প্রত্যাশিত কমিটি বনাম অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ড !

প্রত্যাশিত কমিটি বনাম অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ড!

প্রত্যাশিত কমিটি বনাম অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ড!

ইকবাল আহমেদ লিটন : মানব সেবা বা জনগণকে সেবাদান মানবজাতির রক্ষার কবজ। আর সেই মানুষ বা অনুসারীরা নেতার গোত্রের নেতার থেকে সর্বদা সেই সেবা প্রত্যাশা করে। যে নেতা যত বেশি সেবা দেন তিনি সবার প্রিয় থাকেন এটাই নিয়ম। আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই কিন্তু তার সে মানব সেবার কথা মানুষ মনে রেখেছে এবং মনে রাখবেন আজিবনকাল।

রাত নেই দিন নেই মানুষের সেবা করে গেছেন প্রতিনিয়ত। রাষ্ট্রীয় কাজ বা রাজনৈতিক কাজ সেরে বঙ্গবন্ধু যখন বাসায় ফিরতেন তখনও মানুষ বাসায় অপেক্ষা করতো বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে, সেখানে নেতা কর্মী, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষ। বাসায় বলা ছিল কেউ যেন খালি মুখে না ফেরে আর মা ফজিলাতুনন্নেসা মুজিব তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। অনেক সময় তিনি না খেয়ে দূর দুরান্ত থেকে আসা মেহমানদের খাওয়াতেন। বঙ্গবন্ধু অনেক রাত পর্যন্ত সবার কথা শুনতেন এমনকি জিজ্ঞেস করতেন আর কেউ আছে কিছু বলবে? দেখা যেতো তখন প্রায় ভোর হয়ে গেছে। এটাই বঙ্গবন্ধু! সারাটা জীবন মানুষের জন্য দিয়ে গেছেন। এজন্য তিনি বাঙালি জাতির পিতা, অনন্য নেতা, তিনি না থাকলে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম না, পেতাম না কোনো প্রতিষ্ঠিত অধিকার! আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন এদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে। তার আদর্শ পালন করছেন হাজার-হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয়নি, তিনি বেঁচে আছেন শতকোটি বাঙালির হৃদয়ে। তার আদর্শ বাস্তবায়নে যারা কাজ করছেন তার মধ্যে সর্বাগ্রে যার অবস্থান তিনি আমাদের প্রিয় নেত্রী বিদ্যানন্দিনী জননেত্রী শেখ হাসিনা। লোভ -লালসাহীন, খুব সাদামাটা জীবনযাপন করা মানুষটিই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাই হোক, ছাত্রলীগ সংগঠন ও দেশ ছেড়েছি অনেক আগেই কিন্তু সংগঠনটির প্রতি অনুভূতিটা রয়েছে ঠিক আগের মতোই। সম্প্রতি ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে তর্ক-বির্তক, আলোচনা-সমালোচনা দেখে সত্যি আমি হতভম্ব।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। ভুল কাজগুলো থেকে মানুষ শিক্ষা নেয় এবং আগামীতে সঠিক পথ দেখায়। যে ভুল করে অনুতপ্ত হয় নিজের ভুল স্বীকার করে এবং যে ভুলকে ক্ষমা করে দুজনই মহান। আজ যারা সমালোচনা করছেন তারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন আপনারা নিঃশপাপ? আপনারা কখনও অন্যায় করেন নাই?

সফলতার ভাগ সবাই নিতে চাই কিন্তু ব্যর্থতার দায় কেউ নিতে চাই না। আজ সামান্য একটা পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে দেখেন কতগুলো ভুল করেন। আর পুরো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দায়িত্ব সেখানে ভুল করা টা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমি শোভন-রাব্বানীর সমালোচনাকে তাদের সমালোচনা হিসাবে নিচ্ছি না। আপনাদের এই সমালোচনা কি তাদের উপরে যাচ্ছে নাকি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের উপরে যাচ্ছে? ছাত্রলীগ সংগঠন নিয়ে সমালোচনা করতে সত্যি নিজের বুক কেঁপে ওঠে কারণ সংগঠনটি গঠন করেছিলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।আজ সেই সংগঠন নিয়ে সমালোচনায় মেতে উঠেছে সকলে। সত্যিই আমি ব্যথিত। ৫২ থেকে ৭১ এবং ১/১১ নেত্রীর কারামুক্তি আন্দোলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভূমিকা বলে দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সক্রিয় চালিকা শক্তি। বঙ্গবন্ধুর বয়স যখন ২৮ বছর তখন তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশের অসহায় মানুষদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য, পাকিস্তানিদের কাছ থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য। 

১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগ দেশ স্বাধীন করতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। বর্তমান ছাত্রলীগ একদিক দিয়ে হতভাগা, কারন তারা বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ পায়নি। আরেক দিক দিয়ে তারা সৌভাগ্যবান বটে কারন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্পর্শ তারা পেয়েছে। পরবর্তী যে প্রজন্ম ছাত্রলীগে আসবে হয়তোবা তারা শেখ হাসিনার স্পর্শ পাবেন না। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা বিনির্মাণে স্বপ্ন দেখেছিলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই সোনার বাংলা বিনির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু কে রাখে কার কথা, এ যেন হরিলুটের মতো লুটতরাজ, টেন্ডারবাজি শুরু হয়েছে। শুধু ছাত্রলীগের কিছু নেতাদের দোষ দিয়ে কিচ্ছা খতম করে দেওয়া হচ্ছে নাতো? বর্তমানে প্রতিটি সেক্টরে আমাদের আওয়ামী লীগ ও তার ভ্রাতৃপ্রীতিম সংগঠনে অসাধু নেতাকর্মীদের মিলন মেলা বসেছে আর হাতেগোনা কিছু অসাধু নেতাদের জন্যই আজ বঙ্গবন্ধু কন্যার সমগ্র ভালকাজ স্মান হতে চলেছে সুতরাং সকল সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে অনুরোধ আপনারা বঙ্গবন্ধু ও তার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার থেকে কিছুটা হলেও শিক্ষা গ্রহন করুন নতুবা আপনাদের মতন অসাধু নেতাদের দলে কোন দরকার নেই। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে গেছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সবার আমলনামা এখন তার কাছে। বিতর্কিত কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধেও অ্যাকশন শুরু হবে। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তিন বছরে মাত্র একটি জেলায় সম্মেলন হওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন ‘এই মেয়াদে মাত্র একটি জেলায় সম্মেলন হলো কেন? বাকিগুলো কেন হলো না? আপনারা করেন কী? কে কী করেন সবার আমলনামা কিন্তু আমার কাছে রয়েছে। জেলায় জেলায় গিয়ে খাওয়াদাওয়া করে আসেন, দলের কাজ তো কেউ করেন না। ব্যক্তি অপকর্মের দায় দল ও সরকার নেবে না। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ দেশরত্নের এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কেন্দ্রীয় নেতারা। 

এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় ১২ নেতাকে এসি রুমের মধ্যে বারবার ঘাম মুছতে দেখা যায়। টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর দল ও সরকারের ইমেজ রক্ষায় এবার আর কোনো ছাড় নয়। অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলের গঠনতন্ত্র, নীতি-আদর্শবিরোধী যে কোনো কর্মকাণ্ড করলেই ছাড় পাবেন না কেউই। জাতীয় সম্মেলনের আগে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোয় একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনৈতিক অভিযোগের বিরুদ্ধে তার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদ থেকে শোভন-রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যুবলীগকেও শেষ বারের মতো সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় যুবলীগের ট্রাইব্যুনাল চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে। এদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্সনীতি বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিতর্কিত নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। কেবল ছাত্রলীগ -যুবলীগ নয়, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী -ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ ও তার প্রমাণ দলীয় হাইকমান্ডের কাছে আছে। কাউকে ছাড়বেন না তিনি। শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নয়, আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। তৃণমূলে যাদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দলেও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। 

দুর্নীতিবাজ-চাঁদাবাজদের মদত না দিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নেতাকর্মীদের কাছে আরো দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করছেন তিনি। রাজনীতির নামে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি, পেশিশক্তি প্রয়োগ ইত্যাদির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। টানা তিন মেয়াদের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এখন দল নিয়ে খুবই সিরিয়াস। তিনি চান না, তার নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্জন দলীয় কিছু নেতাকর্মীর আচরণের কারণে ম্লান হয়ে যাক। এক্ষেত্রে যত বড়ো নেতাই হোক রক্ষা পাবেন না। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছেন তিনি। দলের বিভিন্ন সূত্র এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং করছেন তিনি। বিশেষ করে মন্ত্রিসভার সব সদস্য, এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ব্যাপারে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছেন। তাদের অনেকের আমলনামা তিনি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। যে কোনো সময় বিতর্কিতদের কপাল পুড়বে।

পরিশেষে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড় আর দলের চেয়ে দেশ তাই সাবধান ও সতর্ক হয়ে যান সুতরাং প্রত্যাশিত কমিটির অপ্রত্যাশিত কর্মকাণ্ড কারোরই কাম্য নয়।

-সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ সদস্য সচিব, ইকবাল আহমেদ লিটন

পাঠকের মন্তব্য