ডিজিটাল প্রাথমিক শিক্ষা : উপকূলীয় প্রেক্ষাপট 

ডিজিটাল প্রাথমিক শিক্ষা : উপকূলীয় প্রেক্ষাপট 

ডিজিটাল প্রাথমিক শিক্ষা : উপকূলীয় প্রেক্ষাপট 

প্রাথমিক শিক্ষা : শিশুদের জন্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বা অনুমোদিত ১ম স্তরের শিক্ষা।

ডিজিটাল প্রাথমিক শিক্ষা : বিদ্যমান প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশ সৃষ্টির কাল হতে আবহমান পরিক্রমায় অদ্যবধি প্রচলিত হচ্ছে।কিন্তু বর্তমান সরকার দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত,পরিবর্তন ও সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তি, ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া ব্যবহার ও ব্যবহার পদ্ধতি আয়ত্ত্বকরণের মাধ্যমে আত্ম-সামাজিক উন্নয়ন,আধুনিক জাতি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে শিক্ষার ১ম ধাপ প্রাথমিক শিক্ষাকে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনার বহুবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।
উপকূলীয় প্রেক্ষাপটঃ

সাধারণত দেশের শিক্ষাবিদ ও পাঠ্যপুস্তক রচয়িতাগণ পাঠ্যবই প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশকে প্রধান দুটি অংশে ভাগ করে পুস্তক রচনা করে থাকেন। শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চল। এবং কিছু অংশ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী।কিন্তু এটা লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রাম এখনো একই রকম নয়। ঢাকা বা চট্টগ্রাম জেলার একটি গ্রামের প্রেক্ষাপট, ভোলা,সন্দ্বীপ বা কুতুবদিয়ার একটি গ্রামের প্রেক্ষাপট এক নয়। অনেক গ্রাম আছে যেগুলোর সাথে শহরের তেমন পার্থক্য থাকেনা। অনেক গ্রামের ঘরে ঘরে কম্পিউটার বা বিভিন্ন ই-মিডিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে যেমন খুলনা, বাগেরহাট, সুন্দরবন অঞ্চল,ভোলা,কুতুবদিয়া,মহেশখালী তাছাড়া হাওড় এলাকা যেমন সুনামগঞ্জ ইত্যাদি। এসব উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা সচরাচর গ্রামের শিশুদের মতো অনেক বিষয়ের সাথে পরিচিত নয়। তাই পাঠ্যপুস্তক রচনা বা প্রণয়নের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চল এদুইভাগে ভাগ না করে তিনভাগে ভাগ না করে তিনভাগে ভাগ করে ডিজিটাল পদ্ধতির বাস্তবায়ন  করার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। যেমন-(১)শহরাঞ্চল, (২) গ্রামাঞ্চল ও (৩) উপকূলীয়/হাওড় অঞ্চল।

তা নাহলে উক্ত অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কারনে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের সূচক বারবার বাধাগ্রস্হ হবে এবং ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশে যে ডিজিটাল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা বাস্তবায়নে কঠিন হবে।

উপকূলীয়/হাওর অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতাসমূহ

বিদ্যুৎ সরবরাহ : অধিকাংশ উপকূলীয়, হাওড় ও দ্বীপাঞ্চলে এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়নি। বিদ্যুতের অভাবে এসব অঞ্চলের শিশুরা এখনো ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া ও যন্ত্রের সাথে পরিচিত নয়। কম্পিউটার,ফ্রীজ,ওভেন ইত্যাদি শিশুদের জন্য নতুন। বিদ্যুৎ না থাকায় এসব অধিকাংশ এলাকায় তারা ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় অভ্যস্ত থাকেনা। তাই পাঠ্যবইয়ের অনেক বিষয় তাদের সঠিকভাবে বুঝতে কষ্ট হয়।তাছাড়া এসব বিষয়ে সহজে পরিচিত না থাকায় পাঠদানের উদ্দেশ্যও সফল হয়না।

যোগাযোগ ব্যবস্থা : বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্হা এখনো যথেষ্ঠ ভালো নয়। উপকূলীয় ও হাওড় অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যস্হা আরো দূর্বল। অনেক ক্ষেত্রে মূল ভূ-খন্ডের সাথে রাস্তায় কালভার্ট,ব্রীজ ইত্যাদির মাধ্যমে সরাসরি সংযোগ না থাকায় এসব অঞ্চলের শিশুরা বাস,ট্রাক,ট্রেন ইত্যাদি সুলভ যানবাহনের সাথেও পরিচিত নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে বৃহত্তর বনভূমি না থাকায় বড় কোন বৃক্ষের সাথেও তারা পরিচিত নয়। দ্বীপ ও হাওড় অঞ্চলের এসব শিশু কোন প্রয়োজন না থাকায় তারা ছোটকাল থেকেই অনেক বছর পর্যন্ত মূল ভূ-খন্ডে আসে না বিধায় এসব যানবাহন বা বৃক্ষ এর সাথে তারা পরিচিত হতে পারেনা। তাই এসব বিষয়ে পাঠদান যথেষ্ঠ কষ্টসাধ্য হয়য়ে পড়ে।

অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব : যেহেতু এসব হাওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র,অশিক্ষিত,অল্প শিক্ষিত,খেটে খাওয়া,মাছ ধরা ইত্যাদি তাদের প্রধান পেশা,সেহেতু এসব এলাকার অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে নিজেদের পরিবর্তন আনাকে এরা উচ্চবিলাসী চিন্তা বলে মনে করে। শিশুদের পড়ার প্রতি এদের উদাসীন এবং অমনোযোগী মনোভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা অনেক বিষয় সমাজের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলেও শিশুরা তা আয়ত্ত্ব করতে পারেনা।

শিক্ষকতার প্রতিবন্ধকতা : উপকূলীয় অঞ্চলে শিক্ষকতা একটি চ্যালেন্জের মতো। এখানে শিশুদের পাঠদানেই কাজ শেষ নয়। অভিভাবকদের বোঝানো, শিক্ষার্থীদের পারিপার্শ্বিক জ্ঞানের অভাবের কারণে তাদের প্রতি অতিরিক্ত খেয়াল রাখা,বিষয়বস্তুর ভিন্নরূপ উপস্হাপনের চিন্তাধারা সৃষ্টি করার জন্য শিক্ষকদের অনেক বেশি পরিকল্পনা ও পররিশ্রম করতে হয়। এখানে শিক্ষক হয়ে উঠেন অনেকটা সমাজ সংস্কারক।

অনেকের কাছে ডিজিটাল যন্ত্রপাতির ব্যবহার জানা থাকলেও চর্চার অভাবে এসব ই-মিডিয়ার ব্যবহার দ্রুত বিস্মৃতি হয়ে যায়। তাঁদের প্রশিক্ষনকালীন প্রদত্ত জ্ঞান বিদ্যালয়ের পারিপার্শ্বিকতা ও শিক্ষার্থীদের সাথে খাপ খায়না। তাই তারারা অনেক ক্ষেত্রে হতাশ হয়। অতঃপর শিক্ষাদান পদ্ধতির গতানুগতিক ধারায় তারা চলে যায়, অর্জিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

এনজিও'দের উদাসীনতা : বাংলাদেশে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী ও এনজিও আছে, যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করে থাকে।যেমন-BRAC, কিন্ডার গার্টেন স্কুল, স্যাটেলাইট স্কুল ইত্যাদি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনরকম ডিজিটাল পদ্ধতি ছাড়াই শিক্ষাদান করানো হয়।

রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারকদের উদাসীনতা : রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন সমাজ সংস্কারকগন প্রধানত তাদের শহরমুখী মনোভাবের কারনে নিজ এলাকার বা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সমম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেনা। এমনকি তারা তাদের নিজ সন্তানদেরও শহরমুখী করে তোলে। তাই তারা গ্রামের এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে মাথা ঘামায় না,সরকারের দৃষ্টিগোচরেও আসেনা।
এছাড়াও রয়েছে বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির তদারকি অভাব।

সরকার যা যা উদ্যোগ নিয়েছে : ডিজিটাল প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সরকার ক্রমান্বয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষন প্রদান ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের জন্য বিভিন্ন বিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রদান কর্মসূচী হাতে নিয়েছে।

উপরোক্ত প্রতিবন্ধকতা এড়াতে করণীয় : 

*বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি শ্রেণির নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ভাগ করে বিষয়গুলোর উপর ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের বিষয়কে বাস্তব ধরে নিয়ে নিজেদের মাঝে আয়ত্ত্ব করতে পারবে।

*যোগাযোগ ব্যবস্হার উন্নয়ন।
*বিদ্যুৎ সররবরাহের ব্যবস্হা করা।
*পার্বত্য চট্টগ্রাম এর মতো উপকূলীয় শিক্ষকদের জন্য আলাদা ভাতার ব্যবস্হা নিশ্চিত করতে হবে।
*রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারকদের এগিয়ে আসতে হবে।
*অন্যান্য বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ই-মিডিয়ার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
*শিক্ষার্থীরা যেন সময় সুযোগ পেলেই ডিজিটাল যন্ত্রপাতির সাথে পরিচিত হতে পারে, সেই সুযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের উপর দায়িত্ব দিতে হবে।
*শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে ইলেকট্রনিকস মিডিয়া ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে আরো জোরদারভাবে।
*ম্যানেজিং কমিটির তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে তাদেরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

সর্বোপরি আমাদের এটা বুঝতে হবে,পাঠ্যবই শিক্ষাদান পদ্ধতি আর ডিজিটাল শিক্ষাদান পদ্ধতি এক নয়।একজন দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকই পারেন এই পাঠদান পদ্ধতি ফলপ্রসু করতে। তাই প্রশিক্ষণেরও বিকল্প নেই।

শমসের নেওয়াজ মুক্তা
সহকারী শিক্ষক
ফ্লাঃ লেঃ কাইমুল হুদা সঃ প্রাঃ বিঃ 
কুতুবদিয়া, কক্সবাজার

পাঠকের মন্তব্য