সড়কে বেপরোয়া চালকের শক্তির উৎস কোথায় ?

সড়কে বেপরোয়া চালকের শক্তির উৎস কোথায় ?

সড়কে বেপরোয়া চালকের শক্তির উৎস কোথায় ?

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলন ও সরকারি নানা উদ্যোগ, ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন তৎপরতার পরও রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরেনি। সড়কে চলাচল সঙ্কেত ঠিক নেই। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলছেই, যথেচ্ছ পার্কিং করে মাঝ সড়কে যাত্রী ওঠা-নামা চলছেই। চালকের বেপরোয়া মনোভাব বন্ধ হয়নি। ফলে সড়কে রক্ত ঝরছেই। অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ পথচারী-যাত্রীরা। দুর্ঘটনা ঘটানোর কারণে যেসব পরিবহনের চলাচল নিষিদ্ধ হয়েছে সেগুলো নাম এবং রং পরিবর্তন করে দিব্বি সড়কে চলছে। রুট পারমিট এবং সড়কে যান নামানোর এত সাহস মালিকরা পায় কিভাবে ? নাম ও রং পরিবর্তন করে বাড্ডা-রামপুরা রুটের সেই আলোচিত সুপ্রভাত পরিবহন। বনে গেছে আকাশ ও ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহন। উত্তরায় বাস চাপায় নিহতের ঘটনায় প্রতিবাদ করায় পিষে মারার সাহস দেখাচ্ছেন ঘাতক চালক।

বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, সড়কে বেপরোয়া চালকের শক্তির উৎস কোথায়? তবে সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে এক শ্রেণির পথচারী ও যাত্রীরও যথেষ্ট সচেতনার অভাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা, পুলিশ কর্মকর্তা ও গাড়ি মালিকদের দাপটে রাজধানীতে চালক-হেলপাররা আবার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করছে না। বিপজ্জনক ওভারটেকিং ও যাত্রীবোঝাই বাস-মিনিবাস নিয়ে তারা মরণ ঝুঁকির পাল্লাপাল্লিতেও লিপ্ত হচ্ছে অহরহ। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, যাত্রী-পথচারীরাও প্রাণ হারাচ্ছেন গাড়ির চাপায়।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিবহন ব্যবসায় জড়িত। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন রয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা। শীর্ষ সারির সাবেক দুই পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন যাদের বিভিন্ন কোম্পানিতে বেশকিছু বাস রয়েছে। আর এসব ব্যক্তির গাড়িতেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে।

পুলিশেরই মাঠপর্যায়ের একাধিক সদস্য বলেছেন, ওই বাস দু’টির চালকরা এতটাই বেপরোয়া, তারা কখনো কিছুই তোয়াক্কা করে না। ইচ্ছেমতো গাড়ি চালায়। তাদের ধারণা ওই গাড়ি কোনো পুলিশ আটক করতে পারবে না। গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালে মহাখালীতে ফুটপাতে উঠে বাস চাপায় নিহত হন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মকর্তা ফারহানাজ (২৮)। নিহতের দেড় বছরের কন্যা সন্তান ইসরা এখনো জানে না ঘাতক বাস চালক তার মায়ের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। একই দিন সকালে উত্তরায় ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন সংগীত পরিচালক ও শিল্পী পারভেজ রব। দুই দিনের ব্যবধানে এ ঘটনায় প্রতিবাদ করায় রোববার রাতে উত্তরায়ই ভিক্টর পরিহবনের আরেকটি বাস চাপা দিয়ে হত্যা করে মেহেদী হাসান ছোটনকে (২০)। নিহত শিল্পী পারভেজ রবের ছেলের বন্ধু ওই ছোটন। একই বাসের ধাক্কায় রবের ছেলে আলভী রবও আহত হন। এর আগে গত মাসের শেষ দিকে রাজধানীর বাংলামোটরের ট্রাস্ট পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় এক পা হারান সরকারি কর্মকর্তা কৃষ্ণা চৌধুরী। তিনি এখনো পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের হিসেব মতে, সড়কে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছেই। সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১২ জন ব্যক্তি প্রাণ হারাচ্ছেন সড়ক দুঘর্টনায়। বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েও বেপরোয়া চালকদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সংসদে জানিয়েছেন, পুলিশের তথ্য অনুসারে গত পাঁচ বছরে ১২ হাজার ৫৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। দুর্ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসমূহের নিষ্পত্তির জন্য আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার উত্তরা-বাড্ডা-রামপুরা-কাকরাইল ও যাত্রাবাড়ী রুটের আতঙ্কের নাম ভিক্টর, আকাশ, তুরাগ, রাইদা, আকিক, অছিম ও নূরে মক্কা পরিবহন। এসব বাস সড়কে চলাচলে কোনো নিয়ম-কানুনের ধার ধারে না। যেখানে ইচ্ছা সেখানেই হঠাৎ করে বাস থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করাচ্ছে। আবার নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে বেপরোয়া গতিতে বাস চালাচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে বাসগুলো আগের মতোই এলোপাতাড়িভাবে পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে, বাসের গেট বন্ধ রাখা হচ্ছে না। বাসের ভেতরে চালকের ছবি ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি ঝুলিয়ে রাখা হয়নি। চোখের সামনে ঘটলেও রহস্যজনক কারণে ট্রাফিক পুলিশও এসব বাস চালকদের আইনের আওতায় আনছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নগরীর সড়কপথে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ চিহ্নিত করে, স্টপেজ ছাড়া অন্য কোনোখানে বাস থামানো কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ করা গেলে যানজট ও দুর্ঘটনা সমস্যার এক চতুর্থাংশ সমাধান করা সম্ভব।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় বেপরোয়া বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে তীব্র আন্দোলন করে কোমলমতি সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নজিরবিহীন ওই আন্দোলনের পর সরকারি সংস্থাগুলো বলেছিল, শিশুদের এই আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সড়কে চলমান বিশৃঙ্খলা আর অনিয়ম বন্ধে নেয়া হয় নানা উদ্যোগ, ছিল নানা প্রতিশ্রতিও। তবে চোখ খুলে দেয়ার পরও সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল থামেনি।

এরপর চলতি বছরের শুরুর দিকে ফের রাজধানীর নদ্দা এলাকায় প্রগতি সরণি রোডে জেব্রা ক্রসিংয়ে বাসচাপায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার নিহতের ঘটনায় আবারো ওঠে নিরাপদ সড়কের দাবি। এত আন্দোলন, সচেতন মহলের উদ্বেগ, বিশেষজ্ঞের মতামত আর সংশ্লিষ্ট মহলের আশ্বাসের পরও সড়ক পথে নৈরাজ্য চলছেই। প্রতিদিনই কারো না কারো রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথ। বাসচালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা, যত্রতত্র থামানো, চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার-সবই চলছে।

জানা যায়, আন্দোলনের মুখে এক সময় এই সুপ্রভাত পরিবহন কোম্পানির নিবন্ধন বাতিল করা হয়। সুপ্রভাত কোম্পানি বন্ধ হলেও ওই কোম্পানির বাস কিন্তু বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন কোম্পানিতে সেগুলো ভাগ ভাগ হয়ে ঠিকই এখন রাস্তায় সেই বাসগুলো চলছে। এর কিছু বাস ভিক্টর পরিবহন ও আকাশ কোম্পানিতে যুক্ত হয়েছে। এই বাসটি টঙ্গী থেকে কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত চলাচল করে।

পরিবহন সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর হয়ে আবদুল্লাহপুর রুটে পরিচালিত এই পরিবহনে অনুমোদিত গাড়ি আছে মাত্র ৫০টি। অথচ একই সাইনবোর্ডে ১৩০টিরও বেশি গাড়ি চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আজিমপুর, মিরপুর-১২, কুড়িল ও সদরঘাট রুটে চলাচলকারী বিহঙ্গ নামের পরিবহনের গাড়ির সংখ্যা ৩০০ এর উপরে। তবে সবই লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা। বিহঙ্গ পরিবহন কোম্পানির চেয়ারম্যান স্বেচ্ছাসেবক লীগের একজন শীর্ষ নেতা। এসব পরিবহন দুর্ঘটনা ঘটালে রাতারাতি কোম্পানির নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। জাবালে নূর পরিবহন এয়ারপোর্ট রোডে ফুটপাতে তুলে দিয়ে ছাত্র হত্যার ঘটনা ঘটায়।

ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। যাতায়াত ক্ষেত্রে নিত্য ভোগান্তির শিকার ক্ষুব্ধ নাগরিকরা বলেন, দেশের সর্বত্র উন্নয়নের আলো পৌঁছালেও পরিবহন সেক্টরে এখনো রয়েছে যেন দুর্ভিক্ষের ছাপ। ঢাকার রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ে লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন। বাস-মিনিবাসের বাম্পারসহ নানা অংশ খুলে ঝুলতে থাকে বিপজ্জনকভাবে। কোনোটির রং চটা, কোনোটির ছাল ওঠা।ফিটনেসবিহীন শত শত গাড়ির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে রাজধানী। রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন।

জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের নেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সম্প্রতি রাজধানীসহ সারাদেশে সড়কে ফের চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। প্রায় দিনই সড়কে মানুষের প্রাণ ঝরছে। এসব চালকের লাগাম টেনে ধরা জরুরি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় চালক, পথচারী, মালিক ও প্রভাবশালী সবাই আইন মেনেছে। কারণ তারা তখন বিপদে ছিল। এখন বিপদে নেই। এ জন্য কেউ আইন মানছে না, কাজও করছে না। সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষ যেন উদাসীন।

অন্যদিকে বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, চালকরা এমনিতেই বেপরোয়া। আর যে গাড়ির মালিক যত ক্ষমতাধর সেই গাড়ির চালক ততটাই বেপরোয়া হবে; এটাই যেন স্বাভাবিক।

পাঠকের মন্তব্য