আজকের কবিতা : 'দেশপ্রেমিক' 

আজকের কবিতা : 'দেশপ্রেমিক' 

আজকের কবিতা : 'দেশপ্রেমিক' 

দেশপ্রেমিক
কবিতানুবাদ (ইংরেজি থেকে বাংলা)
মূলঃ রবার্ট ব্রাউনিং

গোলাপে গোলাপে আচ্ছাদিত আর মেদিমন্ডিত সবুজে বর্ণিল হয়েছিল
পুরোপথ,
উচ্ছ্বসিত জনতার ভীড়ে ভারী হয়েছিল ঘরগুলোর ছাদ,
শোভিত পতাকার দ্যুতিতে চক চক করেছিলো চার্চ-স্পায়ারগুলো,
এক বছর আগেকার এই দিনটিতে।

সেদিনের কুয়াশা ভেঙেছিল বাতাসের ঘণ্টায়,
পুরানো দেয়ালে উঠেছিল কাঁপুনি উৎসুক জনতার চাপে,
আকাশ থেকে সূর্য চেয়েছিলাম আমি
সমবেত জনতার কাছে-
নিরবতা ভেঙ্গে তুলেছিলো তারা সম্মতির প্রতিধ্বনি
আর সমস্বরে বলেছিল, "বলো, এছাড়া আর কি চাও?''

আনন্দে আমি ভেবেছিলাম
এই ভালবাসা ব্যাপক ও চিরঞ্জীব,
কেউ করবে না আমাকে ত্যাগ কোনদিন।
তাই করেছি চাষ, বুনেছি বীজ
করা যেতো যা বিগত বছরে
অসমাপ্ত রাখিনি কিছুই।

আজ বিদায় জানাতে ছাদে কেউ নেই-
পক্ষাঘাতে জর্জরিত দু'একজন ছাড়া-
দাঁড়িয়েছে জানালার পাশে তারা।
আর আমি চলছি শাম্বলস গেটে
ব্যথাতুর নগ্নপদে, কষ্ট মেনে
পা টেনে টেনে।

একি পরিহাস! উফলা মাঠ শুন্য চারপাশ!
আজ আমি রিক্ত, জনতার রায়ে অভিযুক্ত
কব্জি বাঁধা পিছনে, চলছি সামনে বৃষ্টিসিক্ত
তাদের ছোঁড়া পাথরে কপালে ঝরছে রক্ত।

সেদিন ঘটেছিলো বর্ণাঢ্য প্রবেশ,
আজিকে অযাচিত দুখ, বিবর্ণ বেশ।
অবসন্ন তবু উন্মুখ, জবাবদিহিতায়
ইশ্বর দেবেন নিশ্চয় নিরাপদ আশ্রয়।।

অনুবাদক: ড. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ
ইস্কাটন, ঢাকা; ০১/০৫/২০২০

[প্রসঙ্গকথা: দ্য প্যাট্রিয়ট কবিতাটি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের অন্যতম বিখ্যাত স্বগতোক্তি কবিতা, যাতে একজন দেশপ্রেমিকের নিজস্ব জবানীতে তাঁর করুণ পরিণতির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। কবিতাটির শুরু হয়েছিলো মাত্র এক বছর আগে দেশপ্রেমিকের আগমনের স্মৃতিচারণ দিয়ে। সেদিন তাঁকে স্বাগত জানাতে দেশবাসী গোলাপ আর মেদিমন্ডিত সবুজে সজ্জিত করেছিলো পুরোপথ, তাঁকে একনজর দেখার জন্য রাস্তার পাশের বাড়ির ছাদে ভিড় করেছিল মানুষজন, চার্চ-স্পায়ারগুলো পতাকাশোভিত হয়েছিলো। তাঁকে খুশি করতে সমবেত জনতা আকাশের সূর্যটিও সহাস্যে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলো। দেশপ্রমিক বিগত এক বছরে সাধ্যমতো অবদান রেখেছেন, দেশের উন্নয়নে যা করা সংগত ছিলো তার সবটাই করেছেন। কিন্তু, দেশবাসীর অবাস্তব আকাশচুম্বী প্রত্যাশাকে তিনি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় মাত্র এক বছরের মাথায় তাঁকে তারা অপরাধী গণ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য শাম্বলস গেটে নিয়ে যাচ্ছে। এসময়ে তাঁকে দেখতে রাস্তার পাশের বাড়ির ছাদে কেউ নেই। যে কয়জন লোক বাড়ির জানালার পাশে বসে আছে, তারা আসলে অসুস্থ । তাঁর উভয় কব্জি পেছনে বেধে নির্মমভাবে টেনে নেয়া হচ্ছে। তিনি অনুভব করছেন যে, ভিড়ের মধ্যে থেকে কারো ছোড়া পাথরে তাঁর কপালে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন, দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ না হ'য়ায় সকলেই তাঁর ভাল কাজের স্মৃতিগুলো মুছে ফেলেছে। বেদনার্ত অবস্থাটিকে তিনি একজন দেশপ্রেমিক নেতার জীবনের চরম সত্য হিসেবে মেনে নিয়ে প্রত্যাশা করেছেন যে, তিনি তাঁর ভূমিকা যাথাযথ পালন করেছেন বিধায় জনতার কাছে অপরাধী হলেও ইশ্বরের কাছে জবাবদিহিতায় তিনি পুরস্কৃত হবেন। কবিতাটির সাথে আমার পরিচয় উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়ণের সময়। কবিতাটি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কবিতাটিতে একজন দেশপ্রেমিক নেতার কাছে জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা (যার অনেকটাই অবাস্তব) এবং রাজনীতি, দেশপ্রেম, ধর্মীয় বিশ্বাসে একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক নেতার অবস্থান এবং করুণ পরিণতির দার্শনিক তত্ত্ব অনুধাবনে আমি এতোটাই মোহিত হয়েছিলান যে, সময়ের আবর্তে স্মৃতিপটে ময়লা জমলেও অক্ষরগলো মুছে যায়নি। সেসূত্রেই এতোকাল পরে কবিতাটি অনুবাদের এই প্রয়াস। আশা করি বরাবরের মতোই পাঠকবৃন্দ নিজস্ব ঔদার্যতায় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন।]

পাঠকের মন্তব্য