অর্থনীতিতে যেভাবে পাকিস্তানকে পেছনে ফেললো বাংলাদেশ

অর্থনীতিতে যেভাবে পাকিস্তানকে পেছনে ফেললো বাংলাদেশ

অর্থনীতিতে যেভাবে পাকিস্তানকে পেছনে ফেললো বাংলাদেশ

ইকবাল আহমেদ লিটন : মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, আমি কোন অপরাধী কোন গুনাহগার অথবা কোন নাফরমান কওমকে হুট করে সাজা দিইনা। আমি আমার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদেরকে সুযোগ ও সময় দিয়ে থাকি তারপরও যখন তারা সোজা পথে ফিরে না আসে আমি তাদেরকে পাকরাও শুরু করি আর যখন শুরু করি তখন এর শেষ পর্যন্ত দেখি তারা ফিরছে কি না? এরপরও যদি না ফিরে তখন আমি সোজা জাহান্নামের দিকে তাদেরকে চালিয়ে দিই। আর তখন তারা বাচাঁর জন্য এদিক-সেদিক দৌড়াঁদৌড়িঁ করতে থাকে কিন্তু কাউকে সেদিন তাদের সাহায্যকারী হিসাবে পাবেনা।

যাইহোক, আজকের পরিস্থিতি আমাকে মহান আল্লাহর সে বাণীই মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেদিন পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র হয়েও আমাদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট বাংলাদেশে অতর্কিত বর্বরোচিত হামলা করে নিরপরাধ ও নিরস্ত্রধারী বাংলাদেশকে যে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল পর্যায়ক্রমে সে যুদ্ধে যে হত্যা, অত্যাচার, নির্যাতন চালিয়েছিল তা মনে করলে আজও বাংলার প্রত্যেক দেশপ্রেমিক মানুষের শরীরের লোম খারা হয়ে যায়, বিনা আঘাতে চোখের পানি এসে যায়।

একটি মুসলিম জাতি হয়ে আরেকটি মুসলিম অধ্যুসিত এলাকায় বা মানবজাতি হিসাবে বিনা অপরাধে এই ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথীবির ইতিহাসে নজীর স্থাপন করেছিল একাধারে ৯ মাস পর্যন্ত তারা বাংলার মানুষকে যে বর্বরোচিত হামলা আর নির্যাতন চালিয়েছিল সম্ভবত তা বদর, ওহুদ, ও খন্দকযুদ্বে কোন কাফেরেরাও করেনি কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকালের মত তখন মিডিয়ার কোন সুযোগ ছিলনা বলে বাঙালি জাতির অনেক ইতিহাস অজানাই রয়ে গিয়েছিল।

তাই মহান আল্লাহর হুকুমে সেদিন পার্শ্ববর্তী বন্ধুদেশ হিন্দুস্তান/ভারতীয়রা যদি আমাদের পাশে এসে না দাড়াঁতো তাহলে আজকের বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হতো। তবে আফসোসের বিষয় হলো সেদিন পাকিস্তান আত্বসমর্পনের মাধ্যমে যে পরাজয় বরণ করেছিল তারা কখনও সে পরাজয়ের গ্লানি মুচে ফেলেনি, প্রতিহিংসাতে তারা অগ্নিবারুদ বনে বারবার বাংলাদেশকে আঘাত করতে লাগলো।

বাংলাদেশকে স্বাধীনতা স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য আরব বিশ্বে মহামিথ্যার প্রচারনা করতে লাগল যে, বাংলাদেশ হিন্দুস্তানের উস্কানিতে ও প্ররোচনায় যুদ্ধ বাধিঁয়েছে। আরও অনেককিছু আছে যে বাংলাদেশ যাতে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে না পারে সে জন্য বিশ্বের দরবারে সীমাহীন ষড়যন্ত্র করতে থাকে এবং সেই ষড়যন্ত্রের বহ্নিশিখা গিয়ে পরলো বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার বর্গের উপর। শুরু হলো তাকে হত্যার মহাপরিকল্পনা- সদ্য প্রসূত স্বাধীন রাষ্ট্র, যুদ্ধবিদ্ধস্থ দেশ ও জাতি- দেশের মিল কারখানা, ব্যাংক, ব্রীজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সকল স্তরে ধ্বংসের লীলা, অর্থনীতির সবপর্যায় ভঙ্গুর এমন এক নাজুক ও অব্যবস্থাপনার পরিস্থিতিকে সেদিন পাকিস্তানিরা কাজে লাগাতে সমর্থ হয়, অতি সুচারু ও সুক্ষভাবে মাষ্টারপ্লান নিয়ে তারা হাজির হয় -এই দেশীয় কিছু কুলাঙ্গার, স্বার্থলোভী, বেঈমান ও মোনাফেক লোকের কাছে, ঠিক সময়মত তাদেরকে সংগ্রহ করে অতি সংগোপনে ষড়যন্ত্রের বীজ রোপন করে শেষ পর্যন্ত সাড়েতিন বৎসরের মধ্যেই তাদের ষড়যন্ত্র সফল হয়ে গেল, হত্যাকরা হলো এই দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলাদেশের সোনালি উজ্জল ভবিষ্যৎকে। জাতির জনক ও তার পরিবারকে হত্যার মধ্যদিয়ে সদ্য প্রসূত শিশুকে যেমন করে গলা টিপে হত্যাকরে পাষন্ডরা, তেমনি করে এই সদ্য স্বাধীন দেশটিকে ধ্বংসের ঘোড়ায় নিয়ে গেছে কুলাঙ্গার মীরজাফরেরা। শুরু হলো নতুন ছক, আর তা হলো এই দেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা ও তার স্থপতিকে সম্পুর্নভাবে ইতিহাসের আসামি বানানো, যেন আগামি প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে চিনতে না পারে। স্বাধীনতার ইতিহাস কিছু সত্যকে অনেক মিথ্যা দিয়ে এমনভাবে বিকৃত করে দিয়েছিল যে মনে হবে বঙ্গবন্ধু একজন স্বাধীন দেশের "আসামি"। এইভাবে পাকিস্তানিরা আমাদের দেশে ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করে গেল জামাত বিএনপির মাধ্যমে যা আজ পর্যন্ত জাতিকে সে বীজের চাঁরাগুলোর সাথে মোকাবেলা করতে হচ্ছে অথচ আজ মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চাইতে অর্থনৈতিকভাবে উন্নতির দিকে এগিয়ে। পাকিস্তানে আজ এমন কোনদিন যায়না, যেদিন দশ-বিশজন লোক হত্যা হচ্ছেনা। তাদের এয়ারপোর্ট, মসজিদ, মাদ্রাসায়, স্কুলে পর্যন্ত প্রায় আক্রমন হচ্ছে, শতশত মানুষ মারা যাচ্ছে, বেলুচিস্তানে দিন রাত হামলা হচ্ছে, সেখানকার মানুষ দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে আজ পাকিস্তানের এই পরিণতি একমাত্র বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য এবং যে ক্ষতি তারা করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত।

কিভাবে এগিয়ে বাংলাদেশ দেখে নেয়া যাক-

বাংলাদেশ স্বর্গের মতো কোনো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ নয়। জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে দেশটি ছিল দরিদ্র ও জনবহুল। তাছাড়া দেশটিতে শিক্ষার হারও ছিল অনেক কম আর দুর্নীতির পরিমাণও ছিল অনকে বেশি। মাঝে মধ্যেই দেশটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সন্ত্রাসবাদ ও গণতান্ত্রিক অবস্থা ছিল প্রহসন -মূলক। কিন্তু দেশটি অনেক বছর ধরে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচলেও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বেশ সুখে ও শান্তিতে রয়েছে। যেমনঃ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বাংলাদেশই হবে আগামীর ‘এশিয়ান টাইগার। গত বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক আট শতাংশ। যা নিয়ে টক্কর দিচ্ছে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেশ ভারতকে। যেখানে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক নিচে পাকিস্তান।

তাছাড়া বাংলাদেশের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ যেখানে নাই বললেই চলে, সেখানে পাকিস্তানের ৯৭৪ ডলার। আর বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩২ বিলিয়ন ডলার পাকিস্তানের তা চারভাগের একভাগ অর্থাৎ মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলার। আর আমাদের প্রবৃদ্ধির বেশিরভাগটাই হয়েছে রফতানি থেকে। ১৯৭১ সালে শূন্য থেকে শুরু করলেও এখন যা এসে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। পাকিস্তানের সেখানে মাত্র ২৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন। সুতা উৎপাদন না করেও পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, যেখানে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে। ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড আইএমএফ তাদের হিসাব অনুযায়ী অনুমান করছে, বাংলাদেশের বর্তমানে ১৮০ বিলিয়ন ডলারের ক্রম অগ্রসরমান অর্থনীতি ২০২১ সালের মধ্যে ৩২২ বিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। তার মানে এটা দাঁড়ায় বর্তমানে গড়ে বাংলাদেশিরা পাকিস্তানিদের চেয়ে বিত্তবান। শুধু অর্থনৈতিক নয় অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অসাধারণ উন্নতি করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ আর পশ্চিম পাকিস্তানের ৩ কোটি ৩৭ লাখ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫০ লাখ হলেও পাকিস্তানের তা দাঁড়িয়েছে ২০ কোটিতে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রত্যাশিত গড় আয়ু যেখানে ৭২ দশমিক ৫ বছর সেখানে পাকিস্তানের ৬৬ দশমিক ৫ বছর। জাতিসংঘের শ্রম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএলও’র দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী কাজের সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানে তা ২৫ দশমিক ১ শতাংশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আমাদের ভবিষ্যত দেখছে ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে লক্ষ্য রেখে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ অটুট ও অবিচল ঠিক বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই হেটে চলেছেন নিরন্তর- রফতানি বৃদ্ধি, বেকারত্ব হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো ইত্যাদি বিষয়ের ওপর জোরারোপ করে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে পাকিস্তানিরা বরাবরই উগ্র ও বর্বর স্বভাবের। ধন্যবাদ মাতৃতুল্য নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল আজকের আমাদের সবার সফল বাংলাদেশ।

লেখকঃ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ সদস্য সচিব, ইকবাল আহমেদ লিটন

পাঠকের মন্তব্য