স্বেচ্ছায় লকডাউন (শিশুতোষ গল্প) : তৌহিদ-উল ইসলাম

স্বেচ্ছায় লকডাউন (শিশুতোষ গল্প) : তৌহিদ-উল ইসলাম

স্বেচ্ছায় লকডাউন (শিশুতোষ গল্প) : তৌহিদ-উল ইসলাম

স্বেচ্ছায় লকডাউন
(শিশুতোষ গল্প)

তৌহিদ-উল ইসলাম : শুধুই কি স্কুল বন্ধ, খেলাধুলাও বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সাথে বন্ধ হয়েছে বাইরে ছোটাছুটি। এখন তাই একা একা দিন কাটে মন্তুর। এ ঘর ও ঘর, বাড়ির পেছনের লিচুবাগান, বড়জোড় বাগান পেরিয়ে পুকুরপাড় পর্যন্ত তার আসা-যাওয়া। এর বাইরে যাবার আদেশ নেই। বাবার মতে, পুকুরপাড়ে যাবার বিষয়টাকোন মতেই জরুরি প্রয়োজনের মধ্যে পরে না। তবে পুকুরপাড় পর্যন্ত না গেলে মন্তুর ছবি তোলার কাজটা ব্যাহত হয়। তাই বাবাকে সে নানা অজুহাতে বোঝাতে সক্ষমহয়েছে পুকুরপাড়ে যাবার ব্যাপারটা জরুরি প্রয়োজনের একটা অংশ। ইদানিং বাইরে লোক সমাগম কমে আসায় পুকুরপাড়ে পাখিদের আনাগোনাও বেড়ে গেছে। ভাতশালিক, দোয়েল, ঘুঘু ও মাছরাঙাদের আড্ডা চলে সারাদিন। আরও কিছু প্রজাতির পাখি আছে, যেগুলোর নাম জানে না মন্তু। কোকিলের গান, দোয়েলের শিস, হলদে পাখির ডাক রেকর্ড করেসে মুঠোফানে। সে যখন বাবার মুঠোফোন হাতে নিয়ে পুকুরপাড়ে অবস্থান নেয়, তখন তার ওপর মা নজর রাখে এবং ঘরে ফেরার পর সাবানে হাত ধোয়ার বিষয়টা নিশ্চিত করে। 

ইদানিং কার্টুন ছবি দেখার ঝোক বাড়লেও বাবার সাথে খবর শোনার প্রতি তার আগ্রহ কিছুটা বেড়ে গেছে। ফলে বৈশি^ক মহামারি করোনা সম্পর্কে তার ধারণা অনেক। মা বলেছে, করোনার পা নেই পাখাও নেই, কেবল মানুষের মাধ্যমেই ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশ^ময়। মন্তুর মনে প্রশ্ন জাগে যদি তাই হয়, তাহলে পুকুরপাড় থেকে এসে সাবানে হাত ধুতে হবে কেন? পুকুরপাড়ে গিয়ে সে তো মানুষের ছবি তোলেনি, আবার কোন মানুষের সাথে দেখাও করেনি। মন্তুর এমন কথার জবাব দিতে পায় না ওর মা। বলে কি-না ওটা ডাক্তারদের হুকুম। 

মন্তু বাবাকে জিজ্ঞেস করে, আর কতদিন পরে সে বন্ধুদের সাথে খেলতে পাবে, স্কুলে যেতে পাবে। কবে থেকে ছবি আঁকার সন্তোষ স্যার আবার বাড়িতে আসবে। বাবা বলে, হয়তো কিছুদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। 
মাকে জিজ্ঞেস করে, করোনা কেন আসে? মাতখন ওকে ধমক দেয়, ঘুমোতে বলে। মন্তু তখন চুপ করে শুয়ে থেকে একা একা ভাবতে থাকে। কেন আসে করোনা? কী দোষ পৃথিবীর?কী অপরাধ মানুষের?এ ভাবে মানুষ মেরে করোনার কী লাভ?আমরা করোনাকে দেখতে পাইনে কেন? কে দেবে তার এসব প্রশ্নের জবাব!ভাবতে ভাবতে এক সময় চিৎকার দিয়ে সে বলতে থাকে: কেউ কি শুনতে পাচ্ছ আমার কথা? জবাব দিচ্ছনা কেন?

হঠাৎ দরজায় একটা দমকা হাওয়া এসে ধাক্কা দিলো এবং কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো, খোকা তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে আমরা চলে এসেছি।
কে? কে তোমরা?
আমরা পবন। মানে বায়ুমন্ডল। পবন নামে তো তোমার এক বন্ধু আছে, তাই না!
তোমরা চেনো ওকে?
চিনি না মানে, এবার বৈশাখের দিনে ওর ঘরের পাশের পুরাতন আম গাছ উপড়ে ফেলে দিয়েছি। তোমার বন্ধু বলে তো ঘরের ওপর গাছটা ফেলে দেইনি। 
তাহলে তোমরাও আমার বন্ধু!
হ্যা তা বলতে পারো! তবে শোনো, আমাদের হাতে খুব একটা সময় নেই। জানো তো বোশেখ মাসে আমাদের খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই দ্রুত বলছি, তোমার প্রশ্নের জবাব এবার শুনে নাও!
বলো বন্ধুরা! শুনছি।
তুমি তো বিজ্ঞান জানো, বায়ুদূষণ কী তা জানো তো?
জানি না মানে, ওটা তো আমার পিইসি পরীক্ষায় এসেছিল।
তাহলে তো সবই জানো। আমরা বায়ুমন্ডল চাই কিছুদিন কলকারখানা, সব ধরনের গাড়ি চলাচল এমন কি মানুষের বাইরে চলাফেরা বন্ধ থাকুক যাতে করে আমরা দূষণমুক্ত হই। তোমরা পৃথিবীর মানুষেরা কোন নিয়ম না মেনে দিনের পর দিন আমাদের দূষণ করে চলেছো। আমাদের এখন দম বন্ধ হবার উপক্রম। আর আমরা দূষিত হলে তো তোমাদেরও ক্ষতি। তোমরা ভালো অক্সিজেন পাবে না। ভালোভাবে বাঁচতে পাবে না। গোটা প্রকৃতি তোমাদের জন্য বৈরি হয়ে যাবে। 

আমি তো ওসব শুনতে চাইনি। করোনা কেন এসেছে সেটা জানতে চাইছি।
সেটাই তো বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো! তোমরা পৃথিবীর মানুষেরা যখন যুগ যুগ ধরে নিয়ম না মেনে নানা ভাবে আমাদের দূষিত করে আসছো; ফলে উপায় না পেয়ে আমরা বায়ুমন্ডল করোনা নামক অণুজীবের আশ্রয় গ্রহণ করি। যাতে করে সমস্ত কলকারখানা, অফিস আদালত, মটরগাড়ি, উড়োজাহাজ, ইস্টিমার সব কিছু অচল রেখে পৃথিবীর সকল মানুষকে গৃহবন্দি করে রাখা যায়। এক কথায় তোমরা যে ভাবে পাখিদের খাঁচায় বন্দি করে রাখো। তাহলে অল্প দিনের মধ্যে আমরা দূষণ থেকে অনেকটা মুক্ত হতে পারবো। 

কিন্তু কতদিন আমরা এ ভাবে থাকবো?
সময় বেশি লাগছে তোমাদের কারণেই; কেননা তোমরা তো অনেকেই গৃহবন্দি থাকতে চাইছো না। কেউ কেউ আবার অকারণে রাস্তায় যানবাহন চালাচ্ছো, যেটা আমাদের একেবারেই পছন্দের নয়। তোমরা পৃথিবীসুদ্ধ মানুষ অন্তত কিছুদিন গৃহবন্দি থাকলে আমরা বহুলাংশেই দূষণমুক্ত হবো। তখন করোনা অণুজীবের কোন কাজ থাকবে না। পৃথিবী আমরা খুলে দেব। 
কিন্তু...

আর প্রশ্ন নয়! তুমি হয়তো বলবে, মানুষ সামাজিক জীব, সমাজবদ্ধ ও দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে মানুষ অভ্যস্ত। কিন্তু তোমরা ভুলে যাচ্ছ কেন চারপাশের প্রকৃতির কথা। তুমি তো নিজেও পাখিদের ভালোবাসো। এরা কি সমাজের অংশ নয়। আমরা দূষিত হলে কেউ রেহাই  পাবে না। সেজন্যই তো আজ তোমাদের সমাজচ্যুত করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্যাখো এই পৃথিবী তোমাদের। তোমরা ছোটরাই বেশিদিন থাকবে এখানে। তাই তোমাদের দায়িত্ব হবে বড়দের বোঝানো।তোমারা যাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হও, সেদিকটা আমরা খেয়াল রাখছি। তুমি তো বাবার সাথে খবর শোন! দেখছো তো ছোটরা খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। 
ঠিকই বলছো বন্ধুরা! 

এবার নতুন করে ভাবতে থাকে মন্তু। 

সকালবেলা কালবোশেখির দমকা হাওয়ায় নিমগাছের একটা ছোট্ট ডাল ঘরের টিনের চালার ওপর পরে যাবার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মন্তুর। আবার সে ভাবতে থাকে। কী করবে এখন সে। এবার বিছানা ছেড়ে বাবার মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে পবনকে ফোন দেয়। মুঠোফোন প্রথমেই তাকে করোনা সম্পর্কে সতর্ক করে। পবনের কাছ থেকে বোশেখের দিনের ঝড়ের খবর নিলো মন্তু। পবন জানালো, তার দাদুর লাগানো পুরাতন আমগাছটা উপড়ে ফেলেছে; তবে সেটা টিনের চালাঘরের ওপর পড়েনি। 

মন্তু এবার সোঁজা পড়ার টেবিলে গিয়ে ছবি আঁকার মোটা কাগজে লাল কালিতে বড় অক্ষরে দুটো শব্দ লিখলো: ‘স্বেচ্ছায় লকডাউন’।তারপর সেটাকে সুতো দিয়ে বেধে ঝুলিয়ে দিলো বাড়ির মূলগেটের সামনে। এবার বসে বসে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে স্থির করলো, পবনকে ব্যাপারটা জানানো দরকার। বাবার মুঠোফোনটা আবার হাতে নিলো। ফোন দিলো পবনকে। এবার মুঠোফোন তাকে জানিয়ে দিলো, ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেছে, তাই সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। 

পাঠকের মন্তব্য