ময়মনসিংহ ইপিআরে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান সৈয়দ আশরাফ

ময়মনসিংহ ইপিআরে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান সৈয়দ আশরাফ

ময়মনসিংহ ইপিআরে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান সৈয়দ আশরাফ

মো: মাহমুদ হাসান, উপ-সম্পাদকীয় :  সৈয়দ আশরাফ ২৮শে মার্চ একাত্তর ময়মনসিংহ ইপিআরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।

সদ্য প্রয়াত জনপ্রশাষণ মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (মার্চ একাত্তরে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক) মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই একটি জনযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে ২৮শে মার্চ খাগডহরস্থ তৎকালীন ময়মনসিংহ ইপিআর উইং সদর দপ্তরে অন্যান্য মুক্তিকামী যুবক ও ছাত্রনেতাদের সাথে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। টুঙ্গিপাড়ার খোকাকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতার আসনে অধিষ্ঠিত করতে ‘বাংলার বুলবুল সৈয়দ নজরুল’এর মতো তাঁর সুযোগ্য সন্তান সৈয়দ আশরাফেরও অসামান্য অবদান রয়েছে; বাঙ্গালী জাতির দূর্ভাগ্য যে, ইতিহাসে এসব অবদানের কোন কিছুই তেমনভাবে উল্লেখ নেই।

ময়মসসিংহের খাগডহরের যুদ্ধ ছিলো একটি সফল জনযুদ্ধ, যেখানে ব্যাপকভাবে জনগণ অংশ নেন দেশীয় অস্ত্র হাতে, পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ইপিআর ও পুলিশ সদস্যরা অংশ নেন ব্যারাক ছেড়ে আসার সময়ে সাথে নিয়ে আসা আগ্নেয়াস্ত্র সহ। যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিবৃন্দ (এমএনএ ও এমপিএগণ) এবং আওয়ামী লীগ, কম্যুনিষ্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। যুদ্ধের ময়দানে বাঙ্গালীদের ক্ষয়ক্ষতি হয় অনেক কম, পাকিস্তানীরা পরাজিত হয় নির্মমভাবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সরকার কাঠামো ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে পাকিস্তানীরা পরাজিত হওয়ার পর তাদের পিটিয়ে না মেরে ফেলে বন্দী করে জেলখানায় হস্তান্তর করা-এটাও ছিলো এ জনযুদ্ধের একটি সফল ও উল্লেখযোগ্য দিক। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এটি চিহ্নিত হতো-উগ্রবাদী সন্ত্রাসী তান্ডব বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাজ হিসেবে, যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ বারবার প্রচার করলেও বিশ্ববাসীর কাছে ধোপে টেকেনি।

১৯৬১ সাল হতেই “মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই দেশ স্বাধীন করতে হবে” বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ‘নিউক্লিয়াস’ এর মাধ্যমে এ মন্ত্র ময়মনসিংহের যেসব মুক্তিকামী রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র-যুবকরা জানতেন, তাঁরা রণপ্রস্তুতি ও রণকৌশলগত প্রশিক্ষণ আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিলেন। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতেই ২রা মার্চ, ১৯৭১ ‘জয় বাংলা বাহিনী’ ও ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী” সকাল ১০টায় টাউন হল ময়দানে জয় বাংলা বাহিনী প্রধান আবুল হাসেমের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্থানীয় প্রতিনিধি আওয়ামী লীগের সংগ্রামী নেতা রফিক উদ্দিন ভূঁইয়াকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানান (গার্ড অব অনার প্রদান করেন)। ২৫শে মার্চে পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরুর সাথে সাথেই ময়মনসিংহে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাষনের ওয়েবসাইটের “মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা” পাতায় উল্লেখিত তথ্যটি নিম্মরূপ, তবে বন্ধনীতে যাদের সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, সেই গৌরবজ্জল মুক্তিযুদ্ধের বীর নেতা ও সৈনিকদের পরিচিতি তুলে ধরেছি- 

[৭ই মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’’। বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক আহবানের পরেই বাঙ্গালী জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত হতে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা, পুলিশ এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যগণ অত্যন্ত গোপনে অস্ত্র চালনা ও রণকৌশল বিষয়ে শিক্ষা দান করেন। ২৫শে মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আক্রমণের পর ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে ময়মসসিংহের বীর জনতা পাকহানাদার বাহিনী নিধনে মরিয়া হয়ে উঠে।

যারই ধারাবাহিকতায় খাগডহরস্থ তৎকালীন ইপিআর উইং সদর দপ্তর সংগ্রামী জনতা ঘেরাও করে এবং বাঙ্গালী ইপিআর সদস্যদের সহায়তায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। এ যুদ্ধে ইপিআর সদস্য দেলোয়ার হোসেন ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের ড্রাইভারের পুত্র আবু তাহের মুকুল শাহাদৎ বরণ করেন। মূলতঃ এই যুদ্ধের পর পরই ময়মনসিংহের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত সীমান্ত ফাঁড়িগুলি বাঙ্গালী বিডিআরদের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। নিহত পাক সেনাদের লাশ নিয়ে ময়মনসিংহবাসী বিজয় মিছিল করতে থাকে ও ধৃত অন্যান্য পাকসেনাদের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ময়মনসিংহ জেলখানায় প্রেরণ করা হয়।

২৮শে মার্চ সকালে ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) ভবনের ৩য় তলার শীর্ষে হাজার হাজার লোকের জয় বাংলা ধ্বনির মধ্যে বাংলাদেশের নকশা খচিত পতাকা পতাকা উত্তোলন করেন মোঃ সেলিম সাজ্জাদ (পরবর্তীতে কমান্ডার, ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ), আবুল হাসেম (মার্চ ‘৭১এ ময়মনসিংহ সদর-উত্তর মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি, পরবর্তীতে ময়মনসিংহ বারের অ্যাডভোকেট), সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (মার্চ ‘৭১এ ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, বর্তমানে জনপ্রশাষন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় মন্ত্রী) নাজিম উদ্দিন আহমেদ (মার্চ ‘৭১এ ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, পরবর্তীতে ময়মনসিংহ বার এ অ্যাডভোকেট, আজীবন আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে কোনঠাসা থেকেও নিবেদত প্রাণ কর্মী, সম্প্রতি গৌরিপুর আসনে উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্য), ম. হামিদ (খাগডহর এর বাসিন্দা, মার্চ ‘৭১এ ছাত্র ও ঢাকায় ইউনিয়ন কর্মী, বর্তমানে টিভি ব্যক্তিত্ব) এসএম নাজমুল হক তারা (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাব-সেক্টর কমান্ডার, পরবর্তীতে কমান্ডার, ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও এরশাদের শাষনামলে সাধারন সম্পাদক জেলা বিএনপি-কিন্তু, বিএনপি ক্ষমতাসীন হলে, ইনি রাজনীতি হতে ছিটকে পড়েন), মৃত আব্দুল কাদের-কাদু মিয়া (এরশাদের শাষনামলে জাতীয় পার্টির নেতা ও নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান), কেএম শামছুল আলম, শেখ হারুন, খোকন বিডিআর ও পুলিশের সদস্যসহ জয় বাংলা ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অনেক সদস্যই অংশগ্রহণ করেন।]

এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারি ১৮ বছর বয়সী কলেজ ছাত্র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল (৬৯এর গণ-অভ্যুত্থানে ও ৭১এর মার্চে ছাত্র ইউনিয়ন-মতিয়া কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে ফেসবুকে “মুক্তিযুদ্ধের ফেরিওয়ালা বিমল পাল) এর সাথে মোবাইলে মাসখানেক আগে কথা বলে জেনেছিলাম, তিনি সেদিনের যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। তার জানামতে, “রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সেদিনের যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন, জননেতা রফিক ভূইয়া (মার্চ ৭১এ ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদ্ক ও সদর-উত্তর মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি), জননেতা শামছুল হক (সদর-উত্তর মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক), ন্যাপ নেতা আলতাফ আলী, কম্যুনিষ্ট পার্টি নেতা জ্যোতি বসু। অন্তত: ১০/১২ হাজার মানুষ সেদিন চতুর্দিক হতে দেশীয় অস্ত্র সহ ইপিআর ঘাটি ঘেরাও করেছিল। বেশ কিছু ব্যক্তি নিজস্ব লাইসেন্স করা বন্দুক নিয়ে সে যুদ্ধে অংশ নেন।“

সেদিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারি ১৪ বছরের কিশোর ও ময়মনসিংহ জেলা স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র মাহবুবুল আলম ফরিদ (পরবর্তীতে ১৯৮২-৯০এ সামরিক-স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সাহসী সৈনিক, বর্তমানে ময়মনসিংহ বারে অ্যাডভোকেট) এর সাথে মোবাইলে মাসখানেক আগে কথা বলে জানা যায়, “তিনি ও তার বন্ধুরা সেদিন জিলা স্কুলের স্কাউটদের ডামি রাইফেল নিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ডামি রাইফেল সাথে নেয়ার তাৎপর্য ছিলো, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অংশগ্রহণকারি গ্রামের কৃষক ও যুবকদের অনুপ্রাণিত করা এবং ব্যারাক ও পুলিশ লাইন ছেড়ে আসা সশস্ত্র ইপিআর সদস্য ও পুলিশ সদস্যরা সংখ্যায় মোট কত তা যেন কেউ আমলে না নিয়ে অনেক অস্ত্র আছে, এমন প্রকাশ করা, এই জনযুদ্ধে অংশ নেয়া মানুষেদের মনে।“ তিনি আরো জানান, “বীর জনতা ইপিআর ঘাটি ঘেরাওয়ের পর পাকিন্তানী ইপিআর সদস্যরা প্রথমে জনতার দিকে গুলি ছোড়ে, এতে কয়েকজন হতাহত হয়, একজনের লাশ পড়ে যায়, তার পাশেই, কিন্তু, একজন মানুষও ভয়ে পিছিয়ে যায়নি, বিজয় অর্জন করে পাকিস্তানী ইপিআর সদস্যদের বন্দী করে জেলখানায় ঢোকানো পর্যন্ত্য ১০/১২ হাজার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধের ময়দানেই ছিলো। 

অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম ফরিদ আরো বলেন, সেদিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরাসরি এই যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থেকে নির্দেশনা না দিলে বাঙ্গালীদের ক্ষয়ক্ষতি হয়তো আরো বেশি হতো। আর যেসব পাকিস্তানী বন্দী হয়েছিলো, জনতা হয়তো তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলতো। তিনি আরো জানান, অগ্নিঝরা মার্চে তাঁকে ও তাঁর জিলা স্কুলের অন্য বন্ধুদের উদ্বুদ্ধ করতে বেশি কাজ করেছেন আবুল হাসনাৎ (মার্চ ৭১এ ময়মনসিংহ সদর-দক্ষিন মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি, পরবর্তীতে ময়মনসিংহ কোতুয়ালী থানা জাসদের সভাপতি, বর্তমানে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়।) এই যুদ্ধের দিনটিতে হাসনাৎ ভাই জনগণের উদ্দেশ্যে টাউন হল চত্ত্বর হতে খন্ড খন্ড ভাষণ ও দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন দুর্বার গতিতে খাগডহরের দিকে ছুটে যেতে।

চ্যানেল আই অনলাইন নিউজের ১৭ই মার্চ, ২০১৭ এর সামছুদ্দোহা পান্নার “ময়মনসিংহের প্রতিরোধ যুদ্ধ” শিরোনামের প্রতিবেদনের কিছু অংশ এমন : ২৬শে মার্চ রাতে বাঙ্গালী ইপিআর সদস্যদের অস্ত্র জমা দিতে নির্দেশ দেয় ময়মনসিংহের ইপিআর হেড কোয়ার্টারের অবাঙ্গালি কমান্ডার ইনচার্জ। সন্দেহ দানা বাঁধলে সে রাতেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় ইপিআর সদস্যরা। পরদিন সকালে ময়মনসিংহের বিক্ষুদ্ধ মুক্তিকামী জনতা মিছিল নিয়ে ইপিআর হেডকোয়ার্টারের দিকে আসতে থাকে। সাধারণ মানুষ আন্দোলন শুরু করেছে জানতে পেরে মনোবল জোরালো হয় ইপিআরের বাঙ্গালি সদস্যদের। ২৮শে মার্চ বাঙ্গালী ইপিআর সদস্যদের অস্ত্র জমা দিতে চাপ দিলে শুরু হয় যুদ্ধ। প্রাণপণ লড়াই শেষে ইপিআর হেডকোয়ার্টার নিয়ন্ত্রণে আনে তারা। ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধে ২৮শে মার্চ আসে প্রথম জয়।

এ যুদ্ধে গণ-মানুষের অংশগ্রহণের একটি ছবি আমি একমাস আগে অনলাইনে পেয়ে ফেসবুকের ম্যাসেজের মাধ্যমে ময়মনসিংহের অনেকের কাছে পাঠিয়েছিলাম। বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল ও অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু (১৯৮২-৯০এ সামরিক-স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সাহসী সৈনিক, ১৯৯১ হতে চলমান রাজাকারদের বিচার দাবীর আন্দোলনের সংগঠক, ময়মনসিংহ বিভাগ বাস্তবায়ন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক বর্তমানে ময়মনসিংহ বারের অ্যাডভোকেট ও জাসদ নেতা) ছবিটি সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন। তারা দুজনেই এ ছবিটি ময়মসসিংহের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে, এ জনযুদ্ধর সময়ে ছবিটি তুলেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোগ্রাফার নাইবুদ্দিন আহমেদ, যিনি ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধের ও গণহত্যার অনেক ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং এখনো এই ঐতিহাসিক মূল্যবান দলিলগুলি সযত্নে আগলে রেখেছেন। অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নুর শোনা মতে, “খাগডহর যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে পুরোভাগে ছিলেন, জননেতা রফিক ভূইয়া, জননেতা শামছুল হক এবং জননেতা অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান।“ তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, “দুই মহান নেতা পরপারে চলে যাওয়ার পর এখন খাগডহর যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস কেউ জানতে হলে ‘খাগডহর যুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তী অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান’ই বর্তমানে সঠিক উৎস; যিনি নেতাদের ভূমিকা ও জনগণের ভুমিকার মধ্যে সেদিনে মূল সমন্বয়কারি ছিলেন, মার্চ একাত্তরে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে।“

খাগডহরের যুদ্ধের নেতৃত্ব সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য কেউ কেউ প্রচার করার চেষ্টা করেন যে, বর্তমানে টিভি ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ খাগডহর যুদ্ধের মূল নেতা। ঐতিহাসিক কোন ঘটনার উল্লেখ করতে গেলে বিভ্রান্তিকর তথ্যগুলির অনুসন্ধান করে তার সঠিক বিষয়টিও উদঘাটন করতে হয়। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তথ্যের আশায় ৭১এর মার্চে ময়মনসিংহে অবস্থান করা কিন্তু, বয়স কম হওয়ায় ঐ যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি এমন তিনজনের সাথে কথা বলি। এদের সাথে কথা বলা এ জন্য যে, ঐ সময়ে তাঁরা স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরী হিসেবে ঘটনাগুলি শুনেছেন ও মনে গেঁথে আছে, আর আমি এদের সর্ম্পকে জানি যে, এরা কোন ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিবেন না। ১৯৮২-৯০ এ ময়মনসিংহে সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এই তিন সাহসী সৈনিক হলেন অ্যাডভোকেট এমদাদুল হক মিল্লাত (ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক জেলা সভাপতি ও কম্যুনিষ্ট পার্টির সম্পাদক), কাজী আজাদ জাহান শামীম (সাবেক আমোকসু জিএস ও আওয়ামী লীগ নেতা) এবং নাদেজদা ফাতেমা শিখা (সাবেক জাতীয় ছাত্রলীগ নেতা ও সাহিত্যিক এবং ন্যাপ নেতা আলতাফ আলীর নাতনি)। তাদের তিনজনের সাথে কথা বলে জানতে পারি যে, ম. হামিদ শুধু নন, তাঁর পরিবারের সবাই এ আন্দোলনে সক্রিয় কর্মীর ভূমিকায় ছিলেন। ম. হামিদ তখন ছাত্র, মূল নেতৃত্বে ছিলো বলা নিতান্তই বেমনান। তাঁরা আরো জানান ম. হামিদের পরিবারের সদস্যরা সহ খাগডহর, ঢোলাদিয়া এবং আশেপাশের এলাকার সাধারন মানুষ একটি ব্যতিক্রমধর্মী আন্দোলন চালিয়ে আসছিলো, যা কোন ঐতিহাসিক তথ্যে লিখিতভাবে আমি পাইনি।

খাগডহরবাসীর অসহযোগ আন্দোলন-পাকিস্তানী/পাঞ্জাবীগো কাছে তরকারী বেচতাম না কেউ : ১লা মার্চে ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন, তার বাস্তবায়ন করতে গিয়েই খাগডহরবাসী ইপিআর উইং সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন রত পাকিস্তানী/পাঞ্জাবীদের কাছে শাক-সব্জি, তরি-তরকারী বিক্রি করবে না, এমন সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা পুরোপুরি কার্যকর হয়, যে ছোট ঘটনাটি খাগডহর ও আশেপাশের মানুষেদের মানসিকভাবে তৈরি রাখে যখনই প্রায়োজন, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ ও আক্রমণের জন্য। এ বিষয়ে আমি যতটুকু অনুসন্ধান করতে পেরেছি, তাতে প্রতীয়মান হয় যে, ‘পাঞ্জাবীগো কাছে তরকারী বেচতাম না কেউ’ এ আন্দোলনে মূল নেতৃত্বে ছিলেন গফরগাঁও এলাকা হতে মাইগ্রেটেড হয়ে খাগডহরের বাসিন্দা জনাব শেখ হারুন।

অসহযোগ আন্দোলনেও ময়মনসিংহে সৈয়দ আশরাফের গৌরবময় অংশগ্রহণ : ২রা মার্চ জয় বাংলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সকাল ১০টায় টাউন হল ময়দানে অভিবাদন জানাবেন বলে আগের দিন থেকে মাইকে ময়মনসিংহ শহরব্যাপী ঘোষণা হতে থাকে। জয় বাংলা বাহিনী প্রধান আবুল হাসেমের নেতৃত্বে জয় বাংলা ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সারিবদ্ধভাবে শহর প্রদক্ষিণ করে টাউন হল চত্বরে সমবেত হয়ে আওয়ামী লীগের সংগ্রামী নেতা রফিক উদ্দিন ভূইয়াকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানান। মুহুর্মুহু জয় বাংলা ধ্বনির মধ্যে পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের নকশা খচিত পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদ। অভিনন্দন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, নেতাকর্মীদের মধ্যে জনাব শামছুল হক, এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক, ইমান আলী, আনন্দমোহন কলেজের ভিপি আব্দুল হামিদ (১৯৭০ এ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন) মতিউর রহমান (মার্চ ৭১এ মিন্টু কলেজের অধ্যক্ষ, বর্তমানে মাননীয় ধর্ম মন্ত্রী), আফাজ উদ্দিন, কমর উদ্দিন, এডভোকেট আনোয়ারুল কাদির, সৈয়দ আহমদ (মার্চ ৭১ এ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক), চাঁন মিয়াসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

মো: মাহমুদ হাসান (ভূতপূর্ব কলেজ অধ্যক্ষ ও সমাজ গবেষণা কর্মী), ঢাকা, তারিখ: ৩রা জানুয়ারি, ২০১৯, সময়: রাত ১০.৫১ টা।

পাঠকের মন্তব্য