মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও চেতনা প্রাসঙ্গিক তিতা কথা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও চেতনা প্রাসঙ্গিক তিতা কথা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও চেতনা প্রাসঙ্গিক তিতা কথা

ইকবাল আহমেদ লিটন, উপ-সম্পাদকীয় : “আজ আমি শোকে বিহ্বল নই, আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই, আজ আমি রক্তের গৌরবে অভিষিক্ত” যাইহোক, প্রত্যেক দেশ ও জাতির নিজস্ব ভাষা থাকে। আর তাই হলো মাতৃভাষা বা মায়ের ভাষা আর সেটা হয় মানুষের ও জাতির ভাব প্রকাশের বাহন। মায়ের মুখ থেকে শেখা ভাষার বিকল্প কিছু নেই। মাতৃভাষাতেই মনের ভাব সম্পূর্ণ বোধগম্যভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। যা অন্য ভাষাতে কখনোই প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তাই ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রতিটি মানুষের বাঞ্চনীয়।

আজ আমাদের গর্বের ও অহংকারের ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছরে পা দিল। কিন্তু আমি এ প্রজন্মের একজন। রাজপথে শুনতে হয়নি সেই শ্লোগান- 'রাষ্ট্র ভাষা-রাষ্ট্র ভাষা, বাংলা চাই-বাংলা চাই।' দেখতে হয়নি ভাষার জন্য রক্তে রঞ্জিত রাজপথ। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েই আমি গর্বিত একজন বাঙালি নাগরিক। আমি বাংলাদেশী, আমি বাঙালি, আমার নিজস্ব ভাষা বাংলা। 

অথচ বায়ান্নতে, তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তি হত্যা করেছিল তাদের, যারা এই দাবী করেছিলেন যে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হোক। পাকিস্তানীরা আমাদের উপদেশ দিয়েছিল, পাকিস্থানী হয়ে যেতে কিন্ত আমরা হইনি। উপরন্তু সেদিন বাঙালি তাদের বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছে জোরের সঙ্গে। তাতে পাকিস্তানিরা ক্ষুদ্ধ ও শঙ্কিত হয়ে অস্ত্র দিয়ে আমাদের পাকিস্তানি করতে চেয়েছিল। সেই প্রয়াসও তাদের শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এ কথা আমরা সকলে জানি। আবার এটাও জানি, বিশ্বের বুকে একমাত্র বাঙালিই জানে মায়ের ভাষায় কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা কত কঠিন। অ-অজগর আসছে তেড়ে, আ-আমটি আমি খাবো পেরে, পড়তে না পারার কষ্ট। ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছরে দাঁড়িয়ে আমরা কি করছি ? যখন সারাবিশ্ব আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করছে এই দিনটি, বিশ্ব যখন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, আমরা মায়ের ভাষা বলতে কি বুঝি ? আদৌকি বুঝি, মায়ের ভাষা কাকে বলে ?

কিছু কথা তো আছেই, তা বাংলা ও ইংলিশের সংমিশ্রণে বলা ভাষা বাংলিশে হোক বা ইংলিশে! ভাষা নিয়ে ভাসাভাসি মন্তব্য করার অবকাশ না থাকলেও লজ্জাহীনতা আর নকলে যেন আমরাই সেরা। ২১শে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আয়োজিত একুশ রকমের ফাইজলামী দেখে ও মাথা না ঘামানোর মত হাজারো আমজনতা আছে। একদিকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি অপরদিকে ২১শে ফেব্রুয়ারির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে বাঙালিরা দিশেহারা। অপরদিকে বিন্দু পরিমান সম্মান আর ভালবাসার লেশ না থাকার পরেও ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে ইউনিলিভারের ক্লোজ আপ দিয়েছিল কাপলদের জন্যে "ফ্রি রিক্সা রাইডের অফার"। তাদের ব্রান্ডেড ভালবাসা রিক্সার হুডের অন্তরালে কোন পর্যায়ে যাবে বোঝার অবকাশ নাই। জাতি হিসেবে আমরা মোটেও বেহায়া নই, তবুও ভোগ করছি বহুজাতিক কোম্পানির প্রতারনা ও প্রচারণার ভালবাসা দিবসের ফল। ১৪ই ফেব্রুয়ারী নিয়ে শরীর সর্বস্ব প্রেমিকদের যেমন আবেগের শেষ নাই তেমনি ২১শে ফেব্রুয়ারি নিয়ে প্রগতিশীল বুদ্ধিবিক্রেতাদের আবেগের শেষ নাই। বিশেষ করে কিছু লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের কাছে'তো ফেব্রুয়ারি মানে পোয়াবারো অবস্থা। এরা সারাবছর কলমের কালি প্রসবের মাধ্যমে বস্তায় বস্তায় জ্ঞান সরবরাহের মাধ্যমে ফেব্রুয়ারিতে উপরি কিছু কামানোর আশায় কিছু সংক্ষক অসাদুরা বাঙালি সাজে। প্রভাতফেরী করে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতের গুণকীর্তন করে। পারলে এরা নিজেরাও ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়ে দেয়। তবে বাস্তবতা হলো সব ব্যবসায়িক ধান্ধাবাজি আর মোনাফেকি। ২১'শে ফেব্রুয়ারীর শ্রাদ্ধ শেষে এরা মুখে বড়সড় কুলুপ লাগায়। এরাই এফ এম রেডিওতে বাংলাকে ইংরেজীর মিলিত ধর্ষিত রুপে শ্রবণ করে বিকৃত মজা নেয়। এদের সন্তানরা বাংলায় কথা বলতে পারে না। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপধ্যায় যেমন বলেছিল, "অকর্মারা নাকি শিব গড়তে গিয়ে বানর গড়ে" তেমনি ইংরেজীর প্রভাবে এদের বউ বেটি মাথায় সোনালী রং লাগিয়ে বিলাতি মেম সাজতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বিলাতি কুত্তা সাজে। 

জাতিসংঘে বাংলা ভাষার ব্যবহারের দাবি করে অথচ নিজেরা বাংলায় কথা বলতে লজ্জা করে। নিজ দেশের হাইকোর্টে যেখানে বাংলার ব্যবহার করে না সেখানে জাতিসংঘে বাংলার ব্যবহার করার দাবি হাস্যকর।বলছি সেই সব বাঙালিদের আর সেই সব প্রেমিকের কথা যাদের ভালবাসা আর দেশপ্রেম আবর্তিত হয় শুধু কোন দিবসকে কেন্দ্র করে। তবুও লক্ষ কোটি মানুষ আছে যাদের রয়েছে নিঃস্বার্থ গভীর দেশপ্রেম আর মানুষের প্রতি ভালবাসা। যা জাহির করার জন্যে কোন দিবস লাগে না। সর্বাগ্রে বাংলা ভাষার সঠিক ও শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং তথাকথিত ভন্ড দেশপ্রেমিকদের হাত থেকে দেশকে আর লুচ্ছা প্রেমিকদের হাত থেকে সহজ সরল নারী জাতিকে রক্ষা করা উচিত।

তাহলে বিশ্ব আমাদের কাছ থেকে কি শিখবে ? তারা কি আমাদের মা করবে ? আমরাই কি মা করতে পরবো নিজেদের ? বলা হয়ে থাকে ইতিহাস কালের স্বাক্ষী। ইতিহাস আমাদের অতীত। পূর্ব পুরুষদের জানার সুযোগ করে দেয় ইতিহাস। আজ যা বর্তমান কাল তা ইতিহাস। কিন্তু সমাজের কর্ণধারগণ বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালির চিরন্তন শ্রদ্ধাবোধ ভুলে এ কোন ইতিহাস সৃষ্টি করছেন? একে বিনা প্রশ্নেই মেনে নেয় সব শ্রেণীর মানুষ! নাগরিক জীবনে দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায় একুশের আবেগ। অথচ বায়ান্নর পর থেকে একুশের প্রত্যুষ প্রভাতফেরির মধ্যদিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন একুশের মহিমাকে আলাদা উজ্জ্বলতা দিয়েছে। 

কিন্তু আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে এই দিনটি পালন করছে সারাবিশ্ব। পাশ্চাত্য যেখানে আমাদের অনুসরণ করে চলবে, সেখানে পাশ্চাত্যের অনুসরনেই চলে একুশের তর্পণ! ভাষা আন্দোলনে ৬৮ বছরে দাঁড়িয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে একটাই প্রার্থনা, আমি আমার বাঙালি জাতির দ্বি-বিভক্তি চাই না। হারাতে চাই না সঠিক ইতিহাস। দাঁড়াতে চাই না মিথ্যাকে সঙ্গী করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের মুখোমুখি। একুশের চেতনাকে ফিরে পেতে চাই স্ব-মহিমায়। সকল ভাষা সৈনিকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সদস্য সচিব আয়ারল্যাড আওয়ামী লীগ

পাঠকের মন্তব্য