আ'লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ‘শুদ্ধি অভিযান’ আতঙ্ক 

আ'লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ‘শুদ্ধি অভিযান’ আতঙ্ক 

আ'লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ‘শুদ্ধি অভিযান’ আতঙ্ক 

আওয়ামী লীগের এমন রুদ্ররূপ কেউ দেখেনি কখনো। চলমান শুদ্ধি অভিযানে অন্যায়-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। শুদ্ধি অভিযানে এককভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যে কারণে কারও পক্ষেই বোঝার উপায় থাকছে না- কে হবেন পরবর্তী অভিযানের লক্ষ্যবস্তু। ইতোমধ্যে সর্বনিম্ন পদ কাউন্সিলর থেকে সর্বোচ্চ পদ জাতীয় সংসদের হুইপ, সাবেক মন্ত্রীসহ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে কাঠগড়ায় তোলায় হিসাবনিকাশ করতে হচ্ছে অন্য ব্যাকরণে। তবে সম্ভব হচ্ছে না সমীকরণ মেলানো! দোর্দ- প্রতাপশালী যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষনেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে।
 
ক্যাসিনোকাণ্ডে বেরিয়ে আসছে বাঘা বাঘা নেতার নাম; সংশ্লিষ্ট গডফাদাররা বিদেশে পালানোর পাঁয়তারা করলেও পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। যে কারণে ভেতরে কাঁপুনি থাকলেও তারা বাইরে সব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছেন। দলের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন যারা, সম্পদই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে!

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল শুক্রবার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী কঠোর, শুদ্ধি অভিযানেই প্রমাণ করেছেন।’

গতকাল দুপুরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন পর একটি শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। কারও স্বার্থে আঘাত লাগতে পারে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে চলা শুদ্ধি অভিযান সারা দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হচ্ছে। শেখ হাসিনার সৎ সাহস আছে। দলের কেউ অপকর্ম করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন কাদের।

প্রধানমন্ত্রী তথা সরকার শুদ্ধতার প্রশ্নে যে রকম কঠোর অবস্থানে- অনেকের জন্যই তা হাঁটুকাঁপা আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রসিকজনরা প্রবাদবাক্য আওড়াচ্ছেন- গাছে তুলে মই, কেড়ে নিলি সই; দশদিন চোরের একদিন গেরস্তের! গত ১৪ সেপ্টেম্বর শুদ্ধি অভিযানের সূত্রপাত ঘটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

গণভবনে তাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও আনা হয়েছিল। এসব করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী কয়েক যুবলীগ নেতার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, কোনো কোনো যুবলীগ নেতা শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ।

ছাত্রলীগের দুর্নীতিবাজ একটি অংশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর যুবলীগ নেতাদেরও আনা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেড়াজালে। পর্যায়ক্রমে গ্রেফতার হন আওয়ামী লীগের সহযোগী কয়েকটি সংগঠনের শীর্ষনেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম, ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, এনামুল হক আরমান, কৃষক লীগের শফিকুল আলম ফিরোজ, কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান পাগলা মিজান, বিসিবির পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান।

এদের বিরুদ্ধে আইনবিরোধী ক্যাসিনো ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ ছিল। বহিষ্কার করা হয়েছে যুবলীগের দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানকে। অন্যদিকে পলাতক রয়েছেন ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ, যুবলীগ চেয়ারম্যান ফারুকের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত কাজী আনিসুর রহমানসহ কয়েকজন।

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগের পর সর্বশেষ আলোচনায় আসেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষনেতারা। সম্প্রতি বাদ দেওয়া হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছারকে। গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী আজারবাইজানে ন্যাম সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যান। তার নির্দেশে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথকে সংগঠনের সব ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়।

ইতোমধ্যে কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে; খোঁজ নেওয়া হচ্ছে লেনদেনের। বিদেশ যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ গত বুধবার ২২ জনের বিরুদ্ধে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই ২২ জনের মধ্যে ছিলেন দুজন সংসদ সদস্যও (এমপি)। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় দুদক। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে; পর্যায়ক্রমে তারাও আওতায় আসবেন।

এভাবে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত কেউই রেহাই পাচ্ছেন না শুদ্ধি অভিযানের আওতা থেকে। মফস্বলের দুর্বৃত্ত কর্মীদের মনেও বিরাজ করছে আতঙ্ক। এত বেশিসংখ্যক নেতাকর্মী ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত, সরকারে থেকেই বিশাল টাকার পাহাড় গড়েছেন তারা- আগে আঁচ করতে পারেননি কেউই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, অভিযান শুরুর নেপথ্যে প্রভাব হিসেবে কাজ করছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সীমাহীন দুর্নীতি ও ধরাকে সরা জ্ঞানের মনোভাব।

জাবি উপাচার্য ফারজানা ইসলামের কাছ থেকে ছাত্রলীগের চাঁদা দাবি যারপরনাই ক্ষুব্ধ করেছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের (সদ্য বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলাফেরা এবং বেপরোয়া চাঁদাবাজিতেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

ইতিপূর্বে সংস্থাটির (বিদায়ী) চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রী বিষয়গুলো অবহিত করলেও ফারুক নিয়েছিলেন ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা। বস্তুত আর্থিক সুবিধা নিয়ে তিনিই সম্রাটকে সত্যিকার অর্থে সম্রাটের মতোই জীবনযাপনের সুযোগ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, যে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে আমি ও রেহানা (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা) চাঁদা দিই সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই সম্রাট চাঁদা চায়!

চলমান শুদ্ধি অভিযানে দেশের মানুষ উচ্ছ্বসিত। সবারই প্রত্যাশা দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন। এখনো গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচন না করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যেভাবে জাল টানছেন তাতে চুনোপুঁটি থেকে পর্যায়ক্রমে রাঘববোয়ালরাও ধরা পড়বে। সেই ক্ষেত্রই প্রস্তুত হচ্ছে ক্রমশ।

গডফাদাররা আড়ালে থাকলেও গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের প্রথম দিনেই সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায় সাবেক মন্ত্রী এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের। খালেদ ও সম্রাট মেননকে মাসে চার লাখ (মতান্তরে দশ লাখ) টাকা মাসোহারা দিতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান। যদিও শুরু থেকেই মেনন সম্পৃক্ততা অস্বীকার করছেন।

জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী এবং ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ক্যাসিনো সম্পৃক্ততা ধরা পড়ায় এদের বিদেশযাত্রায়ও নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে। এভাবে একে একে বেআইনি কাজে সম্পৃক্ত অন্য আইনপ্রণেতারাও অভিযানের আওতায় আসবেন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযানের কারণে সব স্তরের নেতাকর্মীর মনেই বিরাজ করছে আতঙ্ক। দল ছেড়ে কিংবা দেশে পালানোর সুযোগও মিলছে না তাদের। ফলে একধরনের দিশেহারা অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত।

অন্যদিকে শুদ্ধি অভিযানের ব্যাপ্তি নিয়ে ধন্দ কাজ করছে সবার মনে; সবকিছু শেখ হাসিনার একক নিয়ন্ত্রণে থাকায় অভিযানের গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করা যাচ্ছে না। ফলে সুযোগসন্ধানী ও অপরাধীরা স্বনির্মিত গেরোয় স্বেচ্ছাবন্দি; কেউ কেউ রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও নজরবন্দি !

পাঠকের মন্তব্য