জাতীয় জেল হত্যা দিবস ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

জাতীয় জেল হত্যা দিবস ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

জাতীয় জেল হত্যা দিবস ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

ইকবাল আহমেদ লিটন : বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির গর্ব। তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন এবং অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে অবিরাম রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক নেতৃত্ব দিয়ে তিনি স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রুপদান করেছিলেন। বাঙালি জাতির রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধুর ভুমিকা অপরিসীম ছিল। কিন্তু বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগষ্ট জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশৃংসভাবে হত্যা করে। তিনি দেশি এবং বিদেশী ষড়যন্ত্রের শিকার হন। তাঁকেই শুধু হত্যা করেনি তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করেছিল নির্মমভাবে। তাঁর দুই কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থানের জন্যে আল্লাহর অসীম রহমতে বেঁচে যান। একথা সবারই জানা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করেই হত্যাকারীরা ক্ষান্ত হয়নি। তারা নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করেনি। তাই একই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত চার সহচর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে নির্মমভাবে। আমরা এটাও জানি যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগারে বন্দী ছিলেন। অত্যন্ত একটি সংকট মুহূর্তে জাতিকে দিক নির্দেশনা দেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দীন আহমেদ, ক্যাপটেন মুনছুর আলি এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরই জাতীয় চার নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারের মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু কারাগারের ফটকে লেখা থাকে, "রাখিব নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ" দুনিয়ার সমস্ত মানুষ জানে কারাগার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা এবং সরকারের তত্বাবধানে কারাগার থাকে। সেই কারাগারে এই চার নেতাকে হত্যা করা হয়। কারণ, এই জাতীয় চার নেতা কেউ বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে যাননি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণে তাঁরা কেউ ক্ষমতার মসনদে বসতে চাননি এবং ক্ষমতার প্রলোভনকে ধিক্কার দিয়ে দুরে ছুঁড়ে ফেলে দেন। জাতির প্রতি কখন বিশ্বাস ঘাতকতা করেননি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলন সংগ্রামে তাঁদের অংশগ্রহন ছিল স্বক্রিয়। বঙ্গবন্ধু বহুবার জেলে গেছেন তাতে সাংগঠনিক কাজে কোন ব্যাঘাত ঘটেনি, বরং আন্দোলনকে সচল রাখার জন্যে যা যা করার তাই করতেন এবং তাঁরাও বহুবার জেল জুলুম সহ্য করেছেন। কিন্তু কখনো তাঁরা আপোষ করেননি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় খন্দকার মোস্তাক যখন ষড়যন্ত্র করেন তখনও তাঁরা অবিচল থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরা শুধু বঙ্গবন্ধুর প্রতিই নয় বাঙালি জাতির প্রতি কঠিন সময়েও তাঁদের উপর ন্যাস্ত দায়িত্ব নিষ্ঠার সংগে পালন করেছেন। ভাবতে অবাক লাগে জেলখানার মধ্যে তাঁদেরকে এক সাথে হত্যা করা হয়েছে।

আরো অবাক লাগে যে, রাষ্ট্রের মদদে তাঁদেরকে হত্যা করা হয়েছে। যে রাষ্ট্রের জন্যে তাঁরা এত কিছু করেছেন সেই রাষ্ট্রের অবৈধ রাষ্ট্রপতি বেইমান বিশ্বাসঘাতক খোন্দকার মোস্তাকের অনুমতি নিয়ে জেলখানায় প্রবেশ করে হত্যাকারীরা এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য কি ছিল? উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর পরে যেন কেউ নেতৃত্ব দিতে না পারে। জাতিকে নেতৃত্ব শুন্য করাই তাদের লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর খায়েস ছিল। দেশি ও বিদেশী চক্রান্তের বলয়ে আটকে পড়েছিল তারা। তাদের ভাগ্যেও জোটেনি তেমন কিছু। বরং বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেওয়াই তাদের অন্যতম পরিকল্পনা ছিল। বঙ্গবন্ধু ও চার নেতাকে হত্যা করে উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসতে সহায়তা করেছিল। জনগণকে মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধুলিসাৎ করার একটি অপপ্রয়াস মাত্র।

জাতীয় চার নেতা ছিলেন বাংলাদেশের চারটি পিলারের মত, যাকে মচকানো বা ভাংঙ্গা যাবে না। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর মত বিশ্বাসে অটল ছিলেন, জেল জুলুম অত্যাচার তাঁদেরকে দমাতে বা দাবায়ে রাখতে পারেনি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অসামান্য অবদান চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে যতদিন বাংলা ও বাঙালি জাতি থাকবে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ৬২ সালে শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুথান এবং ৭০ সালের নির্বাচনে অসাধারণ ভুমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার পরিচালনায় মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষরতার প্রমাণ রেখেছেন, এই জাতীয় চার নেতা। তা বাঙালি জাতী চিরদিন স্মরণ করবে হৃদয়ের মনি কোঠায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় যে, তৎকালীন সেই রাত্রে ইতিহাসের জঘন্নতম হত্যাকাণ্ড জেলের অভ্যন্তরে ঘটিয়েছিল পাকিস্থানি পেতাত্ত্বা বেঈমান জিয়া ও মোস্তাক। কলঙ্কিত করলো সমগ্র বাঙালি জাতিকে। বীরেরা কোন দিন মরে না। তাঁরা চিরঞ্জিব কারন কৃত্তিমানের মৃত্যু নেই তোমরা ছিলে, আছো, থাকবে আমাদের হৃদ মাঝারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার অবদানকে মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাসের পাতায় তাঁরা নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল হয়ে বাঙালির হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে। আজকে যে বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করছি এটা তাঁদেরই কৃতিত্ব। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না। হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ তাঁরাই দিয়েছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি শেলীর কথায় বলি, 'Our sweetest songs are those that tell of our saddest thought.' ৩রা নভেম্বর বাঙালি জাতির এক কলঙ্কময় দিন। যে কারাগারে পৃথিবীর সব মানুষ নিশ্চিত নিরাপত্তা পায়, সেই কারাগারেই সরকারী মদতে ঘাতকদল ভিতরে ঢুকে এই জাতীয় চার নেতাকে ব্রাশফায়ার করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেদিন জাতি হারিয়েছিল দেশের সূর্যসন্তানদের আর আমরা হারিয়েছি এই দেশের শ্রেষ্ঠ বীরদের। আমরা এই জাতির জনক ও জাতিয় চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের আত্ত্বার মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ যেন তাদের জান্নাত নছিব করেন আমিন। আর শহীদদের পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।

লেখকঃ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সদস্য সচিব আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ, ইকবাল আহমেদ লিটন।

পাঠকের মন্তব্য