আন্তর্জাতিক গুম দিবস যেন মায়েদের কান্নার প্রতিফলন : মঞ্জুর হোসেন ঈসা

আন্তর্জাতিক গুম দিবস যেন মায়েদের কান্নার প্রতিফলন : মঞ্জুর হোসেন ঈসা

আন্তর্জাতিক গুম দিবস যেন মায়েদের কান্নার প্রতিফলন : মঞ্জুর হোসেন ঈসা

শুরুতেই গভীর শ্রদ্ধার সাথে সকল শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধাসহ যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন তাদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সেই সাথে গত ৬ বছরে গুম হওয়া সদস্যদের মা ও বাবারা যারা না ফেরার দেশে চলে গেছেন তাদের প্রতিও আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। প্রতিবছর এই দিনটি এলেই আমরা আপনাদের কাছে ছুটে আসি এবং আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পারে আমরা আমাদের সন্তানদেরকে হারিয়ে কত কষ্টে জীবনযাপন করছি। দেখতে দেখতে ৬টি বছর শেষ হয়ে গেলো। সামনে চলে এলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

নির্বাচনে বর্তমানে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। আমাদের মায়ের ডাকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতি একটি দাবি রয়েছে- আর সেই দাবিটি হলো 'দলীয় ইশতেহারে গুম হওয়ার বিষয়ে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে' অর্থাৎ যারা আগামীতে ক্ষমতায় আসবে তারা কি গুম ও খুনের পথ বেছে নেবে ? নাকি এই পথ পরিহার করে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেবে। 

আমরা আরেকটি দাবি তুলতে চাই তাহলো- বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যারা গুমের শিকার হয়েছে তাদের তদন্ত করে প্রতিবেদন তুলে ধরার জন্য একজন বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দাবি করছি।

গত ৬ বছরে গুম হওয়া কেউ ফিরে আসেনি। কিন্তু গুম হওয়া পরিবারের অনেকেই কাঁদতে কাঁদতে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মুন্নার বাবা যে এই প্রেসক্লাবে এসে সন্তানের ফিরে আসার দাবি জানিয়েছিল তিনি চিরদিনের জন্য আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। মুন্নার মা ময়ুরী বেগম কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অন্ধ। পারভেজ হোসেনের বাবা ও শশুর গত ৬ বছরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তার ছোট্ট মেয়ে হৃদি এখন কাউকে দাদু-নানু ডাকতে পারে না। সাইফুর রহমান সজীবের মা রেনু রহমানও না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তার পিতা শফিকুর রহমান এখন নির্বাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঝন্টুর বাবাও মৃত্যুবরণ করেছেন। লাকসামের হুমায়ুন কবির পারভেজের বাবাও না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মায়ের ডাকের মায়েরা কাঁদতে কাঁদতে এখন আর আগের মত কাঁদতেও পারে না। দুই চোখে ঝাপসা দেখে। তারপরেও ঝাপসা চোখেও প্রত্যাশা করে এই বুঝি প্রিয় সন্তান ফিরে আসবে। আমরা আর কাঁদতে চাই না, আমাদের প্রিয়জনকে ফিরে পেতে চাই। যাদেরকে গুম করা হয়েছে তাদের কি অপরাধ তা আমরা স্পষ্টভাবে জানতে চাই। এত অপেক্ষা করতে আর ভাল লাগে না। রামপুরার তপু'র বাবাও কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে তিনিও না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তপু'র মা সালেহা বেগম এখন খুবই অসুস্থ, কুমিল্লার শাওনের বাবা-মা এতবেশী অসুস্থ যে এবার শত ইচ্ছা থাকলেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারবে না। কুমিল্লা থেকেই তিনি কাঁদতে কাঁদতে আহ্বান জানিয়েছেন তাদের সন্তানকে যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়। না হলে এভাবেই তারাও একসময় না ফেরার দেশে চলে যাবেন।

কুষ্টিয়ার সবুজের পিতা বীরমুক্তিযোদ্ধা কাইজার হোসেন এখন আর কারো সাথে কথা বলে না। সবুজের ছোট মেয়ে সুমাইয়া এসেছে। সে তার সেরা উপহার তার বাবাকে ফেরত চায়। সবাই তাদের স্বজনদের ফেরত চায়। ইতিমধ্যেই গুম হওয়া অনেকেই ফিরে এসেছে। তাদের ফিরে আসায় আমরা নতুন করে স্বপ্ন বুনছি এবং স্বপ্ন দেখছি এই বুঝি আমাদের প্রিয় মানুষটিও ফিরে আসবেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি তো মানবতার মা। এদেশের ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা আশা করছি মায়ের বুকগুলো পূর্ণ করে আপনি তাদের সন্তানদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। আপনার একটি সিদ্ধান্তই অসহায় মায়েরা মৃত্যুর আগে তাদের সন্তানদেরকে শেষ দেখা দেখে যেতেও পারেন। অনেকেই সন্তানের কষ্টে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। যে'কজন মা ও বৃদ্ধ পিতারা বেঁচে আছেন তাদেরকে আপনি নিরাশ করবেন না। আপনার দিকে সকল অসহায় দু'হাত তুলে প্রার্থনা করছে আপনি তাদের দিকে একবার তাকান এবং তাদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। যা হবে ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। 

পাঠকের মন্তব্য