বেগম মুজিবকে ‘গেরিলা’ আখ্যায়িত করলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের প্রত্যেকটি নেতা-কর্মীকে জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শনিবার বিকেলে গণভবনে জাতির পিতার ৪৪তম শাহাদত বার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং ৭৫ এর ১৫ আগস্টের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের নিয়মিত প্রকাশনা ‘মাতৃভূমির’ মোড়ক উন্মোচন করেন এবং ছাত্রলীগের মাসিক পত্রিকা ‘জয় বাংলার’ ও মোড়ক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে জাতিগঠনে ছাত্রলীগের ভূমিকা নিয়ে একটি ৩ মিনিটের ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়। খবর বাসসের।

জাতির পিতা তার সারাটি জীবন কষ্ট সহ্য করেছেন এমনকি তার জীবনটি পর্যন্ত মানুষের জন্য দিয়ে গেছেন উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আজকে আমাদের এটাই প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, জাতির পিতা এ দেশের মানুষের কল্যাণে তার সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন সেই মানুষের কল্যাণে কতটুকু আমরা কাজ করতে পারলাম, সেই হিসেবটাই আমাদের করতে হবে। কতটুকু আমরা দিতে পারলাম-সেটাই হবে একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগ আমার বাবার হাতে গড়া। আমিও একদিন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম। সেই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। সেখান থেকেই আমার যাত্রা। কাজেই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের এইটুকুই বলব চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে আদর্শের সঙ্গে নিজেকে গড়ে তুলবে। দেশের মানুষকে কিছু দিয়ে যাবে, যেন জাতির পিতার আত্মা শান্তি পায়।’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদি হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক মো. জোবাইর হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগ সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান হৃদয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জিব চন্দ্র দাস এবং সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেইন আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং এর সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সভা পরিচালনা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক সহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে দেশের উন্নয়ন হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ১০টি বছরের মধ্যে আজকে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। একাত্তরের পরাজিত শক্তির পদলেহনকারীরা ’৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশের ক্ষমতায় ছিল বলে তারা দেশের কোন উন্নয়ন না করে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, ৭৫-এর পর জাতির পিতার হত্যার প্রতিবাদকারী এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও অনেক সাথিদের আমরা হারিয়েছি। যে তালিকায় ছাত্রলীগের বহু নেতা-কর্মীর আত্মত্যাগ রয়েছে। আর বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জনের ইতিহাসের সঙ্গে ছাত্রলীগের নাম জড়িত।

তিনি বলেন, আমি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের এইটুকুই বলব, সেই শোককে বুকে নিয়ে, সেই আদর্শকে বুকে নিয়ে, সব ব্যথা, বেদনাকে বুকে চেপে রেখে দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, নিজের জীবনে কোন ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া রাখিনি। নিজে কি পাব না পাব বা ছেলে-মেয়ে কি পাবে না পাবে সেই চিন্তা আমাদের ছিল না। আমরা দুটি বোন সবকিছু ত্যাগ করে সর্বান্তকরণে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা অনেক সঙ্গীর সঙ্গে দিনের পর দিন মিটিং করেছি, মিছিল করেছি, তারা অনেকে জীবন দিয়ে গেছেন সেই মহান মুক্তিযুদ্ধে। পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর অনেকে বিভ্রান্তিতে আদর্শচ্যুত হয়েছে। এটাই হচ্ছে সব থেকে দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।’ প্রধানমন্ত্রী কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির পিতার প্রচেষ্টা তুলে ধরে এর বিভিন্ন আঙ্গিকগত বিশ্লেষণ করেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতা বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ১০ বছরের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত পেত। জাতির পিতা এই দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারতেন।

শেখ হাসিনা জাতির পিতার আজন্ম লড়াই সংগ্রামের ইতিবৃত্ত আলোচনা করতে গিয়ে তার মা এবং বঙ্গবন্ধু সহধর্মিণী এবং সহযোদ্ধা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ত্যাগ-তিতিক্ষার ইতিহাসও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের জন্য স্মৃতি রোমন্থনে তুলে আনেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষের কল্যাণে কেবল আমার বাবাই নয়, আমার মা, তিনিও তার জীবনটা দিয়ে গেছেন।’

মায়ের দৃঢ়চেতা মনোভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে যখন আমার বাবাকে হত্যা করা হয়, আমার মাকে খুনিরা বলেছিল আপনি চলেন। তিনি বলেন, না আমিতো কোথাও যাব না। তোমরা ওনাকে (বঙ্গবন্ধু) খুন করেছ আমাকেও শেষ করে দাও। এখান থেকে আমি এক পাও নড়ব না।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার মা ওদের কাছে (ঘাতক) জীবন ভিক্ষা চাননি, কোন কাকুতি মিনতিও করেননি। বীরের মতোই বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে।

তার ছদ্মবেশ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাও ধরতে না পারায় বেগম মুজিবকে একজন ‘গেরিলা’ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এসবির ৪৭টি ফাইল পাওয়া গেলেও (যেটি বর্তমানে সিক্রেট ডকুমেন্ট অব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামে ১৪ খণ্ডের বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।) বেগম মুজিবের গোপন তৎপরতা নিয়ে কোথাও কোন রিপোর্ট নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মা একহাতে যেমন সংসার সামলেছেন, জাতির পিতা মামলা সামলে তাকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আবার দলের সঙ্গে কারাবন্দী বাবার যোগসূত্র রক্ষা করে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, কিন্তু নিজের জন্য কোনো দিনও কিছু চাননি।

পাঠকের মন্তব্য