বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আগাম সম্মেলন !

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আগাম সম্মেলন !

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আগাম সম্মেলন !

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এই সংগঠনটি যেমন দেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে তেমনি দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তাদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে দেশের প্রাচীনতম ছাত্র সংগঠনটি।

কিন্তু কালের স্রোতে ছাত্রলীগের অতীত সম্মান, গৌরব ও ঐহিত্য মলিন প্রায়। দীর্ঘসময় ধরে অযোগ্য নেতৃত্ব, নৈতিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, একের পর এক অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দরুণ ছাত্রসমাজের কাছে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছে।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন একের পর এক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন, বাঙালির দু:খী, মেহনতি মানুষের মাঝে হাসি ফোটানোর জন্য। জাতির পিতার যে স্বপ্ন ছিল সেটা বাস্তবায়নে রাতদিন পরিশ্রম করছেন। ধীরে ধীরে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদার আসনে নিয়ে যাচ্ছেন তখন ছাত্রলীগের একটি অপকর্ম প্রধানমন্ত্রীর সমস্ত কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইমেজকে জনগণের সামনে খাটো করে তুলেছে।

ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনটির করুণ দুরবস্থা ভাবিয়ে তুলেছে আওয়ামী লীগকে। তাদের চাওয়া, ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে যারা থাকবেন তারা হবেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, ক্লিন ইমেজ, আদর্শিক রাজনীতির অকুতোভয় সৈনিক। নৈতিকতা, মূল্যবোধের ও জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে শিক্ষার্থীদের মাঝে তারা হবেন প্রশ্নাতীত।

আর সে লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে ছাত্রলীগের ২৯ তম জাতীয় সম্মেলনে অনেক যাচাই বাছাই শেষে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব তুলে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর তারা প্রধানমন্ত্রীর সে আস্থার অমর্যাদা শুরু করেন।

একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নাম আসা শুরু হয় শোভন ও রাব্বানীর। একবছর পর তারা ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করেন যাতে প্রায় ৯০ জনের অধিক শিবির, ছাত্রদল থেকে অনুপ্রবেশকারী, অপকর্মে বিতর্কিতদের স্থান দেওয়া হয়। এতে করে তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েন ছাত্রলীগের সক্রিয়, পরিশ্রমী ও জনপ্রিয় নেতা-কর্মীরা। কিন্তু তাতেও কোন ভ্রুক্ষেপ করেননি শোভন-রাব্বানী।

ছাত্রলীগের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী না করে, জেলা উপজেলা ইউনিটগুলোতে সম্মেলন আয়োজন না করে তারা বিভিন্নস্থানে চাঁদাবাজিতে মনোযোগ দেন। যেটা একসময় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের পাশাপাশি সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদেরও বিব্রত করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় তাদেরকে ‘মনস্টার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ছাত্রলীগের পদ থেকে সরে যেতে নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই মেয়াদ পূরণ না করেই ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ১৪ মাসের মধ্যে সরে যেতে হয় শোভন-রাব্বানীকে।

শোভন রাব্বানীর সরে গেলে দায়িত্বে আসেন জয়-লেখক। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে তাদেরকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন শেখ হাসিনা। ভারপ্রাপ্তের দায়িত্বের আগে জয়-লেখক যথাক্রমের দলের ১ নং সহ সভাপতি ও ১ নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

জয়-লেখক দায়িত্ব নেওয়ার পরও ছাত্রলীগের গুণগত অবস্থাতে কোন পরিবর্তন আসেনি। কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নি। শোভন-রাব্বানীর গঠিত বিতর্কিত ইউনিট কমিটিগুলোও নিয়েও তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। উল্টো বিভিন্ন ইউনিটে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দরুণ নিজেরাই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।

সর্বশেষ ৬ অক্টোবর বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি যুক্ত থাকায় চরম বিব্রত হয় দল ও সরকার। ছাত্রদের ক্ষোভ প্রশমন ও পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় প্রশাসন।

এই ঘটনায় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে গণভবনে তলব করে ‘তিরষ্কার’ করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, জয়-লেখক যদি শীর্ষপদের দায়িত্ব পালনে যোগ্যতাসম্পন্ন না হন তাহলে তাদেরকেও সরিয়ে দিতে ছাত্রলীগের আগাম সম্মেলন হতে পারে। আর যদি তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন তাহলে কমিটির মেয়াদপূর্ণ করেই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা বলেন, ছাত্রলীগের কারণে প্রায় সময়ে দল প্রশ্নবিদ্ধ হলেও ছাত্ররাজনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী খুবই আশাবাদী। ছাত্রলীগের নেতৃত্বের সমস্যাগুলোর কারণও তিনি জানেন। ছাত্রলীগের যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিভিন্ন সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে রেখেছেন। তাদেরকে তিনি নিজেই তার বিশ্বস্ত ব্যক্তি ও এজেন্সি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। আগাম সম্মেলনের সম্ভবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ছাত্রলীগকে বিতর্কমুক্ত আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও সাবেক স্কুল ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, বুয়েটের আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যারা অভিযুক্ত তাদের কয়েকজনই  ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশকারী। শোভন-রাব্বানী কমিটিতে ‘মাই ম্যান’ ঢুকাতে আদর্শিক ও ত্যাগী কর্মীদের বাদ দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এমন অবস্থা প্রতিটা কমিটিতেই। আর এদের অপকর্মের দায় নিতে হচ্ছে ছাত্রলীগকে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। আমরা চাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যেসব অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিত আছে তাদেরকে আগে সরিয়ে দেওয়া হোক।

তিনি আরো বলেন, জয়-লেখক আমাদের কাছে সময় চেয়েছে, আমরাও দিচ্ছি কিন্তু তারাও যদি শোভন-রাব্বানীর মতো বিতর্কিতদের নিয়ে সংগঠন চালায় তাহলে আমরাও রাজপথে নেমে আবারো আন্দোলন শুরু করবো।

বিতর্কিতদের ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্তের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রাপ্ত অভিযুক্ত বিতর্কিতদের বাদ দিতে কাজ করা হচ্ছে। আমাদের যাচাই বাছাই চলছে। আমরা খুব দ্রুত এ বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করবো।

পাঠকের মন্তব্য