দারিদ্রতা আর বাল্যবিবাহের চোখ রাঙ্গানী থামাতে পারেনি ফুটবলারদের

দারিদ্রতা আর বাল্যবিবাহের চোখ রাঙ্গানী থামাতে পারেনি ফুটবলারদের

দারিদ্রতা আর বাল্যবিবাহের চোখ রাঙ্গানী থামাতে পারেনি ফুটবলারদের

রাণীশংকৈল প্রতিনিধি : ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলার হয়ে উঠবার এই ব্যতিক্রমী সাহসী উদ্যোগ যিনি নিয়েছেন তিনি এলাকার ক্রীড়া অনুরাগী অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, 'অনেক কষ্ট করে গ্রামের মেয়েদের ভালো ফুটবলার তৈরিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। নিজ উদ্যোগে একটি একাডেমি তৈরি করেছি। 

সরকারি বা কোন অর্থশালী ব্যক্তি যদি এগিয়ে আসে তাহলে এখান থেকে দেশের ভাল মানের নারী ফুটবলার তৈরি হবে। তারা এলাকার ও দেশের সুনাম বয়ে নিয়ে আসার ক্ষমতা রাখে। তিনি আরও জানান, রাঙ্গাটুঙ্গি মহিলা ফুটবল একাডেমীর খেলোয়াড় জাতীয় দলে খেলছে। কারণ প্রতিষ্ঠান না থাকলে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরি হবে না। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি খেলার প্রতিষ্ঠানকেও সরকারি সহযোগিতা উচিত। নিজের অর্থ ব্যয় করে একাডেমিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু অর্থের অভাবে ইচ্ছে থাকলেও সবার চাহিদা পূরণ করতে পারছি না।' বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ের মুখে হাসি দেখতে চাই। তার কথায় বুঝা গেলএই ব্যাপারটা তাঁকে দারুণ আলোড়িত করেছে, তিনি বলেন সেটা হলো, শুধু শিশুরাই নয়, বাংলাদেশের সব মানুষ শত কষ্টের মাঝেও কখনো হাসি থামায় না। দেখা গেছে, প্রত্যন্ত এ এলাকায় স্বপ্ন দেখাটা সম্ভবত একটু বেশি কষ্টকর! হোক না কষ্টসাধ্য তাতে কি? অসম্ভব তো কিছুই নেই। সম্ভবনা আর প্রবল ইচ্ছেশক্তি থাকলে নিজেকে সেরা খেলুয়ারদের তালিকায়নেয়া যায়। 

খেলোয়ারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ,তাদের সামনে কেবল সামাজিক বাঁধাই ছিল না, ছিল দারিদ্রতা, বাল্যবিবাহের চোখ রাঙ্গানী, ছিল ফুটবলাার হবার জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব। আর সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নিভৃত একটি গ্রামে সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এ সহজ সরল মেয়েরা ফুটবল খেলছে। ভাবতে আনন্দে মনটা জুড়িয়ে যায়। হঠাৎ ঠাকুরগাঁও থেকে ইএসডিও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুজ্জামান ১৩ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙ্গাটুঙ্গির সাদা মাটা সরল রাস্তা দিয়ে একটি গাড়ীতে নেমে গেলেন ফুটবল খেলার মাঠে খেলোয়ারদের দেখতে, সাথে মতবিনিময় করতে। মুগ্ধ হলেন চোট বড় বিভিন্ন বয়সের খেলোয়ারদের সাথে কুশল বিনিময় করে। তাৎক্ষনিক পঞ্চাশ হাজার নগদ অর্থ সহযোগিতা করলেন, উৎসাহিত করলেন কথা বলে। হয়ত এ ভাবেই কোন না  কোন ভাবে চলছে চলছে রাঙ্গাটুঙ্গির মহিলা ফুটবলারদের অর্থের যোগান। যদিও প্রানপন চেষ্টার কোন কমতি রাখেননি এ একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম। এমনি কথার ফাঁকে জানা যায়, দেশের পরিসর অতিক্রম করে কেউ কেউ লাল সবুজ জার্সিতে আন্তর্জাতিক ভাবে বিভিন্ন প্রান্তে বিচরণ করছে। অর্জন করছে একজন আদর্শ ফুটবলার হিসেবে। যা ছিল স্বপ্নেরও অতীত। এমনিতেই যেখানে তাঁরা ফুটবল খেলছে। সেসব গ্রামের মানুষের চোখগুলো নারীদের হাফপ্যান্ট আর জার্সিতে ফুটবল খেলা দেখতে মোটেই অভ্যস্ত ছিলো না। 

আজ সেই চোখ গুলোতে ঝড়ছে খেলোয়ারদের জয়ে উচ্ছাসের ঢেউ। মহিলা একাডেমির সংগঠক তাজুল ইসলাম  দরিদ্রও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের নিয়ে জেলা শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অজপাড়াগাঁয়ে ব্যক্তি মালিকানায় নিজ উদ্যেগে গড়ে তুলেছেন রাঙ্গাটুঙ্গি মহিলা ফুটবল একাডেমি।এই মেয়েরা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে জেলায় কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন , রংপুর বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে গিয়েও নিরাশ হয়ন। 

বেশকয়েকজন বিএকেএসপিতে সুযোগ পেয়েছে লোর সুযোগ। সম্প্রতি ফুটবল ফেডারেশন থেকে ২ জন খেলোয়াড় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদানও পেয়েছে। সেই টাকায় তাদের দরিদ্র পরিবার ঘরবাড়ি নির্মাণসহ জমি কিনে ফসল ফলাচ্ছেন। তাদের দেখে এলাকায় মহিলা খেলোয়াড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন মহিলা ক্রীড়া এ প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে রাঙ্গাটুঙ্গি মহিলা ফুটবল একাডেমির সোহাগী কিসকু ও মুন্নী আক্তার আদূরী বর্তমানে বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন। বিথীকা কিসকু, কোহাতী কিসকু, কাকলী আক্তার, শাবনুর নিয়মিত অনুশীলন করছেন। সাথে ছোট ছোট মেয়েরাও। শুরুর কথা রূপকথার মতোই মনে হতে পারে। রাণীশংকৈল রাঙ্গাটুঙ্গি এলাকার মাঠে প্রীতি ফুটবল ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়।তখন তাদের ডেকে এলাকার ক্রীড়া অনুরাগী অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম ফুটবল খেলার কথা বলেন। 

২০১৪ সালের পর থেকে রাঙ্গাটুঙ্গি মহিলা ফুটবল একাডেমিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তারা বেশ এগিয়ে। সেই সঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের নাম ছড়িয়ে দিবে বিশ্বব্যাপী। সেই লক্ষ্যে ক্ষুদে এই খেলোয়াড়দের কোচ জয়নুল ইসলাম, শুগা মরমু ও পরিচালক অধ্যক্ষ তাজুল ইসলামের অধীনে অনুশীলন করছেন প্রতিদিন।আজ বিভিন্ন গ্রাম থেকেও খেলতে আসছে মেয়েরা। জেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে, সেখান থেকে জাতীয় পর্যায়ে খেলছেন তারা। মেয়ে ফুটবলাররা জানান, "যখন মহিলা ফুটবল শুরু হয়, তখন গ্রামের মানুষের অনেক আপত্তি ছিলো, কেন মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে? এমনও হয়েছে মাঠে খেলা চেষ্টায় অনেকটা এগিয়ে গেলেও অর্থের কারণে অনেক সময় নিয়মিত অনুশীলন করতে হিমশিম খেতে হয়। খেলতে গেলে খাওয়ার প্রয়োজন, নিয়মিত অনুশীলনের জন্য যদি খেলাধুলার সরঞ্জাম ও প্রয়োজন একজন ভাল প্রশিক্ষকেরও। কয়েক জনকে বিকেএসপিতে ভর্তি নিতে চাচ্ছে কিন্তু অর্থের অভাবে তাদের ভর্তি করতে পারছি না। প্রথমে সরকারি ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে কিছু সহযোগিতা পেলেও এখন আর পাই না।

পাঠকের মন্তব্য