান কে ? পাল্টাপাল্টি বিবৃতি  

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান কে ? পাল্টাপাল্টি বিবৃতি  

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান কে ? পাল্টাপাল্টি বিবৃতি  

দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশ অনুযায়ী জাপার সিনিয়র নেতা, এমপি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে  জিএম কাদেরেরর পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। 

বুধবার জাতীয় পার্টির একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য, সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন জেলা উপজেলা কমিটির নেতা থেকে শুরু করে  দলের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতারা  ভোরের ডাককে বলেছেন, তারা প্রয়াত নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের  নির্দেশের বাইরের রাজনীতি করবেন না, এরশাদ জীবদ্দশায় যেভাবে বলে গেছেন, জাতীয় পার্টি সেইভাবে চলবে, এরশাদ যেহেতু বলে গেছেন, তার অবর্তমানের জিএম কাদের হবেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, তাই আমরাও জিএম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। এখানে কে কি বললো, কারা কি বিবৃতি দিলো তাতে জাতীয় পার্টির কিছু যায় আসে না, বরং যে কয়জন  নেতা দলের সিনিয়র কো:চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন, তারা নিজেরাই জানেন, দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা শুন্যের কোঠায়। তারা দলের জন্য এখন বোঝা। 

উল্লেখ্য সোমবার গভীর রাতে জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান নন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলে একটি বিবৃতি পাঠান। যদিও বিবৃতির নিচে রওশন এরশাদ ও যেসব নেতাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের স্বাক্ষর ছিলো না। রওশনের নামের পাশে যে স্বাক্ষর ছিলো তাও তার কিনা জানা যায়নি। 

দলীয় সূত্রে জানা যায়, এরশাদ তার মৃত্যুর আগে ৪ মে জিএম কাদেরকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন এবং তার অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে একটি সাংগঠনিক নির্দেশ গণমাধ্যমে পাঠান। তখন থেকেই জাপায় রওশন এরশাদ অনুসারী বলে পরিচিত কয়েকজন নেতা তা মেনে নিতে পারেননি। এরশাদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর পর কয়েকদিন এ বিষয়ে কোন আলোচনা না হলেও তার কুলখানির পর বিষয়টি অনেকের নজরে আসে। যদিও এরশাদের মৃত্যুর পরদিন থেকেই জাপার সিংহভাগ নেতাকর্মীরা জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে সম্বোধন করে আসছেন। গত ১৮ জুলাই জাপার বনানী কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, এস এম ফয়সল চিশতি,  সুনীল শুভরায়, মেজর অব: খালেদ আকতার সহ প্রায় একডজন সিনিয়র নেতার উপস্থিতিতে জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করার পর তৃণমুলে স্বস্থি ফিরে আসে। তবে কিছুটা অসন্তুষ্ট হন রওশনপন্থী বলে পরিচিত কয়েকজন নেতা। এরমধ্যেও ২০ জুলাই রওশন এরশাদের গুলশানের বাসভবনে যান জিএম কাদের। এসময় দেবর জিএম কাদেরকে দোয়াও করে দেন রওশন এরশাদ।

এদিকে সোমবারের মধ্য রাতের বিবৃতির পর গত দুইদিন ধরে জাপার সর্বস্থারের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চট্টগ্রামের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ময়মনসিংহের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্যকে দায়ী করে তাদেরকে  বয়কট করার আহবান জানাচ্ছে। তারা ঐ দুই জন নেতাকে বিশ্বাসঘাতক, সুবিধাবাদী ও দলের জন্য ক্ষতিকর আখ্যা দিয়ে তাদেরকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কারেরও দাবি জানাচ্ছে। আর দলের এমপি ও সিনিয়র নেতারা জিএম কাদেরকে ফোন করে এবং গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দিচ্ছে। এর ফলে গত দুই দিনে রওশন এরশাদের অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করে যে কয়জন নেতার নামে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠানো হয়েছে, সেই সকল নেতারা অনেকটা দলে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। অবশ্য রওশন এরশাদের সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতার প্যাডে পাঠানো বিবৃতিতে যে দশ জনের নাম দেয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে অধ্যাপক দোলোয়ার হোসেন খান, মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী এমপি ও লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি জানিয়েছেন তারা বিবৃতির বিষয়ে কিছুই জানেনন না।

সংসদ সদস্য মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান, আমরা তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। বিবৃতিতে তার সম্মতি নেই। একই কথা বলেছেন, খোক এমপি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য দেলোয়ার হোসেন।

এদিকে জাপার অধিকাংশ প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেছেন, কোনো চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করে বেগম রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের মধ্যে দুরুত্ব সৃষ্টি করতে পারবে না। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের ও বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে বেগম রওশন এরশাদের যৌথ নেতৃত্বে দল চলবে। এখানে কেউ অন্য কিছু করার চেষ্টা করলে তাদের প্রতিহত করে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে।

এ বিষয়ে পার্টির  সিনিয়র নেতা ও প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ এমপি বলেন, পার্টি চলে গঠণতন্ত্র অনুযায়ী। দলের চেয়ারম্যান জীবিত অবস্থায় তার অবর্তমানে দল পরিচালনা করার জন্য গঠনতন্ত্রের ২০/১-ক ধারা মোতাবেক তার অনুজ জিএম কাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন এবং বলেছেন তার অবর্তমানে জিএম কাদেরই হবেন পার্টির চেয়ারম্যান। একই গঠনতন্ত্রে রওশন এরশাদকে বিরোধীদলের উপনেতা বানানো হয়েছে। উনি বিরোধীদলের নেতা হবেন এটাই স্বাভাবিক। এখানে ভূল বুঝাবুঝির কিছু আছে বলে আমি মনে করিনা। 

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাপার সভাপতি ও দলের আরেব প্রতিষ্ঠাতা কালীন সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি বলেন, প্রয়াত পল্লীবন্ধু এরশাদের ইচ্ছা ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান, রওশন এরশাদ বিরোধীদলের নেতা। তাদের যৌথ নেতৃত্বেই পার্টি পরিচালিত হবে। এর বাইরে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করার জন্য পার্টির দুইএকজন নেতা চক্রান্ত  ষড়যন্ত্র করছেন। পার্টির তৃণমূলের কাছে তাদের নুন্যতম গ্রহণযোগ্যতা নেই।  তাছাড়া এবার যারা ষড়যন্ত্র করতে আসবে তাদের উচিত শিক্ষা দেবো। আর কাউকে দল নিয়ে খেলা করতে দেবো না, অনেক সহ্য করেছি, আর না। যারা পিতা এরশাদের আদেশ মানবে না, তারা যেন সম্মান নিয়ে দল থেকে বিদায় হয়। 

পার্টির অরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, জিম কাদের শুধু আমাদের পার্টির চেয়ারম্যানই নয়, আমাদের স্বপ্নের নেতা।  প্রিয় নেতা এরশাদ সাহেব তাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর পর জাতীয় পার্টির সারা দেশে ঘুড়ে দাড়িয়েছে। জাতীয় পার্টির এখন  জিএম  কাদেরের নেতৃত্বে  ঐক্যবদ্ধ এবং শক্তিশালী। যারা উল্টা পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে তারা ভালো করেই জানেন, দলের নেতাকর্মীদের কাছে তারা ভিলেন হয়ে গেছে। 

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের প্রেস এন্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারী বিশিষ্ট সাংবাদিক সুনীল শুভ রায় বলেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থায় জাপার গঠনতন্ত্রের ২০/১ ক ধারা মোতাবেক জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। এখানে বির্তকের কিছু নাই। প্রয়াত নেতা পল্লীবন্ধুর  সাংগঠনিক আদেশ অনুযায়ী জিএম কাদের সাহেব এখন দলের চেয়ারম্যান। এদিকে পার্টির সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি তৃণমুলের নেতারাও জিএম কাদেরের পক্ষে একাট্টা হয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। 

এই ব্যাপারে জাপার যুগ্ম-মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় বলেন, যখন বিএনপি থেকে নেতাকর্মীরা জাপায় আসতে শুরু করেছে, সে দলের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিএনপির এজেন্টরা দলের বিভেদ  সৃষ্টি করে পার্টির ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা করছেন। তাদের এ উদ্দেশ্য সফল হবে না। প্রয়াত নেতা পল্লীবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী জিএম কাদের স্যারের নেতৃত্বে পুরো জাতীয় পার্টির পরিবার এখন ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী। 

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির বলেন, আমরা রওশন এরশাদের মুখ দেখে রাজনীতি করি না। যে কি বললো না বললো তাতে আমাদের কিছু আসে যায় না। আমরা রাজনীতি করেছি, প্রয়াত নেতা পল্লীবন্ধু এরশাদের  নেতৃত্বে। এখন রাজনীতি করছি, তার  দেয়া নির্দেশকে সামনে রেখে। তিনি   ইন্তেকাল করার আগেই আমাদের জানিয়ে গেছেন, তার অবর্তমানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হবেন জিএম কাদের। তাই এখন আমরা জিএম কাদেরের নেতৃত্বে বৃহত্তর রংপুর সহ সারাদেশের লাখ লাখ নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ।   

পাঠকের মন্তব্য