দুর্নীতি খতম করতে প্রয়োজন সম্মলিত প্রচেষ্টা

ইকবাল আহমেদ লিটন

ইকবাল আহমেদ লিটন

ইকবাল আহমেদ লিটন : সারা বিশ্বেই সরকার প্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাক্তি, আমলাদের দুর্নীতি করতে দেখা যায়। আর দরিদ্র দেশগুলোর দুর্নীতিই যেন সুনীতিতে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি শুধু আর্থিক অনিয়মই না, দুর্নীতির কারণে সরাসরি অর্থনৈতিক বিষয় ছাড়াও অন্যান্য সামাজিক সমস্যাও তৈরি হয় যা একটি সুন্দর দেশ গঠনে চরম বাধার সৃষ্টি করে। আমরা এক সময় দুর্নীতির সুচকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি এবং হ্যাট্রিকও করেছি। সেই পরিস্থিতি থেকে বিগত ১৫ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নতি লাভ করলেও সেটি আশাব্যঞ্জক হওয়ার মত কোন বিষয় না, কারন প্রতিটা মানুষই সরকার প্রধানকে সাহায্য না করে বরং দুর্নীবাজ নেতাদের প্রশংসা করতে ব্যস্ত। এখনও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি রয়েছে। আমরা শুধু রাজনীতিক, সরকারি চাকুরীজীবির দুর্নীতির দোষারোপ করি। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও দুর্নীতির সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত। যার যে ক্ষমতা, সে সেই পরিমাণ দুর্নীতি করে। ছোট দুর্নীতিবাজ, বড় দুর্নীতি করার সুযোগ পেলে, সে ঠিকই সেটা করে।

আমাদের এখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গেলে সাধারণ মানুষ খুব একটা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় না। ছোটকে ধরলে বলে বড়কে ধরলে না কেন? বড়কে ধরলে বলে আরো বড়কে ধরলে না কেন? আরো বড় কে ধরলে বলে মাত্র দুই টাকার জন্য ধরলো? নিশ্চয় এটা প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা। অথচ ছোট হোক, বড় হোক আমাদের উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকা। ছোট বড় বিষয় না, যে কোন প্রকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকা উচিত। ছোটগুলোয় এক সময় বড় দুর্নীতিবাজ হয়। তাই শুধু বড় না, ছোটগুলোও ধরা উচিত। বড়দের পাশাপাশি ছোট গুলোও ধরলে, মানুষ সাবধান হওয়ার চেষ্টা করে। সত্যি বলতে কি, সাধারণ মানুষ খুব একটা সহায়তা করেনা, কেননা তারাও দুর্নীতি থেকে কোন না কোনভাবে লাভবান হয়। হয় বলেই, সাধারণ মানুষও দুর্নীতিকে সাপোর্ট করে। দুর্নীতিবাজদের সম্মান করে, দুর্নী‌তিবাজ‌দের অ‌নেক সময় মসজিদে প্রথম কাতারে জায়গা হয়, ১০ কোটি টাকার দুর্নীতি করে মসজিদে ৫টা এসি উপহার দিলে, সেই মানুষটি আমাদের কাছে ধার্মিক, সৎ হিসেবে সম্মানীয় হয়ে ওঠে। আমরা সাধারণ মানুষ দুর্নীতিকে সাপোর্ট করি বলেই, ছেলের উপরি আয় থাকলে তাকে ভাল পাত্র হিসেবে সম্বোধন করি। পাশের বাসার দুর্নীতিতে গড়ে ওঠা সম্পদের দিকে আঙুল তুলি না। একবার কোন এক জায়গায় পড়েছিলাম, কোন দেশের শুরুর দিকে দুর্নীতির পরিমাণ বেশি দেখা যায়। দুর্নীতির মাধ্যমে সেই দেশ পুঁজি গঠন করে। আমার মনে হয়, আমরা সেই ধাপ পার হয়ে এসেছি। এখন প্রয়োজন সেই পুঁজি দিয়ে সৎভাবে দেশ গঠন করা। নিজেকে বদলে ফেলা। নিজেকে প্রশ্ন করা, নিজের পরিবারকে প্রশ্ন করা, নিজের বিবেককে প্রশ্নের সম্মুখিন করা। অন্যর দুর্নীতি না, নিজের, নিজের পরিবার, নিজের প্রতিবেশী থেকেই আমাদের শুরু করা উচিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে, একটি বড় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক এই পরিবর্তন নিয়ে সমালোচনা করলেও আমাদের এটাকে স্বাগত জানানো উচিত। এত ব্যাপক দুর্নীতির দেশে রাতারাতি দুর্নীতি বন্ধ করা আকাশকুসুম কল্পনা। রাতারাতি দুর্নীতি বন্ধ শুধু সিনেমাতেই দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবে না। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, সেগুলোর খবর, কমেন্টে অভিনন্দন জানানো মানেই জনগণ এটার পক্ষে না। বরং স্রোতে গা ভাসানো।

যাইহোক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্সের অভিযানে অনেক প্রভাবশালী ক্ষমতাবানরা গ্রেফতার হয়েছে। শুরুটা কেবল ঘর থেকে শুরু হলো, বাকী আছে অনেককিছু। আইন -শৃঙ্খলা বাহিনী চমৎকার পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু এসব করতে গিয়ে ফাঁকতালে বাহিনীর অল্প কিছু সদস্য সাধারণ সাদামাটা জনগণকে অযথা হয়রানি এবং কিছুক্ষেত্রে অত্যাচার করছে। কিছুদিন আগে কাওরান বাজারে কয়েকটা ভ্যানগাড়ি ভেঙ্গে দিয়েছে অবৈধ স্থাপনা চলমান অভিযানের নামে। প্রতিবাদ করায় গ্রেফতার করা হয়েছে খুবই নিম্ন আয়ের মজদুর শ্রেণীর কয়েকজনকে। এটা কি অভিযান? এটা কি অতি উৎসাহীদের কাজ? নাকি সাধারণ পেশাজীবী জনগণকে খেপিয়ে তোলা? মনে রাখা উচিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই যুদ্ধটা সাধারণ জনগণের সুখ শান্তির জন্য, তাদেরকে যন্ত্রণা দেয়ার জন্য না। আইনের পোশাক পড়ে অত্যাচার করলে তা কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা'র উপরেই বর্তাবে। প্রশ্নবিদ্ধ হবে বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। অনেকেই সরকারের ইমেজ নষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লেগে আছে। সেই এজেণ্ডা কিছু পুলিশ সদস্য এমনকি হাইব্রিড দুর্নীতিবাজ নেতা দ্বারা সংগঠিত হয়ে যেতে পারে। এই বিষয়ে সতর্ক হওয়া খুবই জরুরি। আর দুঃখের বিষয় আমরা নতুন ইস্যু পেলে পুরনো ইস্যুকে কবর খুড়ে পুতে দিই, একটা জিনিস লক্ষ করলে বুঝবেন, সাম্প্রতিক হত্যাকান্ডের জের ধরে দেশের প্রতিবাদি জনতার প্রতিবাদ দুর্নীবাজদের রেখে এক হত্যা নিয়ে পড়ে আছে তাহলে এটা কেন হবে? সব বিষয় প্রতিবাদ করা প্রতিটা প্রতিবাদি মানুষের কর্তব্য বলে মনে করি। দেশে খুন সন্ত্রাসের রাজনীতির জনক জিয়াউর রহমান এটা সবাই জানেন, তারমানে অপশক্তিরা থেমে গেছে কি? দেশ নিয়ে আগেও ষড়যন্ত্র হয়েছে এখনও হচ্ছে আর আগামীতেও আমাদের মুখোমুখি হতে হবে, সুতরাং প্রতিবাদ হতে নবে ন্যায়ের পক্ষে আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাহলেই শান্তি ফিরবে, অন্যথায় না। আবার কিছুদিন আগে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ নয়জন শিক্ষক তলে তলে সিস্টেম করেছে, লিফট কেনার বিষয়টি দেখতে ইয়োরোপ ট্যুরের। লিফট লাগবে ১৫ টা। তাহলে ৯ জনের ইয়োরোপ ট্যুরের (এন্টারটেইনিং সহ) খরচ সহ ১৫ লিফটের দাম কতো পড়বে? পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশের মতো হয়ে যাবে না ব্যাপারটা? আমি বলি কি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষক ক্রাইটোরিয়াটা এখন উঠিয়ে দেয়া উচিত। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা শিক্ষক শব্দটা ডিজার্ভ করেনা। এদেরকে এখন থেকে 'সিনিয়র পাঠদানকারী' হিসেবে গণ্য করা হোক। প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষকরাই সত্যিকারের শিক্ষক। এখনো দেখলে হাত দুটো তাঁদের পায়ে চলে যায়। তারপর কিছুদিন আগের ঘটনা বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির ঘটনা এখনো সবার মুখে মুখে। নীল-সাদা রংধারী রঙ্গিলা শিক্ষকদের আচরণ কঠোর বিধিমালার আওতায় আনা খুবই প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

তবে রাজনীতিবিদদের অবৈধ সম্পত্তি যেহেতু ধরা পড়ছে- তাদেরকে লোভী আর অসততা শেখানো (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই) সরকারি আমলা, রাজউক, নগর ভবনদ্বয়, ভূমি অফিস সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, এবং সকল থানার ওসি সাহেব, ও এমপি, মন্ত্রী সাহেবদের সম্পদ আর ব্যাংক ব্যালেন্সের হিসেব কবে সামনে আসবে? আদৌ কি আসবে? আগানে-বাগানে লুকিয়ে তাস খেলোয়ারদেরকে গ্রেফতার করা- বর্তমান প্রেক্ষিতে পুলিশ বাহিনীর লেভেলে যায় না তবুও সাধুবাদ জানায়। তবে ডিএমপি কমিশনারের সাম্প্রতিক বক্তৃতায় আমি খুবই আশাবাদী। আমি তীব্রভাবে বিশ্বাস করি উচ্চ পদস্থ সৎ অফিসারদের সত্যিকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে দুর্নীতিবিরোধী এই যুদ্ধ জয় অবশ্যই সম্ভব। শীঘ্রই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে বদলে যাবে - যে দুর্নীতি আজ তুমি করছো, সেটির কুফল এক সময় ঘুরে তোমার কাছেই আসবে। সৎ মানুষ গুলোকে খুঁজে বের করতে হবে, তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। সৎদের উৎসাহ না দিলে তারাও অসৎ পথে পা বাড়িয়ে দিবে। তাই যে কোন মুল্যে আমাদের সৎদের পাশে থাকতে হবে। এখনের এই সময়ে স্বপ্নটা দেখাই যায়।

-লেখকঃ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সদস্য সচিব আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ, ইকবাল আহমেদ লিটন

পাঠকের মন্তব্য