শিশুতোষ গল্প : 'ভূত নয় অদ্ভুত' 

শিশুতোষ গল্প : 'ভূত নয় অদ্ভুত' 

শিশুতোষ গল্প : 'ভূত নয় অদ্ভুত' 

তৌহিদ-উল ইসলাম : শ্রাবণের রাত। অবিরাম বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে বুনো হাওয়া রাতের আঁধারকে আরও ঘন করে তুলেছে। ফলে প্রকৃতির বুকে জায়গা করে নিয়েছে একটা ভূতুড়ে পরিবেশ। ঠিক এমনই পরিবেশে ভূতের গল্প লেখেন ভূদেব বাবু। ক্রমে রাত আরও গভীর হয়ে এলো। এবার বিছানা ছেড়ে চার্জার লাইট আর ডাইরিটা নিয়ে বাইরের বারান্দায় তিনি বসে পড়লেন। 

ভূদেব বাবু জানেন ভূত বলে কিছু নেই, তবু ভূতের গল্প লেখেন। ভূত আসতে না চাইলেও নানা ভাবে ভূতকে টানিয়ে আনেন তার গল্পে। এক সময় ভূত সুরসুর করে চলে আসে তার লেখায়। চেয়ারটায় হেলান দিয়ে ভূতের ভাবনায় যখন ভূদেব বাবু নিমগ্ন; ঠিক সে মুহূর্তে একটা দমকা হাওয়া এসে টেবিল থেকে চার্জার লাইটটা ফেলে দেয়। আর সেটা মেঝেতে পরে সাথে সাথেই ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। এমন সময় বারান্দার লোহার গরাদে একটা জোড়ে শব্দ হলো। সেদিকে তাকালেন ভূদেব বাবু। একটা সাত আট বছরের ছেলে লোহার গরাদে মাথা ঢুকে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছে। উলঙ্গ দেহ, সারা শরীর তার বৃষ্টিতে ভেজা। ভূদেব বাবু একটুখানি ভয় পেয়ে যান। ভয়ার্ত কণ্ঠেই তিনি প্রশ্ন করেন, কে? কে ওখানে?
ছেলেটা অনায়াসে উত্তর দেয়, আমি! আমি মানে, আপনার গল্প আমি। 
কথা শুনে ভূদেব বাবুর ভয় আরও একটু বেড়ে গেল। তবু বুকে সাহস নিয়ে বলে ওঠেন, আমার গল্প মানে? আসলে কে তুমি? এখানে কী চাও?
আমি কিছু চাই না, বরং আমি দিতে এসেছি।
দিতে এসেছো মানে? কী দেবে তুমি?

ছেলেটা ইতোমধ্যে লোহার গরাদের ভেতর মাথা ঢুকে ফেলেছে, কিন্তু পুরো দেহটা আটকে আছে বাইরে। এবার সে স্থির হয়ে বলে ওঠলো, বললাম তো গল্প দেব আপনাকে। এবার ভয় না পেয়ে মন দিয়ে আমার কথা শুনুন। আপনি তো আমাদের মতো ছোট ছেলেদের জন্য লেখেন। কিন্তু ছোটদের কথা না শুনলে কীভাবে লিখবেন বলুন তো! আমি আসলে ভূত না, জীবন্ত মানুষ। নিজে লেখতে পাই না, তাই সম্পাদক মশাইয়ের কাছে ঠিকানাটা নিয়ে আপনার কাছে ছুটে আসা। 

ভূদেব বাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তাকে থামিয়ে দিয়ে ছেলেটা আবার কথা শুরু করলো। আগে আমার কথা শুনুন! মনে করুন তো আজ থেকে সাত বছর আগে বেইলি রোডের বুড়িগঙ্গা সেতুর কাছে এক মা তার সদ্য ভূমিষ্ট শিশুকে ফেলে উধাও হয়ে যান। তারপর এক পথিক তাকে কুঁড়িয়ে পেয়ে তার বাড়িতে নিয়ে যান। শিশুটার ছবিসহ খবরটা বের হয় দৈনিক সবুজপত্রে। 
এবার ভূদেব বাবু বলে ওঠেন, হাঁ হাঁ মনে পড়েছে। আমি তো সেবার ঐ ঘটনাটা নিয়ে একটা গল্প লিখেছি। 
গল্পের নামটা কী ছিল? জানেন কি?
কী যেন! ঠিক মনে পড়ছে না!
শিশুর আবার জাত কী
হাঁ হাঁ, অনেকটা শরৎ বাবুর থেকে ধার করা। কিন্তু এ সব তুমি জানলে কী করে?

শুধু জানি তা নয়, কাগজ দুটো সাথে করেও নিয়ে এসেছি। এই বলে ছেলেটা পেছন থেকে কাগজ দুটো নিয়ে লোহার গরাদের ভেতর দিয়ে ভূদেব বাবুর দিকে ছুঁড়ে দিল। ভূদেব বাবু সেগুলো তুলতে গেলে ছেলেটা বাধা দিয়ে বললো, ওটা আলোতে পড়বেন, এখন থাক! আমার কথা শেষ হয় নি, আপনি বরং আমার পরের কথাগুলো শুনুন। 

আচ্ছা, তাই বলো।
এ ঘটনার দিন সাতেক পরে বুড়িগঙ্গার বুকে এক অজ্ঞাত মহিলার পঁচা লাশ ভেসে ওঠে। কেউ কেউ তখন মন্তব্য করেন, এ সন্তানটি হয়তো ঐ মহিলার-ই ছিল। যা হোক, শিশুটা যখন পথিকের বাড়িতে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে, যখন সে বুঝতে শেখে, তখন তার মনে অসংখ্য প্রশ্ন জেগে ওঠে। কে তার মা, কে তার বাবা, আর কেন-ই বা তাকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্য শিশুরা যখন তার জন্ম নিয়ে খোঁটা দেয়, তখন সে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং সুন্দর সমাজটাকে ঘৃণা করতে থাকে। কেননা অন্য শিশুরা বুঝতে চায় না, শিশুর আবার জাত কি। তবে শিশুটার একটা জাত ছিল, আপনি তা লজ্জায় বলেননি। 

জাত ছিল মানে? তুমি জাতের অর্থ বোঝ? 
বুঝি, সে ছিল বাঙালি জাতের। আপনি চিনেও তা গোপন করেছেন। যাক সে কথা, ছেলেটা তার পথিক বাবার নিকট থেকে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি সবুজপত্রের একটা সংখ্যা হাতে দেন। তারপর সে শেকড়ের খোঁজে বেড়িয়ে পড়ে। আজও ফিরে আসেনি। 
কোথায় গেছে?

শেকড়ের খোঁজে ! যেখানে তার যাওয়া উচিত, হয়তো সেখানেই গেছে। তবে সম্পাদক মশাই বলেছেন, আপনিও ওকে শেকড়ের কিছুটা খোঁজ দিতে পারেন। ও শেকড়ের খোঁজ চায়, পথশিশু নাম চায় না। এবার আপনি লিখে ফেলুন। আর আমার মাথাটা একটু জোড়ে ঠেলে দিন, লোহার গরাদে আটকে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

জোড়ে ঠেলতে গিয়ে খাট থেকে পড়ে ঘুম ভেঙে গেল ভূদেব বাবুর। ওঠে দাড়াতে বেশ কষ্ট হলো তার। ঘরে আলো জ্বালালেন। তারপর ঘর থেকে বের হয়ে সোজা চলে এলেন বারান্দায়। সকালের কোলাহলে পাখিরা তখন ব্যস্ত। লোহার গরাদ থেকে একটা দোয়েল শিস দিতে দিতে চলে গেল। বারান্দায় পড়ে থাকা এলোমেলো কতগুলো কাগজ চোখে পড়লো ভূদেব বাবুর। হাতে নিলেন। সবুজপত্রের পুরাতন সংখ্যা। ১৪১৭ সালের  আষাঢ়ের আট, আবার কোনটাতে আষাঢ়ের একুশ। যা স্বপ্নে দেখেছেন বাস্তবে তাই। স্বপ্ন যখন বাস্তবের বারান্দায় এসে দাড়ায়, তখন আর স্বপ্ন থাকে না। সবুজপত্র হাতে নিয়ে ভূদেব বাবু পাতা উল্টাতে থাকেন। সাতের পৃষ্ঠার আট কলামে চোখে পড়ে সেই শিশুটার একটা ছবি। ব্যবসায়ী জলিল মিয়ার কুঁড়িয়ে পাওয়া শিশু। ব্যাপারটা ভূত নয়, তবে অদ্ভুত লাগছে তার কাছে। আচ্ছা সম্পাদক মশাইকে একবার ফোন দিলে কেমন হয়! তবে এতো সকাল সকাল কাজটা মনে হয় ঠিক হবে না। 
এমন সময় ভূদেব বাবুর স্ত্রী কল্যাণী দেবী বারান্দায় এলেন এবং ভূদেব বাবুর হাতে কাগজগুলো দেখে বললেন, বিকেলে একটা ছোট্ট ছেলে কাগজগুলো দিয়ে গেছে। তোমাকে বলবো, তা আর মনে নেই। 

ভূদেব বাবু এবার ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা ছেলেটা কে, তা জিজ্ঞেস করোনি?
আরে নাগো, কাগজগুগুলা ছুঁড়ে দিয়ে বললো, ও নাকি রাতে এসে তোমার সাথে দেখা করে যাবে।
আর, আর কিছু বলেনি?

হ্যা বলেছে, এ বছর নাকি সাহিত্যে তুমি নোবেল পাচ্ছ, সেখবরটাও দিয়ে গেছে। যত্তোসব পুলিশের মতো জেরা করতে শিখেছো। বললাম তো রাতে এসে দেখা করার কথা বলেছিলো। তা আর কানে যাবে কেন। সকাল সকাল ঝগড়া ছাড়া আর কি!
কল্যাণী দেবী কথাগুলো বলতে বলতে বাড়ির ওঠানের দিকে চলে গেলেন। 
এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে মুঠোফোনটা বেজে ওঠলো। ভূদেব বাবু ঘরে এলেন। ফোনটা হাতে নিয়ে বললেন, আরে সবুজপত্রের সম্পাদক। হ্যালো! নমস্কার চৌধুরী মশাই! নমস্কার!

হ্যা দাদা নমস্কার! সকাল সকাল একটা ভালো খবর দেই। 
একটা ভালো খবর তো এখনই গিন্নির কাছ থেকে পেলাম। 
কথাটা স্ত্রী শোনে কিনা এই ভয়ে ভূদেব বাবু ফোন হাতে বারান্দায় চলে এলেন। এবার সম্পাদক মশাই বললেন, তাহলে সেটাই আগে শুনি, কেমন!
হাঁ শোনেন, তবে তা যেন আবার কাগজে ছাপিয়ে না-ফেলেন। খবরটা হলো, এ বছর আমি নাকি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছি।  
ভূদেব বাবুর কথা শুনে হাসি যেন থামতেই চায় না সম্পাদক মশাইয়ের। হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই জবাব দেন, বৌদি যখন বলেছেন, তখন তা সত্যি হতে কতক্ষণ। 

হাঁ আপনার বৌদির ভায়েরা তো সুইডিস একাডেমির বড় বড় কর্তা। থাক, এবার আপনারটা বলুন?
না বৌদি মন্দ বলেননি, আজকাল আপনার ভক্তের সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে, পত্রিকা অফিসে এসেও আপনার লেখার খোঁজখবর নিচ্ছে।
আরে কী যে বলেন, লেখা না ছাই।
তা হবে কেন, আজও পাঠকের অনুরোধে আপনার একটা গল্পের পুনঃমুদ্রণ করে দিলাম। 
কেন? গল্পের আকাল পড়েছে নাকি?
আরে বললাম তো পাঠকের অনুরোধ, কাল সাত-আট বছরের একটা ছেলে এসে আপনার ‘শিশুর আবার জাত কি’ গল্পটা ছাপাতে অনুরোধ করলো। তাই ছেপে দিলাম আর কি। তবে ভক্ত কিন্তু আপনার দেখা করবে বলে আমার কাছ থেকে ঠিকানাও নিয়েছে। 
আপনার সব কথা তো বুঝতে পাচ্ছি না মশাই, কারণ আজকাল মাথাটাও ঠিকঠাক কাজ করছে না। 
কেন, অসুখ করছে নাকি? তাহলে সন্ধ্যায় পত্রিকা অফিসে চলে আসুন। আমার এক বন্ধু, নামকরা ডাক্টার, কদিন হলো বিদেশ থেকে ফিরেছে, সন্ধ্যে এখানে আসবে, আপনিও  চলে আসুন।
আচ্ছা আসবো। রাখি মশাই, নমস্কার।

ফোনটা রেখে দিলেন ভূদেব বাবু। এবার ভাবতে লাগলো, কে এই ছেলেটা? কী চায় সে আমার কাছে, না! সে তো চাইতে আসেনি। সে নাকি দিতে এসেছে। এমনই করে সাত-পাঁচটা ভেবে সন্ধ্যে হয়ে এলো। এবার সরাসরি সবুজপত্র অফিসে গিয়ে হাজির হলেন ভূদেব বাবু। সম্পাদক মশাইয়ের কাছে সব ঘটনার বর্ণনা দিলেন। সব শুনে তার কাছেও ব্যাপারটা ভূত মনে না হলেও অদ্ভুত বলে মনে হলো। 

এরপর দুজনেই রওয়ানা হলেন বুড়িগঙ্গার পারে ব্যবসায়ী জলিল মিয়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে। জলিল মিয়া বাড়িতেই ছিলেন। তিনি ভূদেব বাবু ও সম্পাদক মশাইকে বেশ সমাদর করলেন। সবশেষে তাদের ফেরার পথে একটা ছোট্ট কবর দেখিয়ে দিয়ে জলিল মিয়া বললেন, দিন-সাতেক আগে ছেলেটা বুড়িগঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে মরে গেছে। 
 
 

-তৌহিদ-উল ইসলাম 
সহ: শিক্ষক (বাংলা)
লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
গীতিকার, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন।
touhidkurigram@gmail.com 

পাঠকের মন্তব্য