ভুঁইফোড় সংগঠনের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান চায় আ' লীগ  

ভুঁইফোড় সংগঠনের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান চায় আওয়ামী লীগ  

ভুঁইফোড় সংগঠনের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান চায় আওয়ামী লীগ  

অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত মাসে শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর বেরিয়ে আসতে শুরু করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর তথৈবচ দশার খবর। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সংগঠিত করা ও তাদের কল্যাণে মূল দলের বাইরে এ সব সংগঠন গড়ে তোলা হলেও বাস্তব কাজের সঙ্গে মিল নেই সংগঠনগুলোর। বরং সাংগঠনিক পরিচয়কে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো বাণিজ্য, পরিবহন বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, তদবির, টাকা পাচার, মাস্তানি-সন্ত্রাসের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন সংগঠনগুলোর অনেক নেতাকর্মী। তাদের অপকর্মের কারণে বারবার সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে পড়তে হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে। দলের প্রতি নিবেদিত সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছেন।

এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দল ও সংগঠন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। এ সম্মেলনে অসৎ, বিতর্কিত এবং দলের পরিচয় ব্যবহার করে যারা এতদিন নানা অপকর্ম করে এসেছেন তাদের বাদ দিয়ে সৎ ও নিষ্ঠাবানদের নেতৃত্বে আনার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ব্যাপারে আরও কঠোর অবস্থানে তিনি। ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই চারটি সংগঠনের সম্মেলনের নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগ।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগে মূল রাজনৈতিক সংগঠন বাদে সাতটি সহযোগী সংগঠন রয়েছে। এগুলো হলো মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইন পরিষদ। এর বাইরে শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন। এর বাইরে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদসহ কিছু পেশাজীবী সংগঠন রয়েছে, যারা আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন না হলেও দলের স্বীকৃত সংগঠন হিসেবে কাজ করছে।

এ সব সংগঠন বাদে গঠনতন্ত্রের নিয়ম না মেনে নামে-বেনামে আওয়ামী লীগের নামে তিন শতাধিক সংগঠন আছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় প্রায়ই এ সব সংগঠনের নামে সভা, সমাবেশ, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালিত হয়। এর মধ্যে কিছু সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আওয়ামী লীগেরই কিছু প্রভাবশালী নেতার নাম উঠে এসেছে। ভুঁইফোড়, ব্যানারসর্বস্ব এ সব সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ওলামা লীগের মতো কিছু সংগঠনের বিতর্কিত কর্মকা-ন্ডে বারবার সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমতাসীনরা। 

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সাত সহযোগী ও দুই ভাতৃপ্রতীম সংগঠন বাদে আওয়ামী লীগের অনুমোদিত সংগঠন নেই। এর বাইরে যারা আছে, তারা আওয়ামী লীগের কেউ নয়। কেউ যদি অনুমোদন ছাড়াই আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে তারা বেআইনি কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অনুমোদিত সংগঠনের বাইরে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার নাম ব্যবহার করে শতাধিক সংগঠন সক্রিয়। 

ওলামা লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা লীগ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী হকার্স ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গ্রাম ডাক্তার পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আদর্শ পরিষদ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় লীগ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সংসদ, আওয়ামী প্রচার লীগ, আওয়ামী সমবায় লীগ, আওয়ামী শিশু লীগ, আওয়ামী তৃণমূল লীগ, আওয়ামী ছিন্নমূল হকার্স লীগ, আওয়ামী মোটরচালক লীগ, আওয়ামী তরুণ লীগ, আওয়ামী রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, আওয়ামী যুব হকার্স লীগ, আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, আওয়ামী নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, আওয়ামী ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী লীগ, আওয়ামী যুব সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ আওয়ামী পর্যটন লীগ, জননেত্রী পরিষদ, দেশরত্ন পরিষদ, আমরা নৌকার প্রজন্ম, আওয়ামী শিশু যুবক সাংস্কৃতিক জোট, তৃণমূল লীগ, আমরা মুজিব হবো, চেতনায় মুজিব, মুক্তিযোদ্ধা তরুণ লীগ, নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী, দেশীয় চিকিৎসক লীগ, ছিন্নমূল মৎস্যজীবী লীগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ, নৌকার নতুন প্রজন্ম- এ রকম নামে আরও অনেক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে।

এসব নিয়মবহির্ভূত সংগঠনগুলোর মধ্যে ওলামা লীগের কর্মকাণ্ডে অনেকবার অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে ক্ষমতাসীনদের। এ বছরের জানুয়ারি মাসে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে যেসব এনজিও বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য কাজ করছে তাদের নিষিদ্ধ করার দাবি জানায় সংগঠনটি। এ ছাড়া বিপিএল খেলা বন্ধের দাবিও জানায় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। বিতর্কিত এ দাবির সমালোচনা শুরু হলে, আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ বিবৃতি দিয়ে জানান, ‘আওয়ামী ওলামা লীগ নামে আওয়ামী লীগের কোনো সহযোগী সংগঠন নেই। আওয়ামী লীগের নামে তাদের যেকোনো ধরনের কার্যক্রম অবৈধ এবং বেআইনি।’

এর আগে, ২০১৬ সালে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো ও মুখোশ পরে শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে রাষ্ট্রীয়ভাবে নববর্ষ উদযাপন বন্ধ করার দাবি জানায় ওলামা লীগ। সেবারও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছিল, ওলামা লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। যদিও এসব ঘটনায় ওলামা লীগের পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয়েছে, ২০০১ সাল থেকেই ওলামা লীগ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রয়েছে। তাদের অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা গিয়েছেন।

শুধু ওলামা লীগ নয়, আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা, শেখ রাসেল, সজীব ওয়াজেদ জয়সহ জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে এ রকম প্রায় তিন শতাধিক ভুঁইফোড় সংগঠন সক্রিয় বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকে নানা সময়ে এ ধরনের নামসর্বস্ব সংগঠনের ছবি দিয়ে অপপ্রচারও চালিয়ে আসছে। ফলে এসব নিয়মবহির্ভূত সংগঠনের জন্য দলের বদনাম ছড়াচ্ছে।

আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এসব সংগঠনের স্বীকৃতি না দিলেও অনেক ক্ষেত্রেই দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতাকেই এসব সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি হতে দেখা গেছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও বিভিন্ন সভা সেমিনারে অংশ নিচ্ছেন। ফলে এক ধরনের ধন্দ সৃষ্টি হচ্ছে। আবার নিয়ন্ত্রণহীন এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা যেসব অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন তাতে সমালোচিত হতে হচ্ছে সরকারকে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দাবি জানিয়েছেন, এ ধরনের ভুঁইফোড় সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে দলের হাইকমান্ডকে। দলের কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের এ সব সংগঠনের অনুষ্ঠানে অতিথি হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। নিয়মবহির্ভূত এ সংগঠনগুলোর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দল। শুদ্ধি অভিযানে এ ধরনের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য