মুখোশের আড়ালে মুখোশ

মুখোশের আড়ালে মুখোশ

মুখোশের আড়ালে মুখোশ

[প্রসঙ্গকথা: কোভিড-১৯ থেকে বাঁচার জন্য আমরা বিভিন্ন রং, মান ও মূল্যের মাস্ক ব্যবহার করছি। করোনা প্রতিরোধে মাস্কের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। কিন্তু আমার কাছে কেবলই মনে হচ্ছে আমরা প্রত্যেকে একেকটা অদৃশ্য মুখোশে ঢেকে বেঁচে আছি। সে অদৃশ্য মুখোশের উপরে আরেকটা কৃত্রিম মুখোশ যোগ হয়েছে। অদৃশ্য মুখোশটা নিজেকে বড় করে দেখাবার কপট প্রয়াস, দৃশ্যমান কৃত্রিম মুখোশটা অদৃশ্য জীবাণুর আক্রমণ থেকে নিজে বাঁচবার, অন্যকে বাঁচাবার ইপ্সিত উদ্যোগ । এই বোধ থেকেই এ নিবন্ধটি লেখার প্রয়াস নিলাম। কোন বিশেষ ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে হেয় প্রতিপন্ন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। এতে প্রতিফলিত মতামতসমূহ আমার ব্যক্তিগত, সেসবের সাথে আমার বর্তমান পদ-পদবীর কোন সম্পর্ক নেই।]

মুখোশের স্বরূপ উদঘাটনে উনিশ শতকের প্রভাব বিস্তারকারী রোমান্টিক ফরাসী লেখক ভিক্টর হুগো বলেছেন, "Virtue has a veil, vice a mask"- অর্থাৎ " সদগুণের থাকে আড়াল আর কপটতার থাকে মুখোশ"। সমকামীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সংগঠক হিসেবে সমধিক পরিচিত মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক মার্টি রুবিনের ভাষায়, "Behind every mask there is a face, and behind that a story"-অর্থাৎ "প্রত্যেক মুখোশের আড়ালে থাকে একটা মুখশ্রী, তার আড়ালে থাকে একটা গল্প।" আসলেই কলঙ্ক ঢাকতেই আমরা মুখোশের আড়ালে মুখ লুকাই, কিন্তু লুকানো মুখের গল্পটা কি অত সহজে লুকানো যায়? সে গল্পটা যে সুখকর নয় এবং লুকানোও যে সহজ নয় তাতো জানা কথা। তবুও মুখোশের আড়ালে মুখ লুকাবার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা আমাদের। বোধ করি এজন্যেই মুখোশ বাঙ্গালী সংস্কৃতির একটা অনুসঙ্গ। সুখকর গল্পের সহজাত না হলেও বাঙ্গালী জীবনাচারণে বিশেষত মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশের ব্যবহার স্বীকৃত। "নিষিদ্ধ মুখোশ: রাজনীতির মুখ ও মুখোশ" শিরোনামে অজয় দাশগুপ্তের একটা নিবন্ধ পড়েছিলাম যেখানে তিনি মঙ্গল শোভাযাত্রায় ভুভুজেলা আর মুখোশ নিষিদ্ধের ঘোষণায় খেদোক্তি করেছেন, "মনে হচ্ছে এটাই নিয়মে পরিণত হতে চলেছে। কে করবে প্রতিবাদ? কে শোনে কার কথা?" অধিকন্তু সাম্প্রদায়িক একটা দলের প্রভাবে শাসকদলের আদর্শ, মূল্যবোধ আর নৈতিকতা অবহেলিত হচ্ছে গণ্যে তিনি আশঙ্কা করেছেন, "ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করে পরিবেশ এমন করে তুলছে যাতে একসময় এসব মুখ ও মুখোশ একাকার হয়ে আমাদের চেহারা ও পরিচয় দুটোই এমন করে তুলবে যে কেউ কাউকে আর চিনতেও পারবো না।"

শ্রদ্ধেয় কলামিস্ট ও নিবন্ধকার অজয় দাশগুপ্তের সাথে সহমত বা দ্বিমত পোষণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। এ লেখায় তাঁকে রেফারেন্স হিসেবে আনার কারণ তিনি মুখোশ সম্পর্কে চমৎকার একটা দর্শন দিয়েছেন, "মুখ যেখানে মুখোশ, সেখানে নতুন করে মুখোশের কি প্রয়োজন আছে? আপনি তাকিয়ে দেখুন তো বড় বড় মানুষের মুখ দেখে কি বোঝা যায় এগুলো মুখ না মুখোশ? তাদের কথা প্রতিশ্রুতি আর কাজ মেলালে কী মনে হয়?..... সবাই জানে মুখ এক আর ভেতরের মুখোশ আলাদা। ফলে মুখোশের নতুন করে ব্যবহার থাকলে কি, আর না থাকলেই বা কি?"

মুখোশ নিয়ে বাঙ্গালীর আগ্রহের কমতি নেই। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে নির্মিত ও মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র "মুখ ও মুখোশ"। চলচ্চিত্রটি দর্শকনন্দিত হওয়ায় মুক্তির পর প্রথম দফায় তৎকালীন ৪৮,০০০ রুপি আয় করেছিলো বলে জানা যায়। মুখোশকে ঘিরে ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাসুদ রানা’ ছবির একটি জনপ্রিয় লিরিকসও উল্লেখ করা যেতে পারে- 

"ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়
বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়
মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায়
মানুষকে কি দেখে চিনবে বলো।"

মুখোশ নিয়ে অনেকেই অনেক ধরণের মন্তব্য করেছেন। সকল মন্তব্য ছাপিয়ে যে সত্যটি আমার কাছে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তাহলো, অদ্ভুত এই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে মুখের থেকে মুখোশের সংখ্যাই বেশি। আমাদের বর্তমান জীবনাচারণে অদৃশ্য মুখোশের এ আস্তরণ যেনো অভ্রভেদি হিমাচল হয়ে দাড়িয়েছে। সেটা অতিক্রম করে সঠিক মুখশ্রী দর্শন যেনো এক দুঃস্বপ্ন। কৃত্রিম মুখোশ পড়লেই যে করোনার আক্রমণ থেকে রেহাই পাবো তার কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও অদৃশ্য মুখোশ পড়লে যে সমাজে আদৃত হওয়া যাবে তা মোটামোটি নিশ্চিত। ফলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেকেই অদৃশ্য মুখোশের আশ্রয় নিচ্ছেন সমাজে আদৃত হওয়ার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য, নীতির সাথে আপোষ করে। আর নীতির সাথে আপোষ করতে যাঁরা ব্যর্থ হচ্ছেন তাঁরা যেনো হতভাগা, কোথাও তাঁদের কোনো কদর নেই। তাহলে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য আমরা কি নীতির সাথে আপোষ করে অদৃশ্য মুখোশের আড়ালে লুকাবো ?

আমার প্রশ্নের ধরণে হয়তো কেউ হতচকিত হবেন, ভাববেন নীতির সাথে আপোষ করতে উৎসাহিত করছি। আদতে এটা আমার দুঃখবোধ। নিজে যা করিনি বা করবোনা সেকাজে অন্যকে উৎসাহ দেয়াতো কপটতা। আমি মুখোশের স্বরূপ উদঘাটনের চেষ্টা করছি মাত্র। যদিও জানি এ প্রচেষ্টায় কোন প্রাপ্তি জুটবে না। প্রসংগক্রমে হুমায়ূন আজাদের একটা উক্তি মনে পড়লো,
“যে বালিকাটি ভোর হওয়ার সাথে সাথে ছুটছে কারখানা অভিমুখে, চোখ আর আঙুল জীর্ণ করে শেলাই করছে সভ্যতার মুখোশ, তার সাথে সভ্যতা যেন সভ্য আচরণ করে, তাকে দেয় খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা, তাকে ক্রীতদাসী না করে তাকে যেন দেয় মানুষের মর্যাদা, যা তার প্রাপ্য সহজাতভাবে। ”

মানুষের মুখোশের রূপ একেক সময়ে একেক ধরণ। কেউ কথার ফুলঝুড়ি সাজান। অন্তরে গরল রেখেও মুখে অমৃত সুধার স্রোত বইয়ে দেন। বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেলেই অপ্রসাংগিকভাবে কারো নামে অনাবশ্যক প্রশংসার ঢেউ তোলেন। কেউ কেউ হয়তো এতোটাই সাবধানী যে, জীবনের প্রতিমূহুর্তে যেসব মানুষের সাথে সময় পার করতে হয় তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা মুখোশ তুলে রেখেছেন। এই শ্রেণির মানুষ পরিবারের সাথে একরকম, কর্মস্থলে অন্যরকম, অপরিচিত অযাচিত মানুষদের সাথে ভিন্নরকম মুখোশ ব্যবহার করেন। মুখোশ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এরা সমাজের শ্রেণিবিভাজনকেও আমলে নেন। ফলে এরা সমাজের সকলের কাছেই আইকনরূপে সমাদৃত হন। মজার ব্যাপার হলো যখন আলাদা ক্যাটাগরির মানুষগুলো একত্রে বসে তখন আবার আরেক ধরনের মুখোশ বের হয়ে আসে।

ব্যক্তি মুখোশের বাইরেও অনেকক্ষেত্রেই গোষ্ঠিগত মুখোশের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এই মুখোশ ব্যবহারে ঝামেলা কম। কেননা, একই গোষ্ঠির সবাই গোষ্ঠিগত প্রয়োজনে একই ধরণের মুখোশ পরে একত্রিত হয়। দলীয় মেনিফেস্টো, আদর্শ, উদ্দেশ্য না জানলেও নিজেদেরকে দলের জন্য নিবেদিত প্রমাণ করতে এরা বিশেষ পোশাক পড়েন, কথায় কথায় বিশেষ শ্লোগানে মুখরিত হন। মুখোশের আড়ালে মননের 'রাজাকার' চাপা দিয়ে বনে যেতে চান আত্মত্যাগী 'মুক্তিযোদ্ধা'।

আবুল মনসুর আহমদের 'আয়না' গ্রন্থটি অনেক আগে পড়েছিলাম। যতদূর মানে পড়ে গ্রন্থটির মুখবন্ধকে 'আয়নার ফ্রেম' উল্লেখ করে কবি নজরুল লিখেছিলেন, 'আয়নায় মানুষের বাইরের ছবি দেখা যায়, কিন্তু আবুল মনসুরের আয়নায় মানুষের ভেতরের রূপটিই ফুটে উঠেছে।' এ মুহূর্তে আবুল মনসুরের আয়নার মতো হাজারো আয়নার প্রয়োজন যেখানে প্রতিফলিত হবে মুখোশের আড়ালে লুকায়িত মুখশ্রীর সত্যিকার বিম্ব। নয়তো মুখোশের আড়ালে ক্রমাগত ঢাকা পড়তে থাকবে আমাদের মুখশ্রী। একটা মুখোশ সরালে বেরিয়ে আসবে আরেকটা মুখোশ, সত্যিকারের মুখশ্রী দর্শন হবে অবাস্তব কল্পনার নামান্তর।

শুরু করেছিলাম ভিক্টর হুগোর উদ্ধৃতি দিয়ে, শেষ করতে চাই André Berthiaume-এর বিখ্যাত একটি উক্তি দিয়ে, "We all wear masks, and the time comes when we cannot remove them without removing some of our own skin".

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : Shahadt Hossain Mahmud

পাঠকের মন্তব্য