পনের আগস্ট : নারীর নারীত্ব, প্রেরণা, ভালোবাসা ও পুরুষের রাজনীতি

গোলাম সারোয়ার : গবেষক ও কলামিস্ট 

গোলাম সারোয়ার : গবেষক ও কলামিস্ট 

উপ-সম্পাদকীয় : সেদিন ছিল শুক্রবার । ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট। সকালে রাষ্টপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বরের নিজ বাড়ীতে প্রেসিডেন্ট থাকতেন। তিনি বঙ্গভবনে থাকতেন না। তিনি রাতটি কাটাতেন তাঁর প্রিয় ৩২ নাম্বার বাড়ীতে। ইতিহাসের আঁতুর ঘরে। 

ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বাড়িটি লক্ষ করে দক্ষিণ দিক থেকে গুলি আসতে থাকে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। গৃহ কর্মী রমা দেখে, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। দোতলায় গিয়ে দেখেন, বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন। রমা আর দোতলায় দাঁড়িয়ে না থেকে তিন তলায় চলে যান এবং বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তাঁর স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। ঘটনা শুনে শার্ট-প্যান্ট পরে নিচ তলায় নামেন শেখ কামাল। রমা দোতালায় শেখ জামাল ও তাঁর স্ত্রীকেও ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। জামাকাপড় পরে শেখ জামাল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের কক্ষে যান।

গোলাগুলি চলছে। অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল। মোহিতুল বঙ্গবন্ধুর সেক্রেটারী। পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার এক পর্যায়ে রিসিভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি। ঠিক এই সময়েই একঝাঁক গুলি জানালার কাচভেঙে অফিসের দেয়ালে লাগে। কাচের এক টুকরায় মহিতুলের ডান হাতের কনুই কেটে যায়। গুলি আসতেই থাকে। বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন এবং মহিতুলকেও হাত ধরে টেনে শুইয়ে দেন।

এর মধ্যেই গৃহকর্মী আব্দুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব। এই হলো নারী ! বালিকা বধু, প্রেরসী, প্রত্যসী, প্রেরণাধায়িনী। ঘোর সঙ্কটেও জানে, বাংলার মান বিশ্বমানের নেতা এই দীনহীন পোষাকে সাধারণে থাকতে পারেননা। কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণ থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে আব্দুলের হাত থেকে পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে পরেন। নিচতলার এই ঘর থেকে বারান্দায় বের হয়ে বঙ্গবন্ধু পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, এত গুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছো ? এ কথা বলেই বঙ্গবন্ধু ওপরে চলে যান।

এই সময়ে শেখ কামাল নিচে নেমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের বলেন, আর্মি আর পুলিশ ভাইরা, আপনারা আমার সঙ্গে আসেন। এ সময় শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও ডিএসপি নুরুল ইসলাম খান। ঠিক তখনই মেজর নূর, মেজর মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢুকে পড়ে। গেটের ভেতর ঢুকেই তারা 'হ্যান্ডস্ আপ' বলে চিৎকার করতে থাকে। মহিতুল ইসলামকে টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে যান নুরুল ইসলাম খান। কোনো কথা না বলেই শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা। নিজেকে বাঁচাতে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মহিতুলকে বলতে থাকেন, আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল । আপনি ওদেরকে বলেন। মহিতুল ঘাতকদের বলেন, উনি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল ।

এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে লক্ষ করে বজলুল হুদা তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান শেখ কামাল। এই সেই কামাল, মুক্তিযুদ্ধের মহাসমরের যোদ্ধা। আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা। এর মধ্যে একটা গুলি মহিতুলের হাঁটুতে আরেকটা নুরুল ইসলামের পায়ে লাগে।

মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘরে ঢুকে বজলুল হুদা সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর আদেশ দেয়। নিচে কী হচ্ছে তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দোতলায় তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ করে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ফোনে তাঁর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনকে পান। তিনি তাকে বলেন, ‘জামিল, তুমি তাড়াতাড়ি আসো । আর্মির লোকরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। সফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো’।

সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহকেও ফোন করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাকে বলেন, ‘সফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও’। জবাবে সফিউল্লাহ বলেন, ‘আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অফ দ্য হাউজ?’ এদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল জামিল তার ব্যক্তিগত লাল রঙের গাড়িটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশে রওনা হন। সঙ্গে ছিলেন নিজের গাড়িচালক আয়েনউদ্দিন মোল্লা  কিন্তু পথেই সোবহানবাগ মসজিদের কাছে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকেরা। পালিয়ে বেঁচে যান আয়েনউদ্দিন।

বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনি ছাড়াও ছিলেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। গোলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসলেই ঘাতকেরা তাঁকে ঘিরে ধরে। মেজর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গের সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে যেতে থাকে। ঘাতকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে ?’ বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে মহিউদ্দিন ঘাবড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি- বেয়াদবি করছিস কেন ?’

এ সময় নিচতলা ও দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝি অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও নূর। বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় নূর ইশারা দিলে মহিউদ্দিন সরে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বজলুল হুদা ও নূর তাদের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। বঙ্গবন্ধুর বুকে ও পেটে ১৮টি গুলি লাগে। নিথর দেহটা সিঁড়ির মধ্যে পড়ে থাকে। সারা সিঁড়ি ভেসে যায় রক্তে। এই বঙ্গবন্ধু! ইয়াহিয়া খান তাঁর মৃত্যু পরোয়ানায় সই করেন। তাঁর কক্ষের পাশেই তাঁর কবর খোঁড়া হয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা তাঁকে পারেনি মারতে। যদিও দুই দেশের তখন তুমুল যুদ্ধ। সেই বঙ্গবন্ধুকে…! কে কারে মারে এই দেশে!

তারপর ঘাতকেরা বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকে। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই বেগম মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আমি যাবো না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো’। বেগম মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানান। এই নারী ! ৪৭, ৫২, ৬৬, ৬৯, ৭০ এবং একাত্তরেও যে মুজিবকে ছেড়ে যাইনি আজ কিভাবে ছেড়ে যাবে ! সারাজীবন স্বামী এক ভাঙ্গা নেীকা বেয়ে গেছেন আর তিনি ছিলেন নির্বাক দাঁড় টানা এক মাল্লা। আজ কিভাবে তাঁকে ছেড়ে যায় ! 

স্বামী প্রায় বছরের পর বছর জেলে। বেগম নিরবে নিভৃতে মেনে চলেন। এদেশে কার স্ত্রী কেমন ! একজন স্বামীর কত বড় একজন সর্বংসহা শিষ্য! এদেশে তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার। কিন্তু মুজিব আর বেগম মুজিবের জীবনে কখনও ঝগড়া হয়েছে তা কেউতো কোন দিন বলেনি! পঁচাত্তরের আগেতো বাংলাদেশের কেন্দ্র মানে বঙ্গবন্ধুর ড্রয়িংরুম। কোন মনোমালিন্য থাকলেতো আমরা জানতাম। আমরা এও জানি, পশ্চিম পাকিস্তানিরা এদেশের মানুষকে শোষন করে আর তাঁর স্বামীকে ফি-বছর জেলে পুরে। এই অভিমানে বেগম ফজিলাতুন নেছা জীবনে করাচি যাননি।

আবার আসি সেই কাহিনীতে। ঘাতকেরা শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর বেগম মুজিবকে তাঁর ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন।

শেখ রাসেল প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’ মহিতুল জবাব দেয়, ‘না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না’। এ সময় শেখ রাসেল তার মায়ের কাছে যেতে চাইলে আজিজ পাশা মহিতুলের কাছ থেকে জোর করে তাকে দোতলায় নিয়ে যেতে বলে। আজিজ পাশার কথা মতো এক হাবিলদার শেখ রাসেলকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। রাসেলের চোখ বের হয়ে যায়। আর মাথার পেছনের অংশ থেতলে যায়। রাসেলের দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে। তারপর চলে ঘাতকদের লুটপাট।
 
বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তার দু'মেয়ে ছিলেন না। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে ছিলেন। ছোট বোন শেখ রেহানাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। ১৬ আগস্ট, ১৯৭৫ বেলা ১১টায় শেখ মুজিবের লাশ সেনাবাহিনীর একটি ট্রাকে করে ক্যান্টনমেন্টে আনা হয়। কাফন কেনা হয় ক্যান্টিন স্টোরস ডিপার্টমেন্ট থেকে। এটি কেনা হয়েছিল বাকিতে ! হেলিকপ্টারযোগে লাশ দাফনের জন্য টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মৃতদেহের গোসল ও জানাজা দেওয়া হয়। জানাজায় শেখ মুজিবের চাচাসহ ডজনখানেক লোক শরিক হন! একটি অস্থায়ী চৌকি বসিয়ে কবরটি পাহারার জন্য রক্ষী মোতায়েন করা হয়। আহারে মুজিব। মৃত্যুর পরেও তাঁকে ভয় পায়! আজও কি মৃত মুজিব কারো কারো আতংক নয় ! 

পরের দিন পত্রিকায় খবর, মুশতাক রাষ্ট্রপতি ! কয়দিন আগেই না পত্রিকায় ছবি এসেছে খন্দকার মুশতাক বঙ্গবন্ধুকে বদনা করে ওজুর পানি ঢেলে দিচ্ছেন !

কয় দিন বাঁচে একটি মানুষ এই নশ্বর পৃথিবীতে। কিন্তু যে জীবন তিনি যাপন করে গেছেন তেমন জীবন এ পৃথিবীর কয়জনইবা পায় ! আর মহাকালের বিচারে মুজিবকে কি আদৌ মারা সম্ভব !

গোলাম সারোয়ার : গবেষক ও কলামিস্ট 

পাঠকের মন্তব্য