চিকিৎসার অভাবে মারা গেলো আমার বাবা : মর্মস্পর্শী স্ট্যাটাস 

চিকিৎসার অভাবে মারা গেলো আমার বাবা : সন্তানের মর্মস্পর্শী স্ট্যাটাস 

চিকিৎসার অভাবে মারা গেলো আমার বাবা : সন্তানের মর্মস্পর্শী স্ট্যাটাস 

গত ১৮-২-২০২০ তারিখে আমার বাবার পায়ের সেলুলাইটিসের সার্জারী হয়। অধ্যাপক ড. তাপস কুমার মৈত্রের আন্ডারে সার্জারী হয়। বাসায় নিয়মিত ড্রেসিং করার করার পরামর্শে বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসি। এর মাঝে কয়েক দফা হাসপাতালে নিয়ে যাই। প্রতিবারই তারা যায় অবস্থা উন্নতির দিকে। সর্বশেষ ২৮-৩-২০২০ থেকে আমার আব্বার পা থেকে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হতে থাকে। এলাকায় অনেক ডাক্তারের সাহায্য নিয়েও রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারি নি। দেশে তখন লকডাউন অবস্থা। আমি ২৯-৩-২০২০ তারিখে বারডেম সার্জারী ইমারজেন্সি ইউনিটে যোগাযোগ করি। এই সময় তারা বলেন বাবাকে নিয়ে আসতে বলে। তাদের কথামত ৩০-৩-২০২০ এ এ্যাম্বুল্যান্সে করে বাবাকে বারডেমে নিয়ে যাই।

রোগী নিয়ে ইমারজেন্সিতে প্রবেশ করতে গেলে তারা বাধা দেয়। আমাদের আজকে আসার কথা ছিলো, সেই মোতাবেক কাগজপত্র দেখালে তারা ভিতরে ঢুকতে দেয়। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে দেখতে না করে দেয়। বলে তাদের এনেস্থিসিয়ার ডাক্তার ছুটিতে এবং আমাদের ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। ঢাকা মেডিকেলের একজন ডাক্তারের সাথে ফোনে কথা বললে তিনি জানান,যেহেতু বারডেমে সার্জারী হইছে,সেখানেই সেলাই দিতে, ঢাকা মেডিকেলে আসলে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা আরো কমে যাবে। পরে অবশ্য বারডেম থেকেই বাসায় আসার পরামর্শ দেয়া হয়।

তাদের অনেক বার বলি যে আমার বাবার পা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তা ছাড়া আজকে আমাদের আসার ডেট ছিলো। তারা জানায় সব ডাক্তার ছুটিতে। তাদের কিছু করার নেই। বাড়ি চলে যেতে। আমরা তখন বলি, আমরা হসপিটালে ভর্তি থাকবো যতদিন লাগে। কিন্তু এই অবস্থায় বাড়ি ফিরে যাবো না। তাও তাদের মন গললো না।
 
সর্বশেষ আমার কাকা ডা. তাপস কুমারের পারসোনাল নাম্বারে ফোন দিয়ে সাহায্য চান। তিনি যখন আমার সাথে কথা বলেন তখন প্রচন্ড রকমের খারাপ ব্যাবহার করেন। তিনি বলেন, আপনাদের কি কোন কমনসেন্স নাই..? কেনো আপনারা এই সময় চাঁদপুর থেকে ঢাকা এসেছেন?? আমি বলি আমার বাবার অবস্থা প্রচন্ড খারাপ, আজকে আমাদের শিডিউল ডেট দেখা করার। তিনি তখন আরো রেগে যান এবং বলেন,প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যান, এই রোগে মানুষ মরে না। মানুষ মরে করোনায়। করোনার ঝুঁকি নিয়ে এখন সার্জারী করা সম্ভব না। তিনি তখন ওখানের ডাক্তারকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিতে বলেন। তাকে যাতে আর কখনো পারসোনাল নাম্বারে ফোন দিতে না করেন।

আমার আব্বা রক্তক্ষরণ দেখে প্রচন্ড ভয় পেতেন। এলাকার ডাক্তার বলেছিলো তার স্ট্রোকের ঝুকি আছে। এই সব কথাও আমি ডাক্তারকে জানাই। তারা হাসপাতালে ভর্তি নিতে রাজি হয় না। প্রাথমিক ডেসিং করে এবং কিছু ওষুধ লিখে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। তারা জানায় তারা রক্তক্ষরণ বন্ধ করে দিয়েছেন। স্ট্রোকের ঝুকিও নাকি একেবারে নেই।

বাড়ি আসার পর সন্ধ্যায় আবার রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরের দিন ভোর ৫ টায় আমার বাবা স্থানীয় হাসপাতালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং স্ট্রোক জনিত কারনে মারা যান।

বারবার ডা. তাপস কুমারের সেই কথা গুলো মনে পড়ছিলো, যে এই সমস্যায় নাকি মানুষ মরে না। মানুষ নাকি শুধু করোনায় মারা যায়।তার ১ দিন পরেই আমার বাবা মারা গিয়েছিলো। তাকে কেনো তার পারসোনাল নাম্বারে ফোন দিয়েছিলাম তার জন্য অনেক বাজে ব্যাবহার করেছিলেন। বার বার হাতে পায়ে ধরার পরেও আমাদের ভর্তি রাখতে রাজি হন নি। বলেছিলেন কোন স্ট্রোকের ঝুকি নেই, এই রক্তক্ষরণ নাকি স্বাভাবিক। তাহলে আমার বাবা কেনো মারা গেলো???

আমি জানি এর কোন বিচার নেই কারন ডাক্তার রা ভগবান। ভেবেছিলাম কাউকে জানাবো না। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজকে ভাষনে বলেছেন, যে চিকিৎসকের অবহেলায় রোগী মারা যাবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা নেয়া হবে। তাই এই পোস্ট লেখা। হয়তো শেয়ার হতে হতে একদিন এই পোস্ট প্রধানমন্ত্রী বা কতৃপক্ষের নজরে আসবে। সেই ডাক্তার হয়তো তার ভুল স্বীকার করে নেবেন।হয়তো কোন রোগী আর অবহেলায় মারা যাবে না।

দয়া করে কেউ চুপ করে থাকবেন না। আওয়াজ তুলুন। চিকিৎসা আমাদের মৌলিক চাহিদা। আর কেউ যাতে আমার মতো এতিম না হয়ে যায়।

বিদ্রঃ পুরো লেখাটি অনেক সংক্ষেপে লিখা। আব্বু ৪০ দিনের মতো অসুস্থ ছিলেন। ২২ দিন সরাসরি হসপিটালে ভর্তি ছিলেন। এই সময় আমরা ছিলাম পাগলের মতো। আমার আম্মা সারারাত জেগে থাকতেন আব্বার পাশে। এই হাসপাতালে প্রায় ৩ লক্ষ টাকার মতো খরচ করেছি। অথচ শেষে কিনা তারা আমাদের ঢাকা মেডিকেলে পাঠায়...!! ভিতরে ঢুকতে না করে...!! জানতে চাই, দেশের কোন আইনে লেখা আছে, ডাক্তারকে তার পারসোনাল নাম্বারে রোগী ফোন দিতে পারবে না...??

আমি সব ডাক্তারকে দোষারোপ করছি না। এই অসুস্থতার সময়ে আমার বাবা অনেক ডাক্তারের সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিংক : Montasir A Rimon

পাঠকের মন্তব্য