বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সুনাম ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সুনাম ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সুনাম ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারি। আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৭০ বছর পার করেছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রতিপক্ষকে দমন ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে গণমাধ্যমের বড় শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সর্বশেষ ভিন্নমত প্রকাশ করায় ‘শিবিরকর্মী’ সন্দেহে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন সংগঠনটির বুয়েট শাখার নেতাকর্মীরা। এই ঘটনার জের ধরে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ।

ছাত্রলীগের ২৯তম সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতির দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং একই বিভাগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তবে মাদক সম্পৃক্ততা, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁদের সরিয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে। ভারপ্রাপ্ত এই দুই নেতার দায়িত্ব পাওয়ার এক মাস পার হয়েছে। কী পরিবর্তন এলো ছাত্রলীগে, আগামী দিনে পরিকল্পনাই বা কী? নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণ, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং ছাত্ররাজনীতি ইত্যাদি প্রসঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঙ্গে। রোববার (২৭ অক্টোবর) কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানা যায়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রফিকুল ইসলাম।

প্রতিবেদক : ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করতে কেমন লাগছে?

লেখক ভট্টাচার্য : ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে আসা ও সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়া ভাগ্যের বিষয়। তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এই নেতৃত্বে আসতে হয়। সংগঠনকে নিয়েই রাত-দিন কাজ করছি। ব্যক্তিগত সময় কাটানোর সুযোগ নেই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখতে হয়। সারা দেশের নেতাকর্মীরা নানা অভিযোগ নিয়ে আসেন, সেসব সমাধান করতে হয়। সংগঠন ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে দম ফেলার সময় পাচ্ছি না। তবু ভালো লাগছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠনকে নিয়ে কাজ করছি।

প্রতিবেদক : আপনার দায়িত্ব পাওয়া সম্পর্কে জানতে চাই।

লেখক ভট্টাচার্য : দেখুন, একটা বিশেষ সময়ে ছাত্রলীগের দায়িত্ব পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আস্থা রেখে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটা যথাযথভাবে পালন করতে চাই। সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। জগন্নাথ হল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকার পর শোভন-রাব্বানী কমিটিতে ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। আমাদের অগ্রজ শোভন-রাব্বানীকে সংগঠন থেকে সরিয়ে আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রতিবেদক : বিশেষ সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পেয়েছেন, সংগঠন পরিচালনায় কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?

লেখক ভট্টাচার্য : ছাত্রলীগের সুনাম ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন ইস্যু ও পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা এই সুনাম ফিরিয়ে আনতে চাই, সবাই মিলে এক হয়ে কাজ করতে হবে। সবার সহযোগিতা পেলে সেটা করা সম্ভব।

প্রতিবেদক : দুই বছরের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ। সেটা প্রায় ১৫ মাস অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে কী কী পরিকল্পনা বা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

লেখক ভট্টাচার্য : দুই বছর বা ২৪ মাস দায়িত্ব পালন করতে পারে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ। ১০ মাস সময় থাকতে আমরা দায়িত্ব পেয়েছি। আর এই দায়িত্ব পেয়ে সংগঠনকে গতিশীল করতে কাজ করছি। সারা দেশের সব সাংগঠনিক ইউনিটের নেতাকর্মীদের নিয়ে শিগগিরই একটি কর্মিসভা করা হবে। আর জেলাকে গতিশীল করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব বণ্টন করা হবে। কর্মিসভার মাধ্যমে সব নেতাকর্মীকে একটি কঠোর বার্তা দেওয়া হবে। ছাত্রলীগ একটি আদর্শিক সংগঠন, কোনো অপরাধ বা অপরাধমূলক কাজে জড়িতদের ঠাঁই হবে না।

প্রতিবেদক : ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ ও বিতর্কিতদের ঠাঁই পাওয়া সম্পর্কে আপনার ভাষ্য জানতে চাই।

লেখক ভট্টাচার্য : দেখুন, সরকার দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকায় ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। একসঙ্গে এই অনুপ্রবেশ ঘটেনি। অনেকে অতীত পরিচয় গোপন রেখে ছাত্রলীগে সক্রিয় হয়েছে। এই অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংগঠনে বিতর্কিতদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যাচাই-বাছাই চলছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, প্রমাণসহ কেন্দ্রীয় সংসদ ব্যবস্থা নেবে।

প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মেরেছে ছাত্রলীগ। এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগ কেন জড়াচ্ছে?

লেখক ভট্টাচার্য : সারা দেশে ছাত্রলীগের লাখ লাখ নেতাকর্মী। সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ কাউকে মারতে বা মারার নির্দেশ দেয় না। সংগঠনের অতি উৎসাহী কিছু নেতাকর্মী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে। আমরা ব্যবস্থাও নিচ্ছি। এই হত্যাকাণ্ডটি ছাত্রলীগের সাংগঠনিকভাবে হয়নি, ব্যক্তি উদ্যোগে হয়েছে। তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। যথাযথ বিচারের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদক : আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। শিক্ষার্থীরাও ছাত্রলীগকে দুষছে। আপনি কী মনে করেন?

লেখক ভট্টাচার্য : আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় সংগঠন হিসেবে দায় এড়িয়ে যাইনি। আমরা শীর্ষ নেতৃত্ব এ দায় মেনে নিয়ে লজ্জা ও দুঃখ প্রকাশ করেছি। সংগঠনের নাম ব্যবহার করে যারা অপরাধ করবে, সে অপরাধীই। দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তার শাস্তি হতে হবে। হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ছাত্রলীগের পদধারী ছিল বলে দায় এড়াতে পারি না, তবে এই ঘটনার জন্য ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে বলে মনে করি না।

প্রতিবেদক : নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলা পর্যায়ে ছাত্রলীগে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা রয়েছে। চেইন অব কমান্ড নেই। মেয়াদ শেষ হলেও পুরনোরাই ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছেন, যাতে নতুন নেতৃত্ব আসছে না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

লেখক ভট্টাচার্য : সারা দেশে ১১১টি সাংগঠনিক ইউনিটে লাখ লাখ নেতাকর্মী রয়েছে। জেলা পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা থাকতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। শিগগিরই সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হবে।

প্রতিবেদক : জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জন্য কেন্দ্রের বার্তা কী?

লেখক ভট্টাচার্য : ছাত্রলীগের ভিত্তিই হচ্ছে নেতাকর্মীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধতা ও একতা। সেই শক্তি নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ছাত্রলীগই আওয়ামী লীগের একমাত্র সংগঠন, যেখানে এক ডাকে লাখ লাখ নেতাকর্মী মাঠে নামেন। এটা অনেক বড় শক্তি। ছাত্রলীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ কিছু করতে পারবে না।

প্রতিবেদক : বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ এ বিষয়ে কী মনে করছে?

লেখক ভট্টাচার্য : আমরা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে নই। একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হতে পারে না। তারাই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চায়, যারা ছাত্র নেতৃত্বকে ভয় পায়। জাতীয় সব অর্জনে ছাত্ররাজনীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। এটাকে বাদ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ছাত্রদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে ছাত্ররাজনীতি থাকতেই হবে। বুয়েট প্রশাসনের কাছে আবেদন থাকবে—ছাত্ররাজনীতি সচল থাকুক, না হয় ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

পাঠকের মন্তব্য