অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে নেওয়া বঙ্গবন্ধুর কিছু অমর বাণী 

অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে নেওয়া বঙ্গবন্ধুর কিছু অমর বাণী 

অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে নেওয়া বঙ্গবন্ধুর কিছু অমর বাণী 

বঙ্গবন্ধু বলছেন তাকে অনেকেই আত্মজীবনী লিখতে অনুরোধ করেছে। বিশেষ করে তার পরমা স্ত্রী যাকে তিনি ‘রেণু’ বলে সম্বোধন করতেন, তিনিই বঙ্গবন্ধুকে অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এর পরিপ্রেক্ষিতে যা বলেছেন সেটা প্রথম পৃষ্ঠাতেই রয়েছে।

‘বলতাম, লিখতে যে পারি না; আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি’

এই যে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘লিখতে যে পারি না’। এর ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও দেখতে পাওয়া গেছে। ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি আবারও বলেছেন; ‘ভাষার উপর আমার দখলও নাই’ এবং ১৪২ পৃষ্ঠায় বলেছেন; ‘এই সময় পাঞ্জাবে প্রগতিশীল লেখকদের একটা কনফারেন্স হয়। লেখক আমি নই, একজন অতিথি হিসাবে যোগদান করলাম’।

তার মানে তিনি নেহায়েত একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা, এর বাইরে আর কিছু নন তাই হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি যে লেখক নন অর্থাৎ যার লেখা বই নিয়ে বিশ্বের অগুনিত পাঠকের আজ যে আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং বিভিন্ন ভাষায় যে বই অনূদিত হচ্ছে, পাকিস্তান আমলে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি অবস্থায় (১৯৬৬-৬৭) যখন এই বইয়ের কথাগুলো তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন তখন তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন আগামীতে তার লেখা নিয়ে এত সব কাণ্ড হবে?

যাইহোক, দেখা যাক ১ নম্বর পৃষ্ঠার উল্লেখিত পরের কথাগুলো।

‘শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি’

কথা হলো, কী ছিল তার সেই নীতি ও আদর্শ? কে তার মধ্যে গেঁথে দিয়েছিল এমন একটি আদর্শ যার প্রতি বঙ্গবন্ধু জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত অটল ছিলেন?

চলুন যাওয়া যাক ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি কি বলছেন –

‘১৯৩৪ সালে যখন আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি তখন ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং খুব ভাল ব্রতচারী করতে পারতাম’।

বঙ্গবন্ধু বলছেন ‘লিখতে যে পারি না’ অথবা ‘ভাষার উপর আমার দখল নাই’ কিংবা ‘লেখক আমি নই’, এ সমস্ত বলার পরেও ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় স্বীকার করে নিচ্ছেন একটি কাজ তিনি ভাল পারতেন। শুধু ভাল পারতেনই না ‘খুব’ ভাল পারতেন। তিনি বললেন, খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এরপর বলছেন খুব ভালো ব্রতচারী করতে পারতাম।

যে সময়ের ঘটনা তিনি বলছেন তখন তিনি সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন এবং তখন তার বয়স হয়েছিল ১৪ বছর। মানে একজন তরতাজা তরুণ। 


অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে নেওয়া বঙ্গবন্ধুর কিছু অমর বাণী 

আসুন সবশেষে অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে উদ্ধার করা বঙ্গবন্ধুর কিছু অমর বাণীর সাথে পরিচিত হওয়া যাক। যেগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছেন প্রকৃত বঙ্গবন্ধু। গুরু সদয় দত্ত যেভাবে বলেছিলেন বাংলার জাতীয় জীবনকে পুন:জাগ্রত করতে হলে ষোলআনা বাঙালি হতে হবে, অথবা তার সেই বিখ্যাত উক্তি- ‘গাহো জয়, গাহো জয়, গাহো বাংলার জয়’, বঙ্গবন্ধুর বিশেষ বাণীগুলোর দিকে মনোযোগী হলে দেখা যাবে গুরু সদয় দত্ত আর বঙ্গবন্ধুর সুর যেন কোথায় এসে একটি সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছে।

‘একটা দালান ভেঙে পড়েছে, যেখানে বিষাক্ত সর্পকুল দয়া করে আশ্রয় নিয়েছে’ (পৃ: ৩)

‘ইংরেজরা মুসলমানদের ভাল চোখে দেখত না’ (পৃ: ৫)

 ‘আমি কোন কাজেই ‘না’ বলতাম না’ (পৃ: ১৯)

‘পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে’ (পৃ: ৪৭)

‘অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটি কারণ’ (পৃ: ৪৮)

‘নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়’ (পৃ: ৭৯)

‘আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই’ (পৃ: ৮০)

‘যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না (পৃ: ৮০)

‘যে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত তাদের মত হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নাই। আর যারা বাবা মায়ের স্নেহ আর আশীর্বাদ পায় তাদের মত সৌভাগ্যবান কয়জন!’ (পৃ: ৮৭)

‘উর্দু কি করে যে ইসলামিক ভাষা হল আমরা বুঝতে পারলাম না’ (পৃ: ৯৮)

‘কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে’ (পৃ: ১০০)

‘অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি খোদা আমাকে দিয়েছেন’ (পৃ: ১০৯)

‘জনসাধারণ চলছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন’ (পৃ: ১০৯)

‘প্রথমে সংঘবদ্ধ হোন, তারপর দাবিদাওয়া পেশ করেন, তা নাহলে কর্তৃপক্ষ মানবে না’ (পৃ: ১১২)

‘এখন বিলাত গিয়ে কি হবে, অর্থ উপার্জন করতে আমি পারব না’ (পৃ: ১২৫)

‘অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া চলতে পারে না’ (পৃ: ১২৬)

‘শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না’ (পৃ: ১২৬)

‘যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন’ (পৃ: ১২৮)

‘নির্যাতনের ভয় পেলে বেশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়’ (পৃ: ১২৮)

‘দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে’ (পৃ: ১৬৪)

‘দাঙ্গা করা উচিত না; যে কোনো দোষ করে না, তাকে হত্যা করা পাপ’ (পৃ: ১৭০)

‘স্বাধীন দেশের মানুষের ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাই, এর চেয়ে দু:খের বিষয় আর কি হতে পারে?’ (পৃ: ১৭১)

‘বাল্যস্মৃতি কেউ সহজে ভোলে না’ (পৃ: ১৭৭)

‘যে দেশের বিচার ও ইনসাফ মিথ্যার উপর নির্ভরশীল সেদেশের মানুষ সত্যিকারের ইনসাফ পেতে পারে কি না সন্দেহ!’ (পৃ: ১৯০)

‘আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ’ (পৃ: ১৯১)

‘মাতৃভাষার অপমান কোনো জাতি সহ্য করতে পারে না’ (পৃ: ১৯৭)

‘মানুষকে ব্যবহার, ভালবাসা ও প্রীতি দিয়েই জয় করা যায়, অত্যাচার, জুলুম ও ঘৃণা দিয়ে জয় করা যায় না’ (পৃ: ২০০)

‘মানুষের যখন পতন আসে তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে’ (পৃ: ২০৪)

‘মনের কথা প্রকাশ করতে পারলে ব্যথাটা কিছু কমে যায়’ (পৃ: ২০৭)

‘জনমতের বিরুদ্ধে যেতে শোষকরাও ভয় পায়’ (পৃ: ২১০)

‘আমি মুখে যা বলি, তাই বিশ্বাস করি। আমার পেটে আর মুখে এক কথা। আমি কথা চাবাই না’ (পৃ: ২১৮)

‘চিনের লোকেরা বাঙালিদের মত বক্তৃতা করতে আর বক্তৃতা শুনতে ভালবাসে’ (পৃ: ২২৪)

‘রাজ-রাজড়ার কাণ্ড সব দেশেই একই রকম ছিল। জনগণের টাকা তাদের আরাম আয়েশের জন্য ব্যয় করতেন, কোন বাধা ছিল না’ (পৃ: ২২৭)

‘ঘষামাজা করে রঙ লাগালে যে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয় তাতে সত্যিকারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। নিজস্বতা চাপা পড়ে’ (পৃ: ২৩৩)

‘বিদেশে না গেলে নিজের দেশকে ভালভাবে চেনা কষ্টকর’  (পৃ: ২৩৪)

‘পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না’ (পৃ: ২৩৪)

‘একমত না হওয়ার জন্য যে অন্যকে হত্যা করা হবে, এটা যে ইসলাম পছন্দ করে না এবং একে অন্যায় মনে করা হয়- এইটুকু ধারণা আমার আছে’ (পৃ: ২৪০)

‘যাদের সাথে নীতির মিল নাই, তাদের সাথে মিলে সাময়িকভাবে কোনো ফল পাওয়া যেতে পারে, তবে ভবিষ্যতে ঐক্য থাকতে পারে না। তাতে দেশের উপকার হওয়ার চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়ে থাকে’ (পৃ: ২৪৫)

‘যাদের নীতি ও আদর্শ নাই তাদের সাথে ঐক্যফ্রন্ট করার অর্থ হল কতকগুলি মরা লোককে বাঁচিয়ে তোলা (পৃ: ২৪৮)

‘আওয়ামী লীগের একটা জিনিসেরই অভাব ছিল, সেটা হল অর্থবল। তবে নি:স্বার্থ এক বিরাট কর্মীবাহিনী ছিল, যাদের মূল্য টাকায় দেওয়া যায় না’ (পৃ: ২৪৯)

‘যেখানে আদর্শের মিল নাই সেখানে ঐক্যও বেশি দিন থাকে না’ (পৃ: ২৫০)

‘মানুষকে ভালবাসলে মানুষও ভালবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও পারে। (পৃ: ২৫৭)

‘বাঙালিরা রাজনীতির জ্ঞান রাখে এবং রাজনৈতিক চেতনাশীল’ (পৃ: ২৫৭)

‘জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালবাসে; কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করতে তারা দিবে না’ (পৃ: ২৫৮)

‘যুগ যুগ ধরে পুঁজিপতিরা তাদের শ্রেণী স্বার্থে এবং রাজনৈতিক কারণে গরিব শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি সৃষ্টি করে চলেছে’ (পৃ: ২৬৬)

‘নীতিবিহীন নেতা নিয়ে অগ্রসর হলে সাময়িকভাবে কিছু ফল পাওয়া যায়, কিন্তু সংগ্রামের সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না’ (পৃ: ২৭৩)

‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনদিন একসাথে হয়ে দেশের কোন কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়’ (পৃ: ২৭৩)

‘কোন যুদ্ধ জোটে যোগদান করার কথা আমাদের চিন্তা করাও পাপ’ (পৃ: ২৭৯)

‘অনেক দিন কারাগারে বন্দি থাকার পরে মুক্তির আদেশ পেয়ে, জেলগেট থেকে আবার ফিরে আসা যে কত কষ্টকর এবং কত বড় ব্যথা, তা ভুক্তভোগী ছাড়া বোঝা কষ্টকর’ (পৃ: ২৮০)

- বঙ্গবন্ধু (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) 

 

পাঠকের মন্তব্য