“শত শত লাশগুমকারী” আওয়ামী লীগ এখনও টিকে আছে ! 

“শত শত লাশগুমকারী” আওয়া্মী লীগ এখনও টিকে আছে ! 

“শত শত লাশগুমকারী” আওয়া্মী লীগ এখনও টিকে আছে ! 

হায়দার আলী, উপ-সম্পাদকীয় : আজ ৫ মে, রাজধানীর মতিঝিল চত্বরসহ সারাদেশেই চলছিল হেফাজতের তাণ্ডব। ঢাকাসহ আশাপাশের জেলা থেকে মিছিল করে দলে দলে আসেন এবং মঞ্চ বানিয়ে মতিঝিল চত্বরে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল হেফাজত ইসলামের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। আর হেফাজতের ওই অবস্থানকে সমর্থন দেয়েছিল বিএনপি-জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। দিন ভর দফায় দফায় চলতে থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে চলতে থাকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সংঘাত। আইনশৃংখলা বাহিনীসহ সংবাদ কর্মীদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটে, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, কিন্তু ম্যারাথন চলতে থাকে হেফাজতের অবস্থান কর্মসূচী। 

কিন্তু নিরুপায় হয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নির্দেশে পুলিশ এবং র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে মতিঝিল চত্তর থেকে রাতের আধারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় হেফাজতকে। রাতের সেই অভিযানে হেফাজত কর্মীসহ ২৩ জন মারা গিয়েছিল, কিন্তু গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়, র্যাব পুলিশের অভিযানে হেফাজতের শত শত আলেম ওলামাকে গুলি করে মেরে লাশ গুম করে ফেলা হয়। লাশগুলো ট্রাকে ভরে রাতের বেলায় পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জায়গায় মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে সারাদেশে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশেই এই গুজবকেই সত্য হিসেবে অনেকেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছিল, মতিঝিল চত্বরে গুমের কোন ধরেনর গুমের ঘটনা ঘটেনি, কেউ নিখোঁজ হয়নি। ফাঁকা ফায়ার করে, ভয় দেখিয়ে মতিঝিল চত্তর থেকে নিরাপদে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল হেফাজতের নেতাকর্মীদের। কিন্তু সাধারণ মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে? শত শত আলেম ওলামা গুমের অভিযোগ, নাকি কোন আলেম-উলামা গুম হয়নি সরকারের এমন দাবি। 

ঘটনার পর গুজব নাকি সত্য- দ্বিধায় পড়ে যায় আমজনতা এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কালের কণ্ঠের একজন ক্ষুদে সংবাদকর্মী হিসেবে ভাবতে থাকলাম- আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানে আসলে কি ঘটেছিল সেই রাতে ? ঘটনা সত্য উদ্ঘাটনের জন্য পরের দিন অনুসন্ধানে মাঠে নেমে যাই। হাজার হাজার না হোক অন্তত কয়েকজন নিখোঁজ কিংবা গুম হয়েছেন এমন পরিবারের তথ্য উপাত্ত কিংবা ঠিকানা পেলে নিশ্চয়ই ভালো একটি রিপোর্ট বানানো যাবে। সরকার বলছে কোন গুম হয়নি, তাহলে প্রমাণ করবো অবশ্যই সেই গুম হয়েছিল। সেই চিন্তা নিয়ে প্রথমেই যাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের দুটি বড় বড় মাদ্রাসায়, ওই দুটি মাদ্রাসার এক একটিতে দুই থেকে আড়াই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। সেখানে গিয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কোন নিখোঁজের তথ্য পাইনি, তবে পুলিশের পিটুনিতে আহত হয়েছেন এমন তথ্য পেয়েছিলাম। সেই মাদ্রাসারই একজন শিক্ষকের সহায়তায় লালবাগ মাদ্রাসায় যাই, সেখানে গিয়েও নিখোঁজের কোনো তথ্য পায়নি। 

এভাবে একের পর এক রাজধানীর বড় বড় বেশ কয়েকটি মাদ্রাসাগুলো চষে বেড়াই। নিহত কিংবা আহত হয়েছেন এমন হেফাজতের কর্মী সদস্যদের নাম ঠিকানা পাওয়া যায় কিন্তু নিখোঁজ আছেন কিংবা গুম হয়েছেন এমন কোনো সদস্যের নাম ঠিকানা কেউ দিতে পারেনি। ওইসব মাদ্রাসার প্রধান এবং হেফাজতের নেতাদের কাছে জানতে চাইলাম যারা গুম কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন এমন পরিবারের নাম্বার দিন। কিন্তু সেই দিনের ঘটনায় আহত এবং নিহত হওয়াদের নাম ঠিকানা দিতে পারলেও গুম বা নিখোঁজ আছেন এমন সদস্যদের নাম ঠিকানা দিতে পারেনি মাদ্রাসার প্রধান এবং হেফাজতের নেতারা। গুম এবং নিখোঁজের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবদকের প্রশ্নের উত্তর নানা কায়দায় এড়িয়ে গেছেন তারা।

একা একা দুদিন অনুসন্ধানের পর ভাবলাম আরো বেশি বেশি মাদ্রাসায় অনুসন্ধান করা দরকার। যদি অন্য কোন মাদ্রাসায় গুম-নিখোঁজের ঘটনা যদি থেকে থাকে! এমন ভাবনা থেকে ওই সময় আমার সহকর্মী কালের কণ্ঠের সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে (বর্তমানে সমকাল পত্রিকায় কর্মরত) অনুসন্ধানের সঙ্গী হিসেবে নেই। আমার প্রিয়ভাজন সাংবাদিক জয়নালকে সঙ্গে নিয়ে আরো বিশদভাবে চলে অনুসন্ধান। দুজন মিলে পরিকল্পনা করে চষে বেড়াই ঢাকার বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসা, কথা বলি হেফাজতের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে হেফাজত ইসলামের নেতা,মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন সেক্টরে। জয়নাল এবং আমি চিন্তা করলাম হেফাজতের সমাবেশে ঢাকা এবং আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও এসেছিলেন নেতাকর্মীরা। তাহলে খোঁজ নেয়া যায় ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও। 

একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, গাজীপুর, সাভার, নোয়াখালী ৯ টি জেলার কালের কন্ঠের সংবাদিকরাও অনুসন্ধানে অংশ নিতে বলি এবং তারাও খুবই গুরুত্বসহকারে অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০৪ টি মাদ্রাসায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও নিখোঁজের কোন প্রমাণ পায়নি কালের কণ্ঠের এই অনুসন্ধান দলের কোন সাংবাদিকই। 

হেফাজতের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা মহানগরের একজন নেতাও তাদের কোন নেতাকর্মী নিখোঁজ কিংবা গুম হয়েছেন এমন পরিবারের তথ্য-ঠিকানা দিতে পারেনি। অনুসন্ধানের শেষ পর্যায়ে খুবই যত্ন সহকারে চার পর্বের ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় কালের কণ্ঠের প্রথম পাতায়। পরপর চারটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর প্রকাশ বেরিয়ে আসে মতিঝিল চত্তরে হাজার হাজার, আলেম ওলামা গুমের অভিযোগটি ছিল ভিত্তিহীন এবং অপপ্রচার। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এমন অভিযোগ করা হয়েছিল সেই। সেই ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো ছাপা হওয়ার পর শুধু আমরাই নয়-কালের কণ্ঠের পাঠকসহ যারাই প্রতিবেদনটি দেখেছেন তারাও বুঝতে পেরেছিলেন হেফাজতের সেই ঘটনায় কোন গুমের ঘটনা ঘটেনি, সে অভিযোগ ছিল মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। প্রতিবেদনটির জন্য মিডিয়ার সহকর্মীসহ বিভিন্ন মহল থেকেই অভিন্দনসহ প্রশংসিত হয়েছিলাম। সহকর্মী জয়নাল আবেদীন এবং আমি পেয়েছিলাম বাংলাদেশ ইনেস্কো জার্নালিজম আ্যাওয়ার্ড। 

প্রতিবছরই আসে ৫মে, এই দিনটি আসলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে হেফাজত ইসলামীর সেই দিনের তান্ডেবর ভয়ংকর দৃশ্য, হাজার হাজার আলেম ওলামার লাশ গুম করে দেয়া নিয়ে সাংবাদিকদের স্বপক্ষে কত শত যুক্তি। লাশ গুমের গুজবকে সত্য প্রমাণ করতে কিছু সাংবাদিক কৌশলে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, সেটাও কোন দিন ভুলবো না, সময় হলে আরেক দিন সেই কথাও তুলে ধরবো। তবে সত্য কখনো চাপা থাকে না, ঠিকই বেড়িয়ে আসে। শত শত আলেম ওলামার লাশ গুম করে ফেলার অভিযোগের তীর যারা আওয়ামী লীগের উপর ছুড়ে ছিল, যারা গুজব রটিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির পায়তারা করেছিল। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিরি হিসেবে হেফাজতকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল তারাই এখন রাজনীতির মাঠে নেই, তারাই সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও টিকে আছে "শতশত লাশ গুমকারি" আওয়ামী লীগ, আগামীতেও টিকে থাকবে।

লেখক : হায়দার আলী
কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার
৫মে, ২০২০

পাঠকের মন্তব্য