জাতির পিতা 'বঙ্গবন্ধুর কাঙ্খিত বাংলাদেশ' আর কতদূর 

জাতির পিতা 'বঙ্গবন্ধুর কাঙ্খিত বাংলাদেশ' আর কতদূর 

জাতির পিতা 'বঙ্গবন্ধুর কাঙ্খিত বাংলাদেশ' আর কতদূর 

ইকবাল আহমেদ লিটন, উপ-সম্পাদকীয় : সর্বকালের সেরা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাতকোটি মানুষের মনের কথাটি বলেছিলেন যে কবিতায় এর নাম ৭'ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষন, অমর কবিতা। রক্তে বান ডেকেছে, ভয়হীন হয়েছে চিত্ত। এমন ভয়শূন্য, জেগে ওঠা বীর জাতিকে দাবিয়ে রাখে এমন সাধ্য পৃথিবীর কোন সেনাবাহিনীর আছে? পারেওনি। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে দাড়িয়ে অবাক হয়ে ভাবি, এমন বাংলাদেশ কি চেয়েছিলাম, যেখানে স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও ঘাতকের দল এ দেশে দাপিয়ে বেড়াবে ? না, এমন বাংলাদেশ মোটেও চাইনি। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাঙ্খিত বাংলাদেশ আর কত দূরে ? যাইহোক, ১৫'ই অগাস্ট ১৯৭৫ সালে জাতি তার সর্বোত্তম/মহান মানুষটিকে হারিয়ে এক দিশেহারা সময়ের ভিতর দিয়ে দিন পার করতে থাকে। আর জাতির পিতার সন্তানেরা তাদের জীবনের সবচাইতে মূল্যবান ধন তাদের পিতা মাতা ও তিন ভাইকে হারিয়ে এক অনিশ্চিত অন্ধকার সময় পার করছিলেন। তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন হয়ে যায় অনিশ্চিত। নিজেরাই একটু ভেবে দেখুন, এমতাবস্থায় আমি কিংবা আপনি কি করতাম?

সময়ের বিবর্তনে শেখ হাসিনা সাহস আর শক্তি সঞ্চয়ে নিজেকে মানুষ হিসাবে ইস্পাত কঠিন ভাবে তৈরি করেন। এই শক্তি হয়তো আমাদের অনেকেরই হতো না। আমি কিংবা আপনি যদি কোন দলীয় দৃষ্টি ভঙ্গির বাইরে এই মানুষটিকে ও তার ক্ষমতাকে বিবেচনা করি তাহলে বলবো তিনি ঠিকই তার বাবা বঙ্গবন্ধুর মতই নিজেকে একজন সাহসী আর দক্ষ মানুষ হিসাবেই তৈরি করতে সচেষ্ট হয়েছেন। এদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সময়ের বিবর্তনে সত্যিকারের মুজিব সেনারা নিজেদের সঠিকভাবে গোছাতে পারছিলেন না। সবাই যেন কেমন একটা হতাশায় ভুগছিলেন। দলের মাঝেই অনেকেই শক্তি হারিয়ে নির্জীব হয়ে পড়লেন। কাজেই সৃষ্টি হচ্ছিলো দলকে সামাল দেবার নেতৃত্বের। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সুযোগ সন্ধানী হাইব্রিড নেতারা সেই মুহূর্তেই এই সুযোগকে কাজে লাগাতে একটুও বিলম্ব করলো না। দল সংগঠনকে গোছাতে প্রবাসে বঙ্গবন্ধুর দুই সন্তান জান প্রাণ দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন। যেটা ছিল আমাদের আমাদের বাঙালি জাতির জন্যে এক গর্বের বিষয়। কিন্তু বুঝতে সক্ষম ক'জনা ? দীর্ঘদিন প্রবাস থেকে দেশে ফিরেই শেখ হাসিনা দল গোছাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন কিন্তু হায় এই হাইব্রিড নেতাদের উৎপাতে ততদিনে দলের মাঝে শক্ত বাসা বেঁধেছে। এই সবের দায়ভার কোন ভাবেই শেখ হাসিনাকে দেয়া যায় না। তিনি তো আর ইচ্ছে করে এই উৎপাত ডেকে আনেন নাই। সময়ের বিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই এর জন্যে দায়ী করা যেতে পারে। রাজাকার ও তাদের দোসররা ততদিনে বাংলাদেশে তাদের শক্ত আসনে বসে গেছে। 

এই স্বাধীনতা বিরোধীরা রাজনীতিতে ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা শিখে গেছে। ধর্মভীরু বাঙালি জাতি এই সব স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে। এখানেই শুরু হয়ে যায় শেখ হাসিনার দিন বদলের যুদ্ধ। নিজের জীবনকে পরোয়া না করে তিনি রাজনীতির মাঠে নেমে পড়েন। ২১ আগস্টের ঘটনা তার জ্বলন্ত উদহারণ। এরকম একটা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে দেশের ক্ষমতাভার গ্রহণ করাটাই ছিল শেখ হাসিনার সব চাইতে বড় চ্যালেঞ্জ এবং পরবর্তীতে তিনি তাতে জয়ী হন আর দেশের শাসন ভার গ্রহণ করেন, এ ক্ষেত্রে আমার বিবেচনায় শেখ হাসিনা মানসিকভাবে একজন অতি শক্তিশালী মানুষ ও সর্ব বিশ্বে একজন সাহসী ও সৎ রাষ্ট্রনায়ক। এখন পর্যন্ত একজন দক্ষ নেত্রী। দলের ভেতর মাঝে মাঝেই কিছু উদ্ভট পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বটে আর সেটার জন্যে আমার যুক্তিতে এই হাইব্রিড নেতারাই দায়ী।

এখানে আমার কিছু ভুল থাকলে, বিজ্ঞ পাঠক সমাজ আশা করি হয়তো আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা বাঙালিরা আস্তেআস্তে বুঝতে পারছিলাম বিগত সরকার আমলেই আমাদের দেশের ইতিহাস বিকৃতিকরণ থেকে শুরু করে সংবিধানে কাটাছেড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়ে গেছে। মুন সিনেমা হলের জায়গা সংক্রান্ত আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছিল জিয়াউর রহমানের শাসন আমলটাই ছিল অবৈধ। ক্ষতি যেটা হবার তো হয়েই গিয়েছিল। সৈরাশাসক জিয়ার আমলেই বঙ্গবন্ধু বিচার কার্য স্থগিতাদেশ দিয়ে তাদের ঘৃণ্য কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গদের যথা: জামাত ও গোলাম আজম, নিজামী, মুজাহেদীদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা ও দালাল আইনকে বাতিল ঘোষণা করে জেলে সকল বন্দী রাজাকারদের রাজনৈতিক মুক্তি প্রদান সহ ১৯৭২ এর সংবিধানে কাটাছেড়া করা, এরকম অনেক কুকর্মের জ্বলন্ত উদহারণ হিসাবে বিএনপি শাসন আমলের কথা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে বাংলাদেশ যতদিন থাকবে। এ সব কিছু করার পর এরশাদ সরকার আমলটাও কম দায় বহন করে না। এরশাদের আমলে সব চাইতে বড় ভুল যেটা হয়েছিল সেটা হচ্ছে সংবিধানে একটা রাষ্ট্র ধর্ম সংযোজনা করা। ৯০'র আন্দোলন যদি কোন কারণে বৃথা যেত তবে আমাদের দুর্গতির সীমা থাকতো না।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে আমার লেখার উদ্দেশ্য হাইব্রিড তেনারা কে কোথায় ছিলেন? এখন আসা যাক মূল বক্তব্যে: এই সব সুযোগ সন্ধানীরা রাজনীতির মাঠে সর্বদাই তৎপর ছিল শুধু আমাদের চোখের অন্তরালে। আমি একটু আপনাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি: তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে এইসব হাইব্রিডদের তৎপরতা ছিল সব চাইতে বেশী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলেই তাদের চেহারা দেখা গিয়েছিল সব চাইতে বেশী। পরবর্তীতে এরা বিভিন্ন দলে চোরা গুপ্ত হামলা চালাতে থাকে। এমনকি অনেকেই সরকারী দলেও জায়গা করে নেয়। এ সব কিছুই হতে থাকে আমাদের চোখের অন্তরালে। আমরা তাদেরকে অতি সুশীল আখ্যায়িত করে থাকি মাঝে মাঝে আর তাদের মিষ্টি কথায় টকঝাল শো গুলিতে তাদের বুলি শুনে এক্কেবারে গলে পড়ি। যাইহোক, অন্তরে এক স্বপ্ন আর বাহিরে আরেক স্বপ্ন দেখিয়ে এইসব অনেক ধান্দাবাজ অনেকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ছত্রছায়াতে চলে আসে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনিয়ে হঠাত করেই একদিন দাবি করে বসে এই কাদের সেই কাদের না। আপনাদের মনে পড়ে কি সংসদ গোলাম মওলা রনির বক্তব্য??

প্রবাসেও এ রকম অনেক সুযোগ সন্ধানী ধান্দাবাজরা বাংলাদেশকে একটা লুটপাটের জায়গা ধরে নিয়ে দেশের মন্ত্রী ও সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। আর সেই কারণেই অনেক মন্ত্রী সৎ থাকার চেষ্টা করেও এই সব ধান্দাবাজদের কারণে সৎ থাকতে পারেন নাই। এর উদহারণ সরূপ বলা যায় বিভিন্ন ভাবে ফেইসবুক অথবা অনন্য সামাজিক ওয়েব সাইট গুলোতে সাধারণ প্রবাসীদের সাথে অমুক দলের তমুক, তমুকের সাথে অমুকের ছবিতে ভরে যেতে থাকে। এইসব হাইব্রিড প্রবাসী নেতা নামধারীদের সহযোগিতায় দেশের সম্পদ বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাচার হতে থাকে। এখন আপনারাই বলুন, এইসব ক্ষেত্রে একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে একা এত সব দুর্নীতি সামাল দেয়া কতটুকু সম্ভব? দেখতেই তো পারছেন কতগুলো সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট!

আমার প্রশ্ন, আমি বা আপনি যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকতাম তা হলে এই সব কিছু একা সামাল দিতে পারতাম? কাজেই একজন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজে মুখেই বলছেন "আমি ছাড়া সব্বাইকে টাকা দিয়ে কেনা যায়" এর চাইতে পরিষ্কার করে বলার আর কী'ই বা থাকতে পারে?

দুইটি বীজের সংমিশ্রণে যে জেনেটিক পরিবর্তিত একটি নতুন বীজকেই হাইব্রিড বলা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সুযোগ সন্ধানী নেতাদের আমি হাইব্রিড নেতা বলেই উল্লেখ্য করলাম। এইসব লোকেরা সারাজীবনই সরকারী দল করে থাকে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সর্বপরি এ বাংলা থেকে এইসব হাইব্রিড নেতাদেরকে যে কোন মূল্যেই হোক উচ্ছেদ করতেই হবে। বাঙালি জাতির সর্বকালের স্লোগান জয় বাংলা বলেই আজকে শেষ করছি। সকলে ভাল থাকুন, ধন্যবাদ।।

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সদস্য সচিব আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ

পাঠকের মন্তব্য