কবিতা : নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী 

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী 
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

আমি কানে ধরা বুড়ো বাবাদের কাছে গিয়ে কানে ধরে ক্ষমা চাইবো।
যাবো নদীর কাছে, যাবো মাঠের কাছে ক্ষমা চাইতে
অশ্রুসিক্ত মাথানত করে, হাঁটু গেরে, হাতজোড় করে...

পায়ের নিচে যে শৈশব মাড়িয়ে এসেছি, সেই কৈশোরের কাছে যাবো
যে পাখির পায়ে সুঁতো বেঁধে ঘুড়ি বানিয়ে ছিলাম, পাখির কাছে যাবো
আজ আমি তাদের সবার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী।

যে বৃদ্ধ রিক্সাওলাকে তুই-তুয়াক্কি করে গায়ে হাত তুলেছিলাম,
যাবো ভাড়াটেদের দ্বারে, আজ বলাইয়ের মতো নীরবে কাঁদছি,
যাবো পাহাড়ের কাছে, যাবো প্রকৃতির কাছে ক্ষমা চাইবো।

মানিব্যাগে টাকা থাকতেও হাতপাতা অনাহারী শিশুটিকে তাড়িয়ে দিয়েছি
প্রতিহিংসায় প্রতিবেশির ক্ষেতে রাতে ছড়িয়ে দিয়েছি কীট নাশক বিষ
কারো কারো শান্তিপূর্ণ ঘুমের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি চিৎকার!

কেরাবিন কাতেবিনের নোটখাতায় কত যে অপরাধ, অভিযোগ
যে ফুলকে ফুটতে দেইনি, যে বিড়াল বাচ্চাকে পানিতে চুবিয়েছি
সেই ফুল, ঘাসফুল; সেই বিড়ালের বংশধরের খোঁজবো।

ভেঙেছি কত উইপোকার ঢিবি, ছিঁড়েছি কত ফড়িঙের পাখা,
বানিয়েছি প্লাস্টিকের চাল, কেমিক্যালের ডিম, ফলে ফর্মালিন
হোটলে রান্না করেছি মরা গরু-মুরগির মাংস! দিয়েছি বেনামি চিঠি।

এনজিও’র নামে টাকা এনে উচ্চশিক্ষার জন্য মেয়েকে পাঠিয়েছি বিদেশে
লেখক না হয়েও সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে
একবার কার জানি সইও নকল করেছিলাম; মনে পড়ছে না.

দেয়া হয়নি রাস্তার মোড়ের মুদির দোকানের খাতার বকেয়া
ফেরৎ দেয়া হয়নি ধার করা ফ্রানৎস কাফকার ডায়েরি এবং চিঠি
ইচ্ছের বিরুদ্ধে চুমুর অপরাধগুলো, অভিশাপগুলো মনে করছি।

যাবো আদিবাসীদের কাছে, যাবো জাটকার কাছে, জলের কাছে-
জোনাক পোকার কাছে যাবো, মাদ্রাসার বালকের কাছেও যাবো,
যে ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছি, সেই ব্যাংকেও যাবো।

দুধে জল মিশিয়ে বিক্রি করার মতো বহু ভেজালের বেদনা আছে,
দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকে খাদ্যকণা; দাঁতব্রাশ, দাঁতের ডাক্তারও জানেনা,
তেমনি আমিই জানি আমার কৃতকর্ম, অপকর্ম, অপরাধসমূহ।

গোদারা ঘাটের ফেরি ফাঁকি দিয়েছি, মাঝির কাছে যাবো, বৃদ্ধাশ্রমে যাবো,
ভূমিদস্যুর ডানহাত ছিলাম। স্বাক্ষী দিয়েছি মিথ্যে মামলায়। চুরি করেছি পুকুর,
জল-বায়ু, বাতাসের বিরুদ্ধে ছড়িয়েছি বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড।

পিয়নকে বেতন না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়ার মতো অপরাধের পাহাড়
বন্ধুকে ফাসিয়ে দিয়েছিলাম গোপনে, মাটি ক্ষতাক্ত করার অনুশোচনা
এবং বৃক্ষ কর্তণের জন্য আজ আমি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী।

হে মহামান্য, মানুষের যাবতীয় অপরাধের জন্য আমি শর্তহীন ক্ষমাপ্রার্থী।

টরন্টো, ৩০ মার্চ ২০২০, করোনা কাল।

পাঠকের মন্তব্য