কোরবানির গোশত বণ্টন

কোরবানির গোশত বণ্টন

কোরবানির গোশত বণ্টন

মাহবুবুর রহমান নোমানি : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তা থেকে (কোরবানিকৃত জন্তুর গোশত) আহার কর এবং দুস্থ-অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ (সূরা হজ : ২৮)। অন্য স্থানে বলেছেন, ‘কোরবানির পশুর গোশত, রক্ত আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না। তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সূরা হজ : ৩৭)। সুতরাং কোরবানির গোশত নিজে খাবে, আত্মীয়স্বজনকে দেবে এবং গরিব-মিসকিনদের দান করবে। মুস্তাহাব হচ্ছে, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে একভাগ গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিতরণ করা, এক অংশ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে দেওয়া, আর এক অংশ নিজের পরিবারের জন্য রাখা। (ফাতওয়ায়ে শামি : ৫/২০৮)। 

গরিব-অসহায়দের না দিয়ে ডিপফ্রিজের গর্ভে সব গোশত ভরে রাখা অমানবিকতা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নফসের দমন আর দরিদ্রের কষ্ট বিমোচনের জন্যই কোরাবানির বিধান প্রবর্তিত হয়েছে। 

আত্মত্যাগ, আত্মবিসর্জন, পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি স্থাপন এবং গরিব-অসহায়দের মুখে হাসি ফোটানো কোরবানির প্রধান উদ্দেশ্য। সুতরাং আপনার ফ্রিজের গর্ভে নিহিত গোশত যেন দুঃখী হৃদয়ে আহ সৃষ্টি না করে। কেয়ামতের দিন যেন আল্লাহপাক জিজ্ঞেস না করেন হে বান্দা! ঈদের দিন আমি অনাহারে ছিলাম। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে আবুজর গিফারিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) অসিয়ত করে বলেছেন, ‘তুমি যখন ঝোলবিশিষ্ট তরকারি অর্থাৎ গোশত রান্না কর, তখন তাতে পানির পরিমাণ বেশি কর। অতঃপর তোমার প্রতিবেশীর বাড়িতে তা পৌঁছে দাও।’ (মুসলিম : ২৬২৫)। 

এ হাদিসটি আমাদের সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণির মানুষ নিয়েই সমাজ। আল্লাহপাক ধনীদের ওপর গরিবদের হক রেখেছেন। সেই হক আদায়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। তাহলেই সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করবে। কোরবানির গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন নিয়ম চালু রয়েছে। যার কোনো কোনোটি শরিয়তসম্মত নয়। যেমন অনেক এলাকায় এ নিয়ম আছে যে, সমাজপতিরা কোরবানিদাতাদের এক ভাগ গোশত তাদের কাছে জমা দিতে বলেন। সেই হিসেবে সবাই একভাগ গোশত একস্থানে জমা করেন। এটাকে সামাজিক গোশত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এরপর সমাজপতিরা সেই গোশত ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবার মাঝে সমান হারে বণ্টন করেন। এমনকি কোরবানিদাতাদেরও দেওয়া হয়। এ পদ্ধতি সঠিক নয়। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। যথা- 

১. কোরবানি দাতা হাদিয়া বা দান হিসেবে যে গোশত প্রদান করে, সেখান থেকে ফের গ্রহণ করা বৈধ নয়। কেননা হাদিসে দানকৃত বস্তু ফিরিয়ে নেওয়াকে কুকুরের বমি করে তা গিলে ফেলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
২. জমাকৃত গোশতে মান্নত, অসিয়ত ইত্যাদির গোশত থাকতে পারে, যা কোরবানিদাতা এবং ধনীদের জন্য খাওয়া জায়েজ নেই।
৩. সমাজে যে গোশত জমা করা হয়, তা গরিবদের হক। সুতরাং ধনী এবং সমাজপতিদের জন্য সেই গোশতের ভাগ নেওয়া কতটুকু বৈধ হতে পারে? 
৪. কোরবানিদাতা তার গোশত বণ্টনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীন। সে গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। বরং যাকে ইচ্ছা তাকে দিতে পারবে। বরং এটিই 

কোরবানির গোশত বণ্টনের সঠিক পদ্ধতি। কিন্তু সমাজপতিরা যদি কোরবানিদাতাকে গোশতের এক অংশ সমাজে জমা দিতে চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে তা ঠিক হবে না। তবে গরিবদের মাঝে সুষ্ঠু বণ্টনের জন্য কোরবানিদাতারা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক অংশ গোশত এক জায়গায় জমা করেন, আর সমাজপতিরা তা শুধু গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিলি করে দেন, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা অবৈধ হবে নয়। বরং এরূপ বণ্টনে কিছু উপকারিতাও রয়েছে। যেমন- 

এক. এতে গরিব-মিসকিনদের সবার বাড়ি বাড়ি যাওয়া লাগে না। বিধায় তারা লজ্জা ও লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা পায়।
দুই. মাথাপিছু সবাই সমানহারে গোশত পায়। 
তিন. সমাজের কোনো গরিব মাহরুম হয় না।
চার. সমাজের কাঠামো মজবুত হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সমাজনীতির কথা বলে শরিয়ত নির্দেশিত পন্থা পরিহার করা যাবে না। বরং সর্বাবস্থায় শরিয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে গোশত বণ্টন করতে হবে। 

কোরবানির গোশত বিক্রি করা নাজায়েজ। যদি বিক্রি করা হয়, তাহলে সে অর্থ সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। এমনিভাবে কোরবানির গোশত কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়। বরং হাদিয়া হিসেবে দেওয়া যাবে। (এমদাদুল ফতোয়া : ৩/৫৬৪)। শরিকি কোরবানির ক্ষেত্রে গোশত পাল্লা দিয়ে ওজন করে বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে বণ্টন করা যাবে না। পরস্পরে রাজি থাকলেও তা নাজায়েজ। কারণ কম-বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তা সুদের শামিল। (ফাতওয়ায়ে শামি : ৫/২২৩)। 

কোরবানির গোশত রান্না করে, শুকিয়ে শুঁটকি করে কিংবা ফ্রিজজাত করে রাখা জায়েজ আছে। অনেকে বলেন, কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না, তাদের কথা সঠিক নয়। বরং সারা বছর জমা রেখেও খেতে পারবে। এ মর্মে হজরত বিন আকওয়া (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোরবানি করবে, সে যেন তৃতীয় দিনের পর এমনভাবে সকাল না করে যে, তার ঘরে গোশত মজুত রয়েছে। পরবর্তী বছর সাহাবারা জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল! গত বছর আমরা যেরূপ করেছি এ বছরও কি সেরূপ করব? নবীজি (সা.) বললেন, না, বরং তোমরা খাও এবং মজুত রাখ। কেননা গত বছর মানুষ কষ্টের মধ্যে ছিল। আর আমি চেয়েছিলাম, তোমরা তাদের সাহায্য করবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 

লেখক : খতিব, আল মোহাজার জামে মসজিদ সাতাইশ, টঙ্গী

পাঠকের মন্তব্য