আমরা এখনো আশাবাদী থাকতে চাই

আমরা এখনো আশাবাদী থাকতে চাই

আমরা এখনো আশাবাদী থাকতে চাই

গোলাম সারোয়ার, উপ-সম্পাদকীয় : করোনা ভাইরাসের কারণে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে মারা গেছেন ২,১৮,১৮৭ জন মানুষ। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৩১,৪৭,৬২৬ জন মানুষ। তার ভিতরে সুস্থ হয়েছেন ৯,৬১,৮৭১ জন। এই হিসাব আজ ২৯ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত। সবচেয়ে বড় যে হিসাব তা হলো, গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে এই ভাইরাস চীনের উহান হয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার বিশ্বের প্রায় ৭৮০ কোটি মানুষ আজ পর্যন্ত এই ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন। সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আজো কমেনি, বরং দিনকে দিন বাড়ছে তো বাড়ছেই। 

কোন সংকট ভালোভাবে মোকাবেলা করতে হলে সে সংকটের আদ্যোপান্ত ভালোভাবে জানতে হবে, জানতে হবে তার গতিবিধি। আমাদেরও এই সংকট মোকাবেলা করতে হলে জানতে হবে তার গতি প্রকৃতি। আমরা দেখতে পাই, আজ ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত পৃথিবীতে এই ভাইরাসের কারণে মারা গেছেন ২,১৮,১৮৭ জন মানুষ, তার ভিতরে পৃথিবীর জিওপলিটিক্স নিয়ে মাথা ঘামান এমন সতেরটি দেশের মানুষ মারা গেছেন ২,০১,৩৪৪ জন, আর বাকী সমস্ত পৃথিবীর মিলে মারা গেছেন ১৬,৮৪৩ জন। এই হিসাবকে মাথায় রেখে আমাদের আশাবাদী হওয়ার এখনো সুযোগ আছে।  

এবার আমরা আমাদের সাথে মিলিয়ে নিবো, এখানে আমাদের রিক্স ইনভল্ভমেন্ট কত টুকু। করোনা ভাইরাসের রোগী বাংলাদেশে প্রথম ধরা পড়ে ৮ মার্চ। বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যুর সংবাদ হয় ১৮ মার্চে। তারপর প্রথম মৃত্যুর পর থেকে ৪৩তম দিন, মানে আজ পর্যন্ত আমাদের সরকারী হিসেবে মোট মারা যায় ১৬৩ জন মানুষ। 

পৃথিবীর যেসব উন্নত দেশে করোনা ভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে তাদের সাথে তুলনামূলক বিবেচনা করে আমাদের ঝুঁকির একটি হিসাব আমরা পেতে পারি। আমরা দেখি,--জার্মানীতে প্রথম রোগী ধরা পড়ে ২৭ জানুয়ারী এবং তাদের প্রথম মৃত্যুর সরকারী রেকর্ড হলো ৯ মার্চ। তারপর তাদের ৪৩তম (২০ এপ্রিল) দিন পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হয়েছে ৪,৮৬২ জন মানুষ। ব্রিটেনে প্রথম রোগী ধরা পড়ে ৩১ জানুয়ারী এবং তাদের প্রথম মৃত্যুর সরকারী রেকর্ড হলো ৫ মার্চ। তারপর তাদের ৪৩তম (১৬ এপ্রিল) দিন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৩,৭২৯ জন মানুষ। ইতালিতে প্রথম রোগী ধরা পড়ে ৩১ জানুয়ারী এবং তাদের প্রথম মৃত্যুর সরকারী রেকর্ড হলো ২১ ফেব্রুয়ারী। তারপর তাদের ৪৩তম (৩ এপ্রিল) দিন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৪,৬৮১ জন মানুষ। স্পেনে প্রথম রোগী ধরা পড়ে ৩১ জানুয়ারী এবং তাদের প্রথম মৃত্যুর সরকারী রেকর্ড হলো ৩ মার্চ। তারপর তাদের ৪৩তম (১৪ এপ্রিল) দিন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৮,২৫৫ জন মানুষ। আর পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি রোগী এবং বেশি প্রাণহানির দেশ, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম রোগী ধরা পড়ে ২১ জানুয়ারী এবং তাদের প্রথম মৃত্যুর সরকারী রেকর্ড হলো ২৯ ফ্রেব্রুয়ারী। তারপর তাদের ৪৩তম (১২ এপ্রিল) দিন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২৫,৭৮৯ জন মানুষ !  

আমরা এই হিসাব দিলাম শুধু মৃত্যুর হিসাব আমলে নিয়ে। শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হিসাবে নিলাম না, কারণ জনসংখ্যার হিসাবে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে টেস্ট হচ্ছে খুবই কম, আমাদের আরো কম। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে ৩৩ কোটি মানুষের ভিতরে এ পর্যন্ত টেস্ট হয়েছে প্রায় ঊনষাট লাখ। তাই টেস্টের হিসাবে আমরা পৃথিবীর প্রকৃত টোটাল করোনা রোগীর হিসাব পাবোনা। 

তাই আমাদেরকে হিসাবে নিতে হবে মৃত্যুর হিসাব। কারণ করোনার কারণে মৃত্যু টেস্টের উপর নির্ভর করবেনা, নির্ভর করবে রোগের প্রকোপের উপর। আমাদের প্রথম মৃত্যু থেকে আজ ৪৩তম দিন পর্যন্ত সরকারী হিসেবে মৃত্যু হলো ১৬৩ জন। 

অনেকে অভিযোগ করবেন, করোনার লক্ষণ নিয়ে অনেকে মারা যাচ্ছেন যাদের হিসাব সরকারী হিসেবে আসছেনা। আমরা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমের সেসব মৃত্যুর সংখ্যা আমলে নিলেও, আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের প্রাণহানির সংখ্যা এখনো হাজার হাজার নয়। এখানেই হলো আমাদের আশার কথা। পৃথিবীতে বহু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চালু আছে করোনা ভাইরাস নিয়ে। সেসব কেউ কেউ বিশ্বাস করছেন, কেউ কেউ বিশ্বাস করছেন না। তবে যাই কিছুই ঘটুকনা কেন, আমরা এখনো পরিস্থিতির ফেভারে আছি। আমাদের এখনো বিশ্বাস করতে হবে, আমাদের এদিকে যে লেভেলের ভাইরাসের কন্টামিনেশন হয়েছে তা ততটা প্রাণঘাতী নয়, অন্তত ইউরোপের ছয়-সাতটি দেশ এবং আমেরিকার ব্যাপক মৃত্যুর সংখ্যা মাথায় নিলে, এটি আমাদের মানতে হবে।

আমাদের দেশে ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ জনতা পর্যন্ত কেউই প্রথম থেকেই তেমন গুরুত্ব দেয়নি লকডাউনে। অথচ ব্যাপক প্রাণহানি হওয়া সেসব দেশের মানুষ খুব কড়াভাবে লকডাউনের নিয়ম মেনেছেন। আমাদের প্রায় সবাই চরম অবহেলা করেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকে বের হয়েছেন, সামাজিকভাবে মিশেছেন। সব ধর্মের ধর্মপ্রাণ সরল মানুষেরা প্রথম দিকে মানেননি, অনেকে বিশ্বাসই করেননি। মানে প্রায় সবাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছেন। তবুও আমাদের এখনো প্রাণহানির সংখ্যা ব্যাপক নয়। 

এখন আমাদের যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে গেছেন, তাদের প্রতি আমাদের বার্তা হলো, সাহস রাখুন। আমাদের এখানে যে লেভেলের করোনা আক্রমণ করেছে তা অনেক বেশি প্রাণঘাতী নয়। অন্তত এ পর্যন্ত পরিসংখ্যান দেখে আমরা এই আশা রাখতে পারি। সুতরাং সাহসের সাথে মনোবল সুউচ্চে রেখে লড়ে যেতে হবে। মনে রাখবেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে কার্যকরী এন্টিবডি হলো মানবদেহ। এই বিশ্বাস মনে গেঁথে রাখুন। 

আর যারা এখনো আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের বলবো আরো পনেরটি দিন ধৈয্য ধরে নিজেদের রক্ষা করুন। বিনা কারণে বের হবেন না। সারাজীবন বের হতে পারবেন। তাই আর মাত্র পনেরটি দিন। খুব প্রয়োজনে বের হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে, সামাজিক দূরত্ব মেনটেইন করে, মাস্ক পরে বের হবেন।

রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা যদি আর দুটি সপ্তাহ পার করতে পারতাম তবে আমরা অনেকটা নিরাপদে এই সংকট উৎরে যেতে পারতাম। কিন্তু এর ভিতরে আমরা গার্মেন্টস, পাটকলসহ নানান শিল্প কারখানা খুলে দিলাম। আমাদের ব্যবসায়ীদের অধৈয্য আমাদের আবারো ঝুঁকিতে ফেলে দিলো। 

এখন আমাদেরকে যা করতে হবে তা হলো, ব্যক্তি পর্যায়ে যুদ্ধ। এই যুদ্ধ হলো সচেতনতার যুদ্ধ। আমাদেরকে অন্তত আরো পনেরটি দিন টিকে থাকতে হবে। এরপরই আমরা বলতে পারবো আমরা পার হয়ে গিয়েছি। আর পনেরটি দিন যে নিজেকে কন্টামিনেশন থেকে রক্ষা করতে পারবে, তার বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আমরা যেন সচেতনভাবে সামাজিক দূরত্ব মেনটেইন করে আগামি দিনগুলো পার করতে পারি। 

গোলাম সারোয়ার
গবেষক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মন্তব্য