আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে হঠাৎ সম্মেলনের হাওয়া 

আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে হঠাৎ সম্মেলনের হাওয়া 

আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে হঠাৎ সম্মেলনের হাওয়া 

নতুন নেতৃত্ব বাছাই করে সংগঠনকে গতিশীল করে তুলতে সম্মেলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই সম্মেলনই অনিয়মিত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে হঠাৎ সম্মেলনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগে নিয়মিত সম্মেলন হলেও সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন হয় না। কোনও কোনও সংগঠনে কমিটি মেয়াদের কয়েকগুণ বেশি সময় ধরে পদ আগলে রেখেছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মূল সংগঠনের ওপর।

জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৪ জুলাই ওমর ফারুক চৌধুরীকে চেয়ারম্যান ও হারুনুর রশীদকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন বছর মেয়াদী যুবলীগের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গত সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে।

২০১২ সালের ১১ জুলাই সম্মেলনে মোল্লা মো. আবু কাওছারকে সভাপতি ও পঙ্কজ দেবনাথকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি দেওয়া হয়। পঙ্কজ দেবনাথ প্রায় দুই দশক ধরে একই পদে আছেন। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই সম্মেলনে মোতাহার হোসেন মোল্লাকে সভাপতি ও খোন্দকার শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে কৃষক লীগের কমিটি দেওয়া হয়।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই সম্মেলনে শুক্কুর মাহমুদকে সভাপতি এবং সিরাজুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে শ্রমিক লীগের কমিটি দেওয়া হয়।

মহিলা শ্রমিক লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ এর ২৯ মার্চ। প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। এরপর ১০ বছর বিরতি দিয়ে গত ১২ অক্টোবর দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আরও জানা গেছে, দীর্ঘদিন এসব সংগঠনে সম্মেলন না হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছিল। তবে পদ হারানোর ভয়ে তারা হাইকমান্ডের বিরোধিতা করার সাহস দেখান নি। সম্মেলন না থাকায় সংগঠনেও ছিল চরম বিশৃঙ্খলা। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তারা ক্যাসিনো ব্যবসা, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে যুক্ত হন। এমনকি অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের দিকে মনোযোগী হন তারা। সম্প্রতি যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষকলীগের নেতাদের বাসা, বাড়ি, অফিসে অভিযান চালিয়ে শত শত কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এরপরই ভোজবাজির মতো দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে।

দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা জানান, চলমান শুদ্ধি অভিযানে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো দেশব্যাপী বিতর্কিত হওয়ায় এখন শীর্ষ নেতারা দায়িত্ব ছাড়তে চান। তাদের অবস্থা ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’। কারণ অনেক আগেই তাদের মেয়াদ শেষ হলেও সম্মেলন করার নাম নেননি। তারা নিজেদের সংগঠনের মালিক মনে করতেন।

এদিকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে শুধু মূল দলের জাতীয় কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু শুদ্ধি অভিযানে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নগ্ন রূপ উন্মোচিত হওয়ায় তাদেরকে আগে শুদ্ধ করতে চান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন করার নির্দেশও দেন তিনি।

এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর জাতীয় শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ২৩ নভেম্বর যুবলীগ ও ২৯ নভেম্বর আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের জাতীয় সম্মেলনের দিন নির্ধারণ করেছেন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। আর আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।

হঠাৎ করে সম্মেলনের তোড়জোড় শুরু হওয়ায় নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন অনেক নেতা-কর্মীরা। দলীয় কার্যালয়ে বেড়েছে তাদের আনাগোনা। পদপ্রত্যাশীরাও নিজেদের তুলে ধরতে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে এসব সংগঠনের ঢাকা মহানগর কমিটির সম্মেলন আয়োজন করা হচ্ছে। সম্মেলন সফল করতে বিভিন্ন উপ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্ধিত সভা করা হচ্ছে। কাউন্সিল-ডেলিগেট তালিকা চেয়ে জেলায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রচারণার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যানার ফেস্টুনের নকশা চূড়ান্তের কাজও চলছে।

সম্মেলনের প্রস্তুতির বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওছার বলেন, ‘গত শুক্রবার কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সম্মেলন প্রস্তুতিসহ আনুষঙ্গিক উপ-কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে। এছাড়া আগামী ১১ নভেম্বর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও ১২ নভেম্বর মহানগর উত্তরের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ২৬ অক্টোবর আমরা সম্মেলন উপলক্ষে বর্ধিত সভা করবো।’

এদিকে, সম্মেলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে যুবলীগও। গত শুক্রবার দলীয় কার্যালয়ে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা বৈঠক করেন। বৈঠকে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী অনুপস্থিত ছিলেন। যুবলীগের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুককে সোমবার (১৪ অক্টোবর) বিকালে ফোন করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সম্মেলন প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ১০ অক্টোবর কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক করেছে কৃষক লীগ। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারা ১৩টি উপ-কমিটি গঠন করেছে। ১৯ অক্টোবর বর্ধিত সভা করতে চায় সংগঠনটি। আর ১৬ অক্টোবর সংগঠনের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক থেকে সম্মেলনের প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করতে চায় শ্রমিক লীগ।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে যথাযথ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।’

পাঠকের মন্তব্য