গায়ের জোরে কাশ্মীরকে দখল করা যাবে, জয় নয়

গায়ের জোরে কাশ্মীরকে দখল করা যাবে, জয় নয়

গায়ের জোরে কাশ্মীরকে দখল করা যাবে, জয় নয়

প্রভাষ আমিন : ছেলেবেলা থেকেই কাশ্মীরের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল। বই পড়ে, সিনেমা দেখে, বন্ধু-বান্ধবদের মুখে মুখে শুনে কাশ্মীরের রূপের প্রেমে পড়ে যাই। ইচ্ছা ছিল জীবনে একবার অন্তত কাশ্মীর যাবোই। অনেকবার পরিকল্পনা করেছিও, বিভিন্ন প্যাকেজ দেখেছি; কিন্তু বাজেট মেলাতে পারিনি বলে যাওয়া হয়নি। সোমবার (৫ আগস্ট) ভারতের পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ঘোষণার পর মনে হচ্ছে, এই জীবনে আর এই ভূ-স্বর্গে যাওয়া হলো না। নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহ মিলে কাশ্মীরে জ্বলতে থাকা আগুনে যে টনকে টন ঘি ঢাললেন, তাতে সে আগুন কবে নিভবে, আদৌ নিভবে নাকি আরো ছড়িয়ে পড়বে; কে জানে।

জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অন্য রাজ্যের মত নয়। সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারায় জম্মু-কাশ্মীর বিশেষ মর্যাদা ভোগ করত। ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের আলাদা সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা ছিল। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া বাকি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার ছিল কাশ্মীর সরকারের। এমনকি কাশ্মীর বিধানসভার অনুমোদন কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত সেখানে প্রয়োগ করা যেতো না। একসময় জম্মু-কাশ্মীরের সরকারের সরকার প্রধানকেও প্রধানমন্ত্রীই বলা হতো, পরে অবশ্য মূখ্যমন্ত্রী হয়ে গেছেন। তবে জম্মু-কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ ছিল সংবিধানের ৩৫এ ধারা। এই ধারাবলে জম্মু-কাশ্মীরে বাইরের কারো ব্যবসা করার, জমি কেনার, সম্পদ অর্জনের সুযোগ ছিল না। এমনকি কাশ্মীরের কোনো নারী বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনি সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। চাকরি-বাকরিও ছিল স্থানীয়দের জন্য সংরক্ষিত। ফলে ৭২ বছর ধরে ভারতের সাথে থাকলেও একটা স্বতন্ত্র ছিল কাশ্মীরিদের। এবার বুঝি সেটাও যাচ্ছে।

অবশ্য নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির এই উদ্যোগ অভাবিত নয়। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ছিল বিজেপির নির্বাচনী অঙ্গীকার। আরেকটু পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বিজেপির আদি প্রতিষ্ঠাতা বাঙালি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৫৩ সালেই ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি তুলেছিলেন। এমনকি তিনি এই দাবি নিয়ে লংমার্চে গিয়েছিলেন কাশ্মীর পর্যন্ত। সেখানে শেখ আব্দুল্লাহ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ রয়েছে কাশ্মীরের কারাগারে তাকে কম্বল দেয়া হয়নি। প্রচন্ড ঠান্ডায় মারা গিয়েছিলেন তিনি। শেখ আব্দুল্লাহ সরকার ৬৬ বছর আগে শ্যামাপ্রসাদের প্রতি যে অন্যায় করেছিল, এতদিন পর গোটা কাশ্মীরবাসীকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে কি? শ্যামাপ্রসাদের আদর্শিক উত্তরসুরীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কেড়ে নিল কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা। আমি অনেকদিন ধরেই বলে আসছি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্রের বিপদের কথা। সোমবার ভারতের রাজ্যসভায় অমিত শাহ যা করলেন, তা বেআইনি বা অগণতান্ত্রিক হয়তো নয়; কিন্তু অনৈতিক ও স্বৈরতান্ত্রিক। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। যে গণতন্ত্রে সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকে না, ন্যায্যতার ধারণা থাকে না, গায়ের জোরে সব হয়; সেটা গণতন্ত্রই নয়। বিজেপি এত বড় সিদ্ধান্ত নিল, অথচ বিরোধী দল তো দূরের কথা শরিকদেরও অন্ধকারে রাখলো। আচমকা যেন বোমা ফাটালেন মোদি-অমিত জুটি। তবে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষ সপ্তাহখানেক ধরেই টের পাচ্ছিলেন, ভয়ঙ্কর কিছু একটা হতে যাচ্ছে। বাড়তি সেনা মোতায়েন, অমরনাথযাত্রা বাতিল করে সকল তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের বিশেষ ব্যবস্থায় কাশ্মীর ত্যাগে বাধ্য করা, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা, জায়গায় জায়গায় কারফিউ জারি, অন্তত চারমাসের খাদ্যসামগ্রী মজুদ, সাবেক দুই মূখ্যমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাকে গৃহবন্দী করার পরই এলো এই ঘোষণা। যাতে কাশ্মীরের মানুষ প্রতিবাদ করতে না পারে। হাত পা বেধেই কেড়ে নেয়া হলো তাদের অধিকার। কিন্তু গায়ের জোরে নরেন্দ্র মোদি কতদিন আটকে রাখতে পারবেন, কাশ্মীরের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার?

কাশ্মীরের সমস্যা ভারতের সমান বয়সী। দুইশ বছর শাসন করে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়ার আগে ব্রিটিশরা ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে দুইভাগ করে দিয়ে যায়। মুসলমানদের জন্য গঠিত হয় পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত পাকিস্তান। এই দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ১১০০ মাইল হলেও মানসিক দূরত্ব ছিল অনতিক্রম্য। ধর্ম দুই পাকিস্তানকে বেধে রাখতে পেরেছিল মাত্র ২৩ বছর। ব্রিটিশদের পেন্সিলের খোচায় বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২টি ছিটমহলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিজভূমে পরবাসী হয়ে ছিলেন। ৬৮ বছর লেগেছে সেই জট খুলতে। তবে কাশ্মীর উপত্যকায় যে বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছে, তা আদৌ কখনো উৎপাটন করা সম্ভব কিনা জানি না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও  হিন্দু রাজা হরি সিংএর ইচ্ছায় কাশ্মীর ভারতের সাথে থেকে যায় কিছু শর্তসাপেক্ষে। সেই শর্তগুলোই পরে ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত হয়। বিজেপি সরকারের এই ধারা বাতিল তাই কাশ্মীরের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

স্বাধীনতার পরপরই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধে জড়ায় ভারত-পাকিস্তান। সে যুদ্ধে কাশ্মীরের এক তৃতীয়াংশ চলে যায় পাকিস্তানের দখলে। সে অংশটুকু পাকিস্তানে পরিচিত আজাদ কাশ্মীর হিসেবে আর ভারত দাবি করে অধিকৃত কাশ্মীর বলে। সেই অংশের দাবি ভারত কখনো ছাড়েনি; তাই কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোনো নির্ধারিত সীমানা নেই, আছে এলওসি মানে লাইন অব কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণরেখা। ৪৭ থেকে কাশ্মীর সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান সবসময় যুদ্ধাবস্থায় থাকে। ছোট বড় মিলিয়ে বেশ কবার যুদ্ধ হয়েছেও, কিন্তু মীমাংসা হয়নি। আমার কেন জানি মনে হয়, কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের অযোগ্য। কদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি তাকে কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্ততা করতে বলেছেন। যদিও পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেটা অস্বীকার করেছেন। আমার ধারণা কাশ্মীর সমস্যা মধ্যস্ততারও বাইরে। কারণ ভারত-পাকিস্তান দুই দেশের কাছেই কাশ্মীর একটা মর্যাদার ইস্যু। নিয়ন্ত্রণরেখায় একটু এদিক সেদিক হলেই নির্বাচনী পাল্লা বড্ড বেশি হেলে যায়। গত নির্বাচনের আগে পুলওয়ামা জোশ মোদিকে অনেক এগিয়ে দিয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় মোদি দাবি করেছেন, তার হাতেই ভারত নিরাপদ। পাকিস্তানের রাজনীতি তো আরো বেশি কাশ্মীরকেন্দ্রিক। জন্মের পর থেকে পাকিস্তানের ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর হাতে; কখনো সেটা পর্দার আড়ালে, কখনো সরাসরি। আর সেনাবাহিনীর মূল জোশ কাশ্মীরে। কাশ্মীরের জঙ্গীগোষ্ঠিকে আইএসআই লালন-পালন, পরিচর্যা করে এটা ওপেন সিক্রেট। তাই পাকিস্তানের সেনা সরকার তো নয়ই, কোনো রাজনৈতিক সরকারের পক্ষেও কাশ্মীর প্রশ্নে একচুলও ছাড় দেয়া সম্ভব নয়। তাই নিয়ন্ত্রণরেখা বজায় রাখতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা, যুদ্ধংদেহী ভাব, যুদ্ধাবস্থা, যুদ্ধ- চলতেই থাকবে।

আমার কেন জানি মনে হয়, ৪৭ সালে কাশ্মীর ভারতের সাথে না গিয়ে পাকিস্তানের সাথে গেলে এবং শেখ মুজিবের মত একজন স্বাধীনতাকামী নেতা পেলে এতদিনে তারা স্বাধীন হয়ে যেতো। কিন্তু ৭২ বছর ভারতের সাথে থেকে কাশ্মীরের লোকজন ভারতীয় হতে পারেনি, ভারতকে ভালোবাসতে পারেনি। শুধু বিশেষ মর্যাদা নয়, তারা চাইছিল পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন, এমনকি স্বাধীনতা পর্যন্ত। ভারতের দৃষ্টিতে যেটা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, কাশ্মীরিদের কাছে সেটাই মুক্তির সংগ্রাম। তবে বাড়তি কিছু তো মিললোই না, বরং বিশেষ মর্যাদার সাথে সাথে রাজ্যের মর্যাদাও খুইয়েছে জম্মু-কাশ্মীর। প্রথমত লাদাখকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে। দুইভাগ করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বানানো হয়েছে। বিশেষ মর্যাদার রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল- রাতারাতি এই অবনমন কাশ্মীরের কেউ তো মানবেনই না, মানছেন না বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও। রাজ্যসভায় উপস্থিত কাশ্মীরের দুই প্রতিনিধি সংবিধান ছিড়ে, এমনকি নিজেদের পোশাক ছিড়ে প্রতিবাদ করেছেন। বিরোধীরা দিনটিকে গণতন্ত্রের কালো দিন বলছেন। কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশকে টুকরো টুকরো করে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ। চিদম্বরমের মত অত দূর হয়তো হবে না, তবে মোদি-অমিত জুটির এই সিদ্ধান্ত যে কাশ্মীর সমস্যাকে জটিলতর করে তুললো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অমিত শাহ দাবি করেছেন, ৩৭০ ধারার কারণে কাশ্মীর মূলধারায় একাত্ম হতে পারেনি। কিন্তু মাথায় সাম্প্রদায়িকতার বিষে ভরা ভারতের ক্ষমতাশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কে বোঝাবে, সবসময় একাত্ম হয়ে যাওয়াই সমাধান নয়। বৈচিত্র্যেই সৌন্দর্য্য। আর কিছু সৌন্দ্যর্য্য টিকিয়ে রাখতে চাই স্বাতন্ত্র্য।

মোদি-অমিত জুটির পরিকল্পনাটা পরিষ্কার। ৩৫এ ধারার রক্ষাকবচ তুলে দিয়ে কাশ্মীরকে ওপেন করে দেয়া হলো। এখন ভারতের সব বড় লোকেরা এখন সেখানে জায়গা কিনে অবকাশকালীন বাগানবাড়ি বানাবেন। বড় বড় শিল্পপতিরা বড় বড় কারখানা বানাবেন। দলে দলে অমুসলিম সেটেলারদের পাঠিয়ে আস্তে আস্তে মুসলমানদের সেখানে সংখ্যালঘু বানানো হবে। কাশ্মীরে উন্নয়ন হবে অনেক, কিন্তু ভূ-স্বর্গ পরিণত হবে নরকে।

রাজনীতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় দফায় অনেক বেশি বেপরোয়া। সাম্প্রদায়িকতার বিষদাত, প্রথমবার যেটা কিছুটা লুকানো ছিল, এবার তা পুরোদমে বের করে ফেলেছেন। ভারতকে একটি অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে চরম অসহিষ্ণু সাম্প্রদায়িক ও একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার দিকে এগুচ্ছেন। গায়ের জোরে কাশ্মীরকে দখল করতে পারবেন নরেন্দ্র দামোদর দাম মোদি, কিন্তু জয় করতে কখনোই নয়। যে আগুন তিনি লাগালেন, তা নেভানোর ক্ষমতা তার আছে তো?

আমার বোধহয় এই জীবনে আর কাশ্মীর যাওয়া হলো না।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

পাঠকের মন্তব্য