মিয়ানমারের দুর্বল রোহিঙ্গারা কি করে বাংলাদেশে সবল 

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, উপ-সম্পাদকীয় : অনেকে বলে উপকারের ঘাড়ে লাত্থি। অনেকে না। আসলে এটি একটি গ্রামীন প্রবাদ। এই কথাটি আবার বিভিন্নভাবে অনুবাদ হয়। যার অর্থানুবাদ আসে এমন যে যার উপকার আপনি করবেন তার দ্বারা আপনার ক্ষতি হবেই। ফলত সমস্ত দোষ উপকারের ঘারে এসে পড়ে। তাই উপকার করা যাবে না বা উপকার করলেও ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে যেন উপকার করা হয়।

রোহিঙ্গা মায়ানমারের একটি মুসলিম সংখ্যালঘু জাতি, যাদেরকে অনেক মায়ানমারি বৌদ্ধরা বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসী হিসাবে হিসেবে গণ্য করে। রোহিঙ্গারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মায়ানমারে বসবাস করে আসছে এবং বাংলাদেশ সরকার মায়ানমার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেবার জন্য বলছে। মায়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং তাদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাচারিত সংখ্যালঘু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং চরমপন্থী বৌদ্ধদের হাতে নির্যাতিত। রোহিঙ্গা শব্দটিও উচ্চারণ নিষিদ্ধ মিয়ানমারে৷ মানবতার প্রতীক ভ্যাটিকানকেও খামোশ করে দিয়েছে মিয়ানমার৷ 

ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারসন ডিকসন বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যু শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যই এটা বড় হুমকি। বিশ্বে অনেক সমস্যা আছে, এর মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট অন্যতম। 

মিয়ানমারের সেনাদের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশের পালিয়ে আসার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে পাঁচ দফা দাবিতে গতকাল সমাবেশ করেছে রোহিঙ্গারা। জানাগেছে, রোববার সকালে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ক্যাম্প-৪ এর এক্সটেনশনে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটসের নেতৃত্বে এ সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে রোহিঙ্গারা তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের বিচারসহ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত, ভিটেবাড়ি পুনরুদ্ধার, আন্তজার্তিক নিরাপত্তা জোরদার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সমাবেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনসহ পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। 

রবিবার বাংলাদেশে আসার দুই বছর পূর্তির দিনে লাখলাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে সমাবেশ করে এই অবস্থানের কথা তুলে ধরে।

সমাবেশটি কেবলি দুই বছর পূর্তির লক্ষ্য ছিলো না। মিয়ানমারের সেনাদের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশের পালিয়ে আসার রোহিঙ্গাদের  দুর্বলতা কাটিয়ে বেশ প্রাণচঞ্চল দেখাচ্ছিল, ঐক্যবদ্ধ দেখাচ্ছিল। কিন্তু আমার প্রশ্ন, সেটা বাংলাদেশে এসে কেন ? মায়ানমারে থাকতে কেন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে পারেনি ? সেদিনগুলিতে কেন আজকের এই হুকার প্রকাশ পায়নি ? মিয়ানমারের সেনাদের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে কেন তারা গর্জে উঠতে পারেনি ?    

রোহিঙ্গাদের গতকালের মহাসমাবেশ থেকে অনেক ম্যাসেজ রয়েছে, বাংলাদেশ সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক কোন সম্প্রদায় দ্বারা তাদের জোরপূর্বক মায়ানমারে পাঠানো সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, সমাবেশটি ছিলো পরিকল্পিতভাবে সাজসজ্জা্র এবং পোশাকেও ছিলো ভিন্নতা। সেই দিনের রোহিঙ্গারা আজ কতটা শক্তিশালী অবস্থানে সেটাই জানান দেওয়া হয়েছে। এই শক্তি প্রকাশ কাদের বিরুদ্ধে পরিষ্কার নয়- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নাকি মায়ানমারের বিরুদ্ধে নাকি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সহিংশতার হুমকি ?         

এ দেশে 'মানবতা'র সুযোগে আশ্রয় নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফেরত না যায়, সে ব্যাপারে কিছু এনজিও ইন্ধন যোগাচ্ছে এবং সেখানে রাজনীতি করছে। রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় এবার দ্বিতীয় দফায় গত বৃহস্পতিবার তাদের ফেরত পাঠানোর সব প্রস্তুতি নেয়ার পরও তা শুরু করা সম্ভব হয়নি। 

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত দেশি-বিদেশী এনজিওগুলি ইন্ধন যোগাচ্ছেন। এদের ওপর সরকারের নজরদারি বাড়াতে না পারলে রোহিঙ্গাদের এই শক্তি অপশক্তির রূপ নিয়ে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যাবে না। দেশি-বিদেশী এনজিওগুলি ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বাহির করা এখনি জরুরি। 

রোহিঙ্গাদের সামবেশে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মধুরছড়ার কয়েকটি পাহাড় ও নিচের খেলার মাঠ লাখো লাখো রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে ভরে যায়। এই সমাবেশে আসা রোহিঙ্গারা অধিকাংশই একই টি-শার্ট পরে, এক ধরনের ছাতা হাতে এসেছিলেন, যেখানে লেখা  ছিলো 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস।' তবে বেশিরভাগ রোহিঙ্গাদের জাতীয় পোশাক টুপি সাদা শার্ট ও লুঙ্গি পরেই আসেন। সময় স্লোগান ছিল, ‘নিরাপদে ঘরে ফিরতে চাই, গণহত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চাই’, ‘নাগরিকত্ব ফেরত চাই’।    

এখন সব মিলিয়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের জন্য ক্রমশ হুমকি হয়ে উঠছে মিয়ানমার থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের টেকনাফ- উখিয়ায় রোহিঙ্গারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাওয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বাইরে থেকেও হুমকি সৃষ্টি করছে তারা। 

রোহিঙ্গাদের প্রতি সমবেদনা এবং মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি সংহতি এবং রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের তাগিদ জানিয়ে আসছে বিশ্ব সম্প্রদায়। চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা শুরু হয়নি। এমনকি কবে থেকে শুরু হবে তাও নির্দিষ্ট করে জানা যাচ্ছে না। কাজেই প্রত্যাবর্তনে প্রক্রিয়া শুরু বা সম্পন্ন হওয়া নিয়ে একটা বড় আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা ঠিক হয়েছিল। রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় সেবার একজনকেও রাখাইনে পাঠানো যায়নি। গত ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসন শুরুর দিনক্ষণ ঠিক হলেও রোহিঙ্গাদের সেই পুরনো অনাগ্রহে দ্বিতীয় দফায়ও ভেস্তে গেল প্রত্যাবাসন।

গত ৪০ বছর ধরে নাফ পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা৷ ‘আশ্রয় নিচ্ছে' না লিখে ‘আছড়ে পড়ছে' লিখতে হচ্ছে কারণ, রোহিঙ্গারা অভিবাসিত হতে আসেনি বাংলাদেশে৷ তাদের স্বেচ্ছায় নিজ দেশ ছেড়ে আসার প্রশ্নই আসে না৷

মানবতার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে দূরদর্শী ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ সরকার।নির্যাতিত মুসলমান জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারে তাদের অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করে ওঠে আসার সংগ্রামরত একটি দেশ বাংলাদেশ। দেশ যখন একদিকে প্রবল বন্যা আক্রান্ত, লাখ লাখ বানভাসি মানুষের দুর্গতি লাঘবে সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করছেন, ঠিক সেই সময় প্রতিবেশী মিয়ানমারে শুরু হয়েছে গণহত্যার পুনরাবৃত্তি। লাখ লাখ মানুষ বন্যার পানির মতো বাংলাদেশে ঢুকছে। নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। 

ইউএনএইচসিআর- এর শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেছেন, শরণার্থীদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষ যে মমত্ববোধ দেখিয়েছে, তা তিনি তার কর্মজীবনে কখনো দেখেননি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েই শুধু ক্ষান্ত হননি এই সংকট নিরসনে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ৭২তম সাধারণ অধিবেশনে দেয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে কফি আনান কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নসহ তিনি সুনির্দিষ্ট পাঁচ দফা প্রস্তাব রাখেন। এরই মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য জাতিসংঘের মহাসচিবকে এক বিশেষ অধিবেশনে পুরো রোহিঙ্গা সংকটটি ব্যাখ্যা করতে আহ্বান জানিয়েছে। সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ৫ দফা প্রস্তাব প্রতিধ্বনিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের কণ্ঠে। 

রোহিঙ্গাদের এই স্রোত বিপরীতে বইবে, অর্থাৎ তাদের ঢেউ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারমুখী হবে, বাংলাদেশ সরকারের এমন আশায় ভরসা পাওয়া যাচ্ছে না৷ বরং ‘নব্য অক্ষশক্তি' চীন, রাশিয়া ও ভারত স্বার্থ হাসিলের নীতি নিয়ে যেভাবে বর্বর বার্মিজ সেনাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তাতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী যাত্রাপথ হয়ত একমুখী হতে যাচ্ছে৷ যে পথে শুধু আসা যায়, ফেরার উপায় থাকে না৷

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান,

প্রকাশক ও সম্পাদক - প্রজন্মকন্ঠ । 

 

পাঠকের মন্তব্য