ডেঙ্গু ইস্যুতে ‘বেফাঁস মন্তব্য’ ক্ষুব্ধ আ’লীগের হাইকমান্ড 

ডেঙ্গু ইস্যুতে ‘বেফাঁস মন্তব্য’ ক্ষুব্ধ আ’লীগের হাইকমান্ড 

ডেঙ্গু ইস্যুতে ‘বেফাঁস মন্তব্য’ ক্ষুব্ধ আ’লীগের হাইকমান্ড 

সালাহ উদ্দিন জসিম : সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে আসন সংকট। প্রত্যেক দিনই আসছে স্বজন হারানোর খবর। এর মধ্যেও ঢাকা সিটির দুই মেয়র এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্যে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষনেতারা ক্ষোভে ফুঁসছেন।

তারা বলছেন, মশা নিধন ও এজন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া মেয়রদের দায়িত্ব। সেটি না করে তারা অতিকথনে আর লোক দেখানো কর্মসূচিতে ব্যস্ত। এতে করে সরকার ও দলের ভাবমর্যাদার ক্ষতি হচ্ছে। বিগত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৮৮৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে শনিবারই স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে।

ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী, হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন, ঢাকা মেডিকেলের এক নারী চিকিৎসকসহ অনেকে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন।

শনিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের ভাষ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৫২৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মূলত ডেঙ্গু নিয়ে জনমনে চরম উদ্বেগ আর ভীতি কাজ করছে। এটি অনুধাবনে শুধু হাসপাতাল নয়, সোশ্যাল মিডিয়াতে চোখ বুলাতেও বোঝা যায়। আক্রান্তরাই জানাচ্ছেন। স্বজন হারানোরা পোস্ট পষ্ট করছেন পরিস্থিতি।

অথচ ঢাকার মেয়ররা পদক্ষেপ না নিয়ে একের পর এক কথার ফুলঝুড়ি আওড়াচ্ছেন। এজন্য তাদের ওপর ক্ষুব্ধ নাগরিকরা। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতাকর্মীদের ডেঙ্গু নিয়ে দায়িত্বহীন কথাবার্তা না বলার পরামর্শ দিয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ডেঙ্গু যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, এটি উদ্বেগজনক। এখানে দল দেখে এডিশ মশা কাউকে কামড় দেবে না। কাজেই সবাইকে এ বিষয়টি নিয়ে সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।’

ডেঙ্গু নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়রের বক্তব্য প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা অনেক সময় এমন দায়িত্বহীন কথাবার্তা বলে থাকি। কিন্তু, সবারই উচিত নিজের দায়িত্ব থেকে কথা বলা। কাজে মনোযোগ দেয়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘কথা বেশি না বলে কাজে মনোনিবেশ করবেন, এটাই আমি নেতাকর্মীকে আহ্বান জানাচ্ছি। আর তারা দু’জনেই যেটা বলেছেন, সেটা তাদের নিজেদের মতামত হতে পারে।’

প্রসঙ্গত, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সারা দেশে যেভাবে ছেলেধরার গুজব ছড়ানো হয়েছিল, ডেঙ্গু নিয়েও একই গুজব ছড়ানো হচ্ছে।’ একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বলেন, ‘এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো। যে কারণে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

এদিকে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামও মশা নিধনে মনোযোগী হওয়ার চেয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত। পরিচ্ছন্নতায় ময়লা রাস্তায় ছিটিয়ে তা পরিষ্কারের লোক দেখানো ভাব রয়েছে ডেঙ্গু সংকটেও। এতে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা বলেন, ‘অন্যবারের তুলনায় এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। দলের সাধারণ সম্পাদক আমাদের কথা বলার চেয়ে কাজে মনোযোগী হতে বলেছেন। আমি একজন ডাক্তার হিসেবে দলের পক্ষে চিকিৎসার বিষয় তদারকি করছি।’

তিনি বলেন, ‘আজ ঢাকা মেডিকেলে গেছি, সোহরাওয়ার্দীতেও দেখেছি। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও যাচ্ছি। ডেঙ্গু আক্রান্তদের আর্তনাদ সহ্য করা সত্যিই কঠিন। আমরা চাই, সবাইকে মিলে ঐক্যবদ্ধবাবে এই সংকট মোকাবেলা করতে।’

এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মেয়রদের এক হাত নিয়েছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।

মেয়রদের উদ্দেশে ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘ঢাকাকে এডিস মশামুক্ত রাখা আপনাদের দায়িত্ব। আজ ঢাকা শহরজুড়ে ডেঙ্গু রোগীদের আর্তনাদ আর অসহায় স্বজনদের হাহাকার। কোনো হাসপাতালে বেড খালি নাই। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই চরম আতঙ্কিত। গুজব নয়, এটাই সত্যি!’

তিনি আরও বলেন, ‘এমন ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে আপনারা আগামীতে ভোট চাইবেন কিভাবে? আর আমরাই বা আপনাদের জন্য কোন মুখে ভোট চাইব?’

তবে এমন সংকটে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য এসেছে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি থেকেও। দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তো বলেই দিয়েছেন, ‘গুম-খুন, ক্রসফায়ারের মতো এডিসের বিস্তার ঘটিয়ে সরকার মানুষ হত্যা করছে।’

অবশ্য ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে জনগণকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। দুটি সিটি করপোরেশনকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য