স্বেচ্ছাসেবকদের মানবিক কর্মকাণ্ডে স্বাস্থ্য সতর্কতা জরুরী 

স্বেচ্ছাসেবকদের মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বাস্থ্য সতর্কতা জরুরী   

স্বেচ্ছাসেবকদের মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বাস্থ্য সতর্কতা জরুরী   

বাংলাদেশে করোনা ঠেকাতে এখন কার্যত লকডাউন চলছে। আর এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপাকে আছেন শ্রমজীবী ও গরীব মানুষ। আবার দোকান-পাট বন্ধ থাকায় সামর্থ্য থাকার পরও অনেকে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারছেন না।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বেচ্ছাসেবকেরা এগিয়ে আসছেন। পুলিশ এবং প্রশাসনও তাদের সাধ্যমত সহায়তার চেষ্টা করছে। এমনকি চিকিৎসক ও চিকিৎসা কাজে জড়িতদের বিনামূল্যে পিপিই সরবরাহ করা হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। এইসব উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও সমন্বয়ের অভাবে পর্যাপ্ত মাত্রায় সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন আছে স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়েও। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য তানবীর হাসান সৈকত ৫০ জনকে চাল ডালের প্যাকেট বিতরণের মাধ্যমে এই কাজ শুরু করেন ২৬ মার্চ থেকে। ওই দিন থেকেই সাধারণ ছুটি শুরু হয়। আর সবাইকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। এখন তানবীর তার কয়েকজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে রান্না করা খাবারও বিতরণ করছেন। দুপুরের দিকে তারা চাল, আলু আর ডালের প্যাকেট বিতরণ করেন। আর রাতে রান্না করা খাবার হিসেবে বিতরণ করেন খিচুড়ি। তানবীর জানান,‘ শুরুতে নিজেদের টাকায় করলেও এখন অনেকেই সহায়তা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র নেতা, সাবেক ছাত্রসহ সাধারণ মানুষ এই কাজে অর্থ সহায়তা করছে।'

তারা লোকজনকে জড়ো না করে যার যার অবন্থানে গিয়ে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। যতদিন প্রয়োজন ততদিন তারা এই কাজ চালিয়ে যাবেন। তানবীর জানান,‘ এটা একটা বিশেষ পরিস্থিতি তাই। আমরা স্বাস্থ্য সচেতনতা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছি। পিপিই ব্যবহার করছি।' 

করোনা সংকট মোকাবিলায় সহায়তার জন্য বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিজেদের বেতনের অর্ধেক অনুদান হিসেবে দেবেন। একটা তহবিল গঠন করা হয়েছে। সেই তহবিলে ইতিমধ্যে ৩০ লাখ ১৫ হাজার টাকা জমা হয়েছে।

এরকম আরো শত শত উদ্যোগ এখন চোখে পড়ছে সারাদেশে। এমনকি সাধারণ মানুষ যে যার সামর্থ অনুযায়ী চাল, ডাল, আলু ও সাবানের প্যাকেট তৈরি করে বিতরণ করছেন। কেউ কেউ সকালের নাস্তা দিচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে করোনায় যে নীতি মানা দরকার সেটা সবখানে মানা হচ্ছে না। এমনকি খাদ্য সামগ্রী বিতরণে প্রচণ্ড ভিড় এবং হৈ হুল্লোড়ের ছবি এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ(সিএমপি) চালু করেছে ‘ডোর টু ডোর শপ'। রাস্তায় যানবাহন না থাকা এবং বাইরে যেতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রয়োজনীয় খবার ও সামগ্রী কিনতে পারছেন না। তাই পুলিশের হটলাইনে ফোন করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পরিমানের কথা জানালে পুলিশ তা কিনে পৌঁছে দেয়। তারা ক্রয় রসিদ নিয়ে যায় তা দেখে গৃহস্থ দাম পরিশোধ করেন। তবে দরিদ্র কেউ হলে তাদের ফ্রি দেয় হয় বলে জানান সিএমপি কমিশনার মাহবুবুর রাহমান। তিনি জানান,‘ চার দিন আগে আমরা এই সার্ভিস দেয়া শুরু করেছি। যতদিন প্রয়োজন দেবে। হাসপাতালে যাওয়াসহ জরুরি প্রয়োজনে আমরা গাড়ি সহায়তা দিচ্ছি। সিএমপিতে ১৬ টি থানা। প্রতিটি থানার ওসি এটা সমন্বয় করছেন। প্রত্যেক থানা এলকায় গড়ে প্রতিদিন আমরা ১০-১৫ টি কল পাচ্ছি। আমরা ওষুধও কিনে দিচ্ছি। করেনা ভাইরাস নিয়ে যতদিন সতর্কতা থাকব আমরা এই সেবা চালিয়ে যাবো।'

দেশের আরো অনেক থানা, জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই ধরনের সহায়তার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি দরিদ্র মানুষের ফোন কল পেয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে হাজির হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ডিসি ও এসপিদের সাধারণ মানুষকে সাধ্যমত সহায়তার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, গ্লোভস- এসব ব্যক্তিগত এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অনেক আগে খেকেই বিতরণ শুরু করেছে। এরসঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে চিকিৎসকদের জন্য ফ্রি পিপিই বিতরণ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও পে ইট ফরওয়ার্ড বাংলাদেশ যৌথভাবে ৩০ হাজার পিপিই তৈরির কাজ শুরু করেছে। আর তাদের সহায়তা করছে বিজিএমইসহ আরো কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান।

পে ইট ফরওয়ার্ড বাংলাদেশ-এর নির্বাহী সভাপতি, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান জানান,‘ আমরা এরইমধ্যে পিপিই বিতরণ শুরু করেছি। সরকারে ভান্ডারে রবিবার আমরা ২৮০ টি পিপিই দিয়েছি। চট্টগ্রামে পাঠিয়েছি ছয়শ'র বেশি। আজকেও( সোমবার) কয়েকটি হাসপাতালে পাঠাবো। আমরা আশা করছি ৩০ হাজার পিস বিতরণ করতে পারব।' 

তবে এইসব মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু। তিনি বলেন,‘ খাদ্য বিতরণের ক্ষেত্রে প্রায়ই সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্য নীতি মানা হচ্ছে না। এখন বাংলাদেশে করোনার ফোর্থ স্টেজ চলছে। ফলে মূল উদ্দেশ্যই ব্যহত হতে পারে। করোনা আরো ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর যেসব মাস্ক এবং স্যানিটাইজার বিতরণ করা হচেছ তার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। তাই আমার পরামর্শ হলো নিয়ম নীতি জেনে এসব কাজ করা দরকার। একটি পয়েন্ট থেকে করা দরকার। শাহবাগ মোড়ে টিভি ক্যামেরা ডেকে জনসেবার সময় এটা নয়।'

বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ,‘ একইসঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলেন। কার প্রয়োজন আর কার প্রয়োজন নয় সেটা জানতে হবে। এজন্য সরকারের একটি কেন্দ্রীয় নীতিমালা থাকা দরকার। ব্যক্তিগত ও সামাজিক এইসব উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা যাবেনা। কিন্তু এটাও জানতে হবে যে এটা বন্যার ত্রাণ বিতরণ নয়। আমাদের আগে মনে রাখতে হবে যে আমাদের কোনো উদ্যোগ যেন করোনা ছাড়াতে সহায়ক না হয়।'

পাঠকের মন্তব্য