“বোরো ধান সংগ্রহ আরও বাড়ানো উচিত”

এস এম খায়রুল বাসার

এস এম খায়রুল বাসার

অধ্যক্ষ এস এম খায়রুল বাসার, উপ-সম্পাদকীয় : অতি ক্ষুদ্র শত্রু করোনার তা-বে অনিশ্চিত গন্তব্যে বিশ্বের সাড়ে সাত’শ কোটি মানুষ। হুমকির মুখে মানব সভ্যতা। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না করোনা মহামারির স্থায়িত্ব কতকাল হবে, বলতে পারছে না এর অভিঘাত কতটা সুদূরপ্রসারী ও সর্বগ্রাসী হবে। তবে এটা বলা যাচ্ছে, করোনা মহামারির শেষ অভিঘাত এসে পড়বে খাদ্যের উপর। আগামী দুই তিন মাস পর পৃথিবীতে প্রতিদিন অন্তত ৩ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যাবে বলে আশঙ্কা করেছে জাতিসংঘ।

এই বৈশ্বিক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আশা জাগানিয়া খবর হল, বৈরী আবহাওয়া ও নানা সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি শস্য চাল, গম ও ভুট্টার উৎপাদন কমলেও বাংলাদেশে ওই তিন খাদ্যশস্যের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বাড়বে বলে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ। ইউএসডিএ’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুকূল আবহাওয়া ও উপকরণ সহজলভ্য থাকায় শুধু এই তিন শস্যের মোট উৎপাদন বাড়তে পারে প্রায় ১০ লাখ টন। ইউএসডিএ থেকে প্রকাশিত বৈশ্বিক খাদ্যশস্য প্রতিবেদন-২০২০, মে শীর্ষক আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে চালের উৎপাদন দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ কমেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাল উৎপাদনকারী দেশ চীনের উৎপাদন ১ দশমিক ১৯ শতাংশ কমেছে। বিশ্বের অন্যতম চাল রপ্তানিকারক দেশ থাইল্যান্ডে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, মিয়ানমারে প্রায় ২ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। ভারত ও ভিয়েতনামে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি চালের উৎপাদন বেড়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে, প্রায় ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশে এ বছর বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ৪ লাখ মেট্রিক টন হলেও এবারের ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু সরকার মাত্র ১০ লাখ মেট্রিক টন অর্থাৎ ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ ধান কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ এ বছর পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার কৃষকের কাছ থেকে মোট উৎপাদিত বোরো ধানের (আড়াই কোটি মেট্রিক টন) ২২ শতাংশ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের সরকার অবশ্য সেই সঙ্গে সাড়ে ১১ লাখ টন চালও কিনবে। তারপরও সরকারিভাবে যে ধান-চাল কেনা হবে তা মোট উৎপাদিত ধানের ১০.৫৪ শতাংশের বেশি হবে না। তবে চাল কিনলে কৃষকের স্বার্থ তেমন সংরক্ষিত হয় না বরং চাতাল মালিক ও মিলাররাই এতে লাভবান হন। আবার বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও অনিয়মের কারণে সরকারিভাবে যে পরিমাণ ধান কেনা হয় তার সুফলও কৃষক পুরোপুরি পায় না। তাই বাধ্য হয়ে তাকে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে কাঁচা ধান বিক্রি করে দিতে হয়। বিগত দিনের অভিজ্ঞতা বলে, বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলনের পরও ধানের লাভজনক দাম না পাওয়ায় আউশ মৌসুমে ধান চাষে কৃষক আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সুতরাং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা বাড়ানো দরকার। সরকার বেশি পরিমাণে ধান না কিনলে বা স্বল্প পরিমাণে কিনলে ধানের দাম কম থাকে এবং এই সুযোগে চালকল মালিকরা কম দামে ধান কিনে বিপুল মজুদ গড়ে তুলে। সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেউচ্চমূল্যে চাল  বিক্রি করে। একাধিক কারণে এবার ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ বেড়ে গেছে। দীর্ঘায়িত খরার কারণে বোরো ধানচাষীদের, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের সেচ বাবদ ব্যয় বেড়েছে। তাছাড়া,করোনা মহামারীর জন্য কৃষি শ্রমিক সংকটের কারণে এবার শ্রমিকের মজুরি অন্য বছরে তুলনায় অনেকটা বেড়ে গেছে। সুতরাং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা অন্তত দ্বিগুন বাড়ানো উচিত সরকারের।

যদিও এই দুঃসময়ে আমাদের দেশের সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই, তবুও ধান-চাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর আরও অনেক যুক্তিও আছে। ইতিহাস বলে, সকল মহামারির শেষ অভিঘাত এসে পড়ে খাদ্যের উপর। এইজন্যেই হয়ত করোনা মহামারির ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কথা চিন্তা করে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, করোনাভাইরাসে মৃত্যুর চাইতেও বেশি মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যেতে পারে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৮২ কোটি ১০ লাখ মানুষ ক্ষুধার যন্ত্রণায় রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ বিশ্বে তিন কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে। 

করোনাকালে খাদ্য সংকট যেন না হয় সেজন্য বিশ্বের অনেক দেশেই নাগরিকদের জন্য ব্যাপক আকারে খাদ্য সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় রাজ্যের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ছয় মাস বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কেরলা রাজ্যবাসীকে বিনামূল্যে রেশন দিচ্ছে। অন্য রাজ্যগুলোও একই পথে হাঁটছে। এর আগে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের নাগরিকদের একই সুবিধা দিয়েছিল। করোনার কারণে বাংলাদেশ সরকারও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি করেছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের কারণে মানবিক দুর্যোগ শুরুর পর গত ২৪ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৯৯ লাখ ৪ হাজার ৯৭৭টি পরিবারকে (৪ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ) ত্রাণসহায়তা দিয়েছে সরকার। ৬৪ জেলা প্রশাসন থেকে ১০ মে পর্যন্ত ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৮০২ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। সারাদেশে চাল বরাদ্দ করা হয়েছে ১ লক্ষ ৪৩ হাজার ৬৭ মেট্রিক টন। এতে উপকার পেয়েছে ১ কোটি পরিবার। ১ কোটির পর ১৪ মে থেকে আরও ৫০ লাখ পরিবার ১০ কেজি চালের পরিবর্তে ২০ কেজি কওে চাল দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। করোনাকাল দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য এখনই ধান-চাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর এখনই উপযুক্ত সময়।

বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ও মজুদ ভালো অবস্থায় থাকলেও, চল্লিশ লক্ষ হতদরিদ্র মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম। এইজন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে দেশ-জাতিকে রক্ষা করার জন্য ধান-চাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানো দরকার। তাতে দুর্ভিক্ষ আসলেও তার আঁচ বাংলাদেশ খুব বেশি টের পাবে না। বোরোর ফলন ভালো হওয়াই বড় ধরনের মজুদ গড়ে তোলার সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের।

তাছাড়া এ মৌসুমে বোরো ফলন ভালো হলেও করোনার আঘাত আগামী মৌসুমে ধান-চাল উৎপাদন ব্যাহত হলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যেও ধান-চাল সংগ্রহের পরিমান বাড়ানো দরকার। করোনা পরবর্তীতে খাদ্য পণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার দরকার হতে পারে। ফলে সরকারকে বিগত বছরগুলোর চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ধান-চাল সংগ্রহ করা উচিত। 

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক কৃষি সেবা বিভাগ (ইউএসডিএ) গতবছরই পূর্বাভাস  দিয়েছিল, বাংলাদেশের ২০১৯-২০ অর্থবছরে চাল আমদানি কমে ৫ লাখ টন হবে। কিন্তু গমের আমদানি বেড়ে হবে ৬৩ লাখ টন এবং ভুট্টা আমদানি বেড়ে দাঁড়াবে ২০ লাখ টন। কিন্তু কোন দেশই মহামারির তা-বের সময়কালে এবং পরবর্তীতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা পর্যন্ত  নিজের দেশের নাগরিকদের অভূক্ত রেখে অন্য দেশের নাগরিকদের জন্য খাদ্য সহায়তা করবে না। ইতোমধ্যে খাদ্য রপ্তানিকারক অনেক দেশ খাদ্যপণ্য রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, মিয়ানমার চাল রপ্তানিতে, রাশিয়া ও কাজাখস্তান গম রপ্তানিতে এবং মালয়েশিয়া পামঅয়েল, ইউক্রেন বাকহুইট রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। স্বাভাবিকভাবে অন্য রপ্তানিকারক দেশগুলোও একই পথে হাঁটবে। তবে দেশে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়েছে, তাতে চাল আমদানির প্রয়োজন হবে না। তবে চাহিদা অনুযায়ী গম ও ভূট্টার আমদানি করা যাবে কি না সন্দেহ আছে। এইজন্যেও সরকারের বেশি করে ধান-চাল সংগ্রহ করা সমীচীন হবে।

এছাড়া দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য অথবা বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরুপ অথবা সা¤্রাজ্যবাদি শক্তিকে সন্তষ্টি করার জন্যও অন্য দেশকে খাদ্য সহায়তা দিতে হতে পারে। এইজন্যেও ধান-চাল সংগ্রহ বাড়ানো উচিত। ইতোমধ্যে মালদ্বীপকে ৮৫ টন খাদ্য সামগ্রী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। 

তবে আমন মৌসুমে যে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে, বোরো মৌসুমে তাদের বাদ রেখে অন্য কৃষকদের সুযোগ দিলে ভালো হবে। আবার যাদের কাছ থেকে বোরো কেনা হবে, অন্য মৌসুমে তাদের বাদ রাখা গেলে সকল কৃষকের সমান সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্বাবনা বাড়বে।

ধান-চাল কেনার পাশাপাশি সংরক্ষণের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। খাদ্যশস্য সংরক্ষণের বিদ্যমান ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যেসব প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, সেগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ সাময়িক বন্ধ রেখে ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দ্রুত নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজন অস্থায়ী গুদামের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য বেসরকারি গুদামগুলো সরকারের নিজের অধিকারে নিয়ে ধান-চালের মজুদ গড়ে তোলা যেতে পারে। দেশে বেশ কিছু অব্যবহৃত স্থাপনা আছে, সেগুলোকে সংস্কার করে ধান রাখার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। দেশের সাইক্লোন সেন্টারগুলোকে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায়, সেখানের কয়েকটি কক্ষকেও দুই-তিন মাসের জন্য ধান রাখার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ’ধান ব্যাংক’ ধারণাটাকেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। ধান কিনে পরীক্ষামূলকভাবে সংশ্লিষ্ট কৃষকের  কাছেও রেখে দেওয়া যেতে পারে।
 
মোটকথা এই মহাদুর্যোগের সময়ে খাদ্য সংকট মোকাবেলার জন্য স্বাভাবিক সময়ের মত মুক্তবাজার ব্যবস্থার প্রতি পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে যতটা সম্ভব খাদ্য বাজারকে সরকারের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে হবে। আশা করি, করোনার মহামারি এবং এর প্রেক্ষিতে সৃষ্ট খাদ্য ঘাটতিতে পড়বে না বাংলাদেশ। অভুক্ত থাকবে না এদেশের একটি মানুষও।

লেখক : এস এম খায়রুল বাসার
বিএসএস(অনার্স) এমএসএস(অর্থনীতি)
কলাম লেখক ও অধ্যক্ষ, পল্লীমঙ্গল আদর্শ মহাবিদ্যালয়
ইছামতি, অভয়নগর, যশোর।

পাঠকের মন্তব্য