চুকনগর গণহত্যা : বিশ্বের বৃহত্তম গণহত্যা

চুকনগর গণহত্যা : বিশ্বের বৃহত্তম গণহত্যা

চুকনগর গণহত্যা : বিশ্বের বৃহত্তম গণহত্যা

মোঃ মাহমুদ হাছান : হিংস্র পাক হানাদারেরা ১৯৭১ সালে একই স্থানে একই সময়ে সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটায় খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে, যেথানে ১০,০০০ (দশ হাজার) এরও বেশি মানুষকে ৪ঘন্টার মধ্যে হত্যা করা হয়। 

‘Guerrilla 1971’ নামের ফেসবুকে আইডির (Guerrilla 1971/Post_No_19) “আজ চুকনগর গণহত্যা দিবস” শিরোনামে ১৯.০৫.২০১৫ এর পোষ্টে চুকনগর গণহত্যার বিবরণ সহ ওনার মতামত ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অবহেলার চিত্র তুলে ধরেছেন। এই পোষ্টটির কিছু অংশ নিম্মরূপ

[২০ শে মে, ১৯৭১ চুকনগর। এই ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় গণহত্যাটির স্মৃতি বহন করছে। চুকনগর, আমাদের রক্তাক্ত অর্জনের সব’চে ধামাচাপা দেয়া, করুণ, তীব্র বেদনার ইতিহাস। চুকনগর, চুকনগর, চুকনগর, মগজে গেঁথে নিন আপনারা। রক্তের অনুতে পরিণত করুন চুকনগর নামটি। আমি চুকনগরের শহীদ’দের কথা জানাতে এসেছি। ইতিহাসবিদ আমি নই, যারা ইতিহাস সৃষ্টি করে তাঁদের নাম সেই ইতিহাসে ঠাই পায়নি। মাত্র ৪৪ বছরে ধুলো পড়ে গেল ! এত আত্মত্যাগ এত বীরত্ব এত কান্না সব কিছুই কি বৃথা তবে ?...

"পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যা স্থান পায়নি ইতিহাসে"

“ভিয়েতনামের মাইলাই গণহত্যা” একদিনে সংঘটিত পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যার নাম হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে। মাইলাইতের গণহত্যায় মারা যায় প্রায় ১৫০০ মানুষ। আর চুকনগরে কম করে হলেও গণহত্যার শিকার হয়েছে ১০ সহস্রাধিক মানুষ। তবু পৃথিবীর কোনো ইতিহাসে এই গণহত্যার ঠাঁই মেলেনি। বিশ্ব ইতিহাসের আগে চোখ ফেরানো দরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের 'স্বাধীনতার দলিল' নামে ১৫ খণ্ডে লিখিত দলিল রয়েছে। সেই ১৫ খণ্ডের কোথাও চুকনগরের গণহত্যার স্থান হয়নি। কেন হয়নি ? এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? এভাবে যদি একটার পর একটা ইতিহাস হারিয়ে যেতে থাকে কালের বিবর্তনে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে জানবে, বাঙালির জন্মের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে “মুক্তিযুদ্ধ” নামের একটি মহান অধ্যায়। কিভাবে জানবে তাঁরা নিজ দেশের জন্মের উপাখ্যান?

একদিনে সংগঠিত পৃথিবীর এই ভয়াবহ বৃহত্তম গণহত্যা পৃথিবীবাসী জানে না। পৃথিবীবাসী তো দূরে থাক, স্বাধীনতার দলিলপত্রেও এই গণহত্যার ঠাঁই হয়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম চুকনগর গণহত্যা ৪৪ বছর অতিক্রম করবে এই বছরের (২০১৫এর) ২০শে মে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সেই গণহত্যার স্থান কতটুকু তা আজ বিবেচ্য বিষয়।] 

দৈনিক ইত্তেফাকের ২০মে, ২০১৩এর অনলাইন ভার্সনে পোষ্টকৃত “চুকনগর গণহত্যা দিবস” এ লেখক, গবেষক সুরঞ্জিত বৈদ্য এর ঐতিহাসিক তথ্যের কিছু অংশ নিম্মরূপ

[..১৯৭১ সালের এইদিনে বর্বর পাক-হানাদার বাহিনী চুকনগর বাজারে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার মিলনস্থলে চুকনগর বাজার। এই বাজারের বুক চিরে যশোর-সাতক্ষীরার মহাসড়ক এবং খুলনা সড়ক তখনও পাকা হয়নি। উত্তর পাশ দিয়ে কুলকুল রবে বয়ে চলেছে খরস্রোতা ভদ্রা নদী। আজ থেকে ঠিক ৪২ বছর আগে ১৯৭১ সালের এইদিনে পিরোজপুর, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ ও খুলনার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার সংখ্যালঘু পরিবার পাক-হানাদার এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয়ের উদ্দেশে এই চুকনগর বাজারে এসে যখন জড়ো হয় ঠিক তখনই স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাক-হানাদার বাহিনীর দুটি গাড়ি বাজারে ঢুকে দু'দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত একটানা ৪ ঘণ্টা নিরস্ত্র মানুষগুলোর ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে। ..চারদিকে অগণিত মানুষের লাশ আর রক্তের প্লাবণে প্লাবিত খরস্রোতা ভদ্রাও সেদিন ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতায় স্তম্ভিত। রক্তখেকো শকুনের দল সেদিন কত পরিবারকে যে নিঃস্ব করেছিলো, কত গ্রামকে যে উজাড় করেছিলো সে হিসাবের খতিয়ান খুলতেই আমার মনে পড়ে যায় পাবলো নেরুদার 'ধর্ষিতা দেশ' কবিতার সেই বিখ্যাত পঙক্তিটি- "এই ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত ক্ষত কিছুতে শুকোবার নয়/জয়লাভেও নাঃ /কিছুতে না সমুদ্র-সিঞ্চনে না-/সময়ের সিক্ত সৈকত অতিক্রম করে এলেও না/কবরের মাটিতে জ্বলন্ত জেরেনিয়াম ফুটলেও না।" সেদিনের সে মৃতের সংখ্যা নিয়ে আজও মতভেদ আছে। তবে স্থানীয় অধিকাংশের ধারণা, সে সংখ্যা বিশ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। পৃথিবীর যে কোন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এক জায়গায় এতবড় গণহত্যার নজির খুব কমই দেখা যায়।] 

যায় যায় দিন অনলাইন ভার্সনের ২০.০৫.২০১৪ এর কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতার “আজ চুকনগর গণহত্যা দিবস” শিরোনামের প্রতিবেদনটির কিছু অংশ নিম্মরূপ

[..চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও চুকনগর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম জানান, ১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগর বাজারের পাশে মালতিয়া মাঠে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা হামলা চালিয়ে নির্বিচারে ১০ হাজারের বেশি নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। খুলনা, বাগেরহাটসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯ মে হাজার হাজার মানুষ মালতিয়া বর্তমান চুকনগর ডিগ্রি কলেজ মাঠে জড়ো হয়েছিলেন।  ..২০মে আনুমানিক সকাল ১০টায় সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি গাড়ি চুকনগরের মালতিয়া এলাকায় থামে। গাড়ি থেকে নেমে তারা দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে একটি গ্রামের মধ্যে ঢুকে এবং অন্য গ্রুপটি রাস্তা দিয়ে চুকনগরের দিকে যায়। এ সময় মাঠে আশ্রিতরা কেউ সকালের খাবার শেষ করেছে, আবার কেউ খাচ্ছে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাকহানাদার বাহিনী মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর। একের পর এক লাশ পড়তে থাকে। এলাকায় রক্তের স্রোত বয়ে যায়। গুলির শব্দ শোনার পর অনেকেই এদিক ওদিক ছুটতে থাকে। কেউ বটগাছের শিকড়ে, কেউবা ভদ্রা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আবার কেউবা উঁচু গাছের ডালে উঠে। কিন্তু কেউ বাঁচতে পারেনি। একটা একটা করে মানুষ খুঁজে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সবাইকে হত্যা করা হয়। কয়েক ঘণ্টা চলার পর বিকালের দিকে পাকবাহিনী সাতক্ষীরায় ফিরে গেলে বেঁচে থাকাদের মধ্যে দু'একজন করে মানুষ বের হতে থাকে স্বজনের লাশের খোঁজে।]

ভোরের কাগজ এর অনলাইন ভার্সনের ২০ মে ২০১৬ বাবুল আকতার, এস এম মাহাতাব উদ্দিন ও তৃপ্তি রঞ্জন সেন এর “খুলনা চুকনগর গণহত্যা দিবস আজ” শিরোনামের প্রতিবেদনটির কিছু অংশ নিম্মরুপ-  

[১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ৫ মে দক্ষিণাঞ্চলে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। এ কমিটি গঠন হওয়ার পর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। এ নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে বাগেরহাট, খুলনা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ ও ফুলতলাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাজার হাজার মানুষ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আশ্রয় নেন ডুমুরিয়া থানার চুকনগর এলাকায়। ২০ মে সকাল ১০টার দিকে খাবার খেয়ে চুকনগর বাজার, ভদ্রা নদী, মালতিয়া গ্রামের পাতখোলার মাঠে বিশ্রাম নিতে থাকেন এসব মানুষ। তাদের উদ্দেশ্য দুপুরের দিকে কেশবপুর দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের দিকে রওনা হবে। সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ২টি গাড়ি আসে চুকনগর বাজার, পাতখোলার মাঠে। হানাদাররা সেখানে জড়ো হাজারো নারী-পুরুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে।]


‘উড়া দো, জ্বালা দো, তাবা করদো’ (উড়িয়ে দাও, জ্বালিয়ে দাও, ধ্বংস করো) : চুকনগর জেনোসাইডে কত লোক শহীদ হয়েছিল তার কোন পরিসংখান নেই। পাক পশুদের ভয়ংকর নৃশংস ‘উড়া দো, জ্বালা দো, তাবা করদো’ নীতি এবং অক্ষরে অক্ষরে তার প্রয়োগ এতদূর আতংক সৃষ্টি করেছিল যে তখন স্থানীয় সরকার ও সিভিল প্রশাসন আদৌ কার্যকর ছিলনা। আটলিয়া ইউনিয়নের পাতাখোলার বিল থেকে ভদ্রা নদী এবং সাতক্ষীরা রোড থেকে ঘ্যাংরাইল নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জোড়া বধ্যভূমি থেকে লাশ সরানোর কাজে ব্যস্ত ছিল ওয়াজেদ মিয়া ও আরও ৪০/৪২জন লোক সোমবার দুপুর পর্যন্ত চার হাজার লাশ গুনে শেষপর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয়। এই গননার মধ্যে নদী, পুকুর, ডোবা, জলায় ভাসমান হাজার হাজার লাশ অন্তর্ভুক্ত ছিলনা।…চুকনগর ট্রাজেডি ছিল পাকিদের বিবেকবর্জিত অজস্র হত্যাযজ্ঞের অন্যতম। কিন্তু পাকিস্তানী জেনারেলদের বইতে এর উল্লেখ নেই। আসলে পাকিস্তানীরা ’৭১ সালে তাদের হাতে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে ৩০ লক্ষ মানুষের হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধকে আদৌ স্বীকার করতে চায় না। 

তথাপি কোন কোন সামরিক কর্মকর্তার লেখায় এ ধরণের দু’ একটি ঘটনা কথা অকষ্মাৎ এসে গেছে। এমনই এক ঘটনার কথা লিখেছেন ব্রিগেডিয়ার (৭১এ মেজর) সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেণ্ডার’ বইতে। চুকনগরের এই অপারেশন চালানো হয়েছিল যথাযথ গোয়েন্দা অনুসন্ধান ছাড়াই, এখানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়। তথাপি এ অপরাধে জন্য পাকিস্তানীরা কাউকে বিচারের সম্মুখীন করেনি। কেননা তারা আগেই ফিল্ড অফিসারদের ব্রীফ করেছিল: গো অ্যাহেড, তোমাদের কাজের জন্য কোন প্রশ্ন করা হবেনা। (সূত্র: Guerrilla 1971/Post_No_19 ১৯মে, ২০১৫)

ভদ্রা নদীর পানি হয়ে গিয়েছিল লাল : প্রাণভয়ে মানুষ সেদিন পুকুরে, ডোবায়, ভদ্রাপাড়ের বিশাল ঘন গাবগাছের ডালে পাতার আড়ালে, কালীমন্দিরে, কালীবাড়ির বট গাছের শেকড়ের নিচে বড় গর্তে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল, বাঁচেনি। বটের আড়ালে থাকা মানুষগুলোকে আর্মিরা নৌকা থেকে গুলি করে মারে, গাবগাছের মানুষগুলোকে মারে পাখি মারার মত। সর্বত্র লাশের স্তুপ। দেবীতলার প্রফুল্ল কুমার ঢালীর ভাষায়, ‘সেদিন কত লোক দেখিলাম বলা মুশকিল। আমি ওখানে কয়েক বিঘা এলাকা ঘুরিছি। সব জায়গায় শুধু লাশ আর লাশ। গায়ে গায়ে লাশ। লাশের উপরে লাশ। সব মরি পড়ি আছে। কোথাও পা দেয়ার জায়গা নাই। অনেক সময় লাশ পাড়ায়া যাইতে হইছে। নদীর পাশ দিয়াও অনেক লাশ। নদীর ভিতরেও অনেক লাশ ভাসতিছে। রক্তে চারদিক লাল হয়া গেছে। মাটি-জল সব লাল।’ হত্যাযজ্ঞের ব্যাপকতা সম্পর্কে চুকনগর কলেজের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম (একাত্তরে ১৬ বছরের তরুণ) বলেছেন, গোলাগুলি শুরু হলে অনেকের সাথে তিনিও নৌকায় ভদ্রার ওপারে পালিয়ে যাওয়ার সময় মাঝ নদীতে এক ডুবন্ত মহিলার আর্তনাদ শুনে হাত বাড়িয়েও ভদ্রার প্রবল স্রোতের মুখে তাকে ধরে রাখতে পারেননি। গোলাগুলি থেমে গেলে বিকাল সাড়ে চারটায় চুকনগর বাজারে ফিরে আসেন। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! নদীর পানি রক্তে লাল, চারদিকে শুধু লাশ, হাজার হাজার লাশ। গুলিবিদ্ধ অনেকেই তখনো বেঁচে, অথচ সেবা নেই, চিকিৎসা নেই, ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অসহায়ভাবে। (সূত্র: Guerrilla 1971/Post_No_19 ১৯মে, ২০১৫)

Ethnic Cleansing-‘.. তোমলোগ ঘর যাও, আউর কোই সাচ্চা মুসলমানকো সাদি করো : চুকনগর বহু দূরের নিভৃত এক গঞ্জ, সেখানকার ২০ মে ১৯৭১এর ঘটনাও একই ফর্মুলায় বিচার এড়িয়ে গেছে। তারা অনুসন্ধান করে দেখেনি, সেখানে প্রকৃতই বিদ্রোহীরা ছিল কিনা অথবা বিদ্রোহ প্রস্তুতির কোন ব্যাপার ছিল কিনা। কি তথ্যের ভিত্তিতে তারা পরিকল্পিতভাবে নিরীহ সাদাসিধা পুরুষদের ইতস্ততভাবে অথবা লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করেছিল তা আজো অজানাই রয়ে গেছে। ড. মুনতাসির মামুনের বই ‘চুকনগর গণহত্যা ৭১’ এ বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এসেছে: মেয়েরা স্বামী সন্তান হারিয়ে আর্মিদের বলেছিল, ‘আমাদের বাঁচায়ে রাখছ ক্যান্, আমাদেরও মারো, মাইরা ফ্যালাও।’ আর্মিরা তাদের মারেনি, বলেছিল- ‘নেহি, তোমলোগ ঘর যাও, আউর কোই সাচ্চা মুসলমানকো সাদি করো।’ Ethnic Cleansing’র ধারণা সাধারণ সৈন্যদের পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ’৭১ এ ব্যাপক নারী ধর্ষণের লক্ষ্য’ও ছিল তাই। তারপরেও ’৭১ এ গণহত্যা হয়নি, এমন সাফাই গাওয়ার মত লোক আছে এদেশে! ..খুলনায় হিন্দু নিধন-বিতাড়নের সুত্রপাত হয় ১ এপ্রিলের মাঝরাতে। সাউথ সেন্ট্রাল রোডের চৌমাথার কাছাকাছি মহাদেব চক্রবর্তী, নকুলেশ্বর সাহার দুই পুত্র এবং আরো তিন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয় যাদের পাকি’রা আগের রাতে আলোচনার নামে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এরা সবাই ছিলেন নিতান্তই সাদামাটা মানুষ। এই ঘটনা ভয়াবহ আতংকের জন্ম দেয় এবং করণীয় সম্পর্কে তারা গত কয়েকদিন যে প্রচণ্ড অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন তার অবসান ঘটায়। সন্ধ্যার আগেই শহরের সব হিন্দু বাড়ি পরিত্যক্ত হয়। যারা আজন্মের পৈতৃক ভিটেমাটি ফেলে ভারতে যাওয়ার কথা ভাবেননি, সবাই আশ্রয় নেন নিকটবর্তী গ্রামাঞ্চলের আত্মীয়স্বজন অথবা পরিচিতজনের বাড়িতে। কেননা কেউই তখন ভুলেও ভাবতে পারেননি যে, আগের রাতে ঠাণ্ডা মাথায় ৬ জনের হত্যাকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে পূর্ব বাংলার মাটি থেকে ‘Ethnic Cleansing’ এর নৃশংসতম সূচনা। (সূত্র: Guerrilla 1971/Post_No_19 ১৯মে, ২০১৫)


অমানুষদের হাতে মানুষ চিকন আলী খুনের পর পুত্র এরশাদ খুঁজে পায় ছয়মাসের শিশু সুন্দরী দাসীকে : পাক আর্মিরা আসে সাতক্ষীরা থেকে জীপ ও ট্রাকে। তাদের সাথে সাদা পোষাকে মুখঢাকা লোকজনও আসে। কেউ তাদের সনাক্ত করার সুযোগ পায়নি। যারা তাদের সরাসরি দেখেছিলেন মালতিয়া গ্রামের বৃদ্ধ চিকন আলী মোড়ল ও সুরেন কুণ্ডু মুহূর্তেই গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। চিকন আলী মিয়ার হাতে কাস্তে ছিল, তিনি মাঠে কাজ করছিলেন, তার অপরাধ ছিলো, তিনি চেঁচিয়ে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। সুরেন কুণ্ডুর গলার রুদ্রাক্ষের মালা তাঁকে হিন্দু চিহ্নিত করে দিয়েছিল। (সূত্র: Guerrilla 1971/Post_No_19 ১৯মে, ২০১৫)

মালতিয়া গ্রামের অধিবাসী এরশাদ আলী মোড়ল জানান, বাবা চিকন আলী মোড়লের লাশ দেখে একটু সামনে গেলেই হাজারো লাশের স্তুপ চোখে পড়ে। সেখানে নিহত লাশের ওপর মায়ের দুধ পান করছিল ৬ মাসের এ শিশুটি। (সূত্র: ভোরের কাগজ এর অনলাইন ভার্সনের ২০ মে ২০১৬ বাবুল আকতার, এস এম মাহাতাব উদ্দিন ও তৃপ্তি রঞ্জন সেন)

চুকনগর গণহত্যা ও রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতা : মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি টানা ৮বছরের উপর ক্ষমতায়। চুকনগরে ৭১এ সবচেয়ে বড় গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিলো এ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের কর্ণধারদের অবহিত করা হয়েছিলো। কিন্তু, রাষ্ট্র কি কর্তব্য পালন করেছে? ভোরের কাগজ এর অনলাইন ভার্সনের ২০ মে ২০১৬ বাবুল আকতার, এস এম মাহাতাব উদ্দিন ও তৃপ্তি রঞ্জন সেন এর “খুলনা চুকনগর গণহত্যা দিবস আজ” শিরোনামের প্রতিবেদনটির কিছু অংশ নিম্মরুপ-

[…চুকনগরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১০ হাজার নিরীহ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একসঙ্গে একই স্থানে এত লোককে হত্যা করার এ ঘটনা ছিল ইতিহাসে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতম, বর্বর ও বৃহৎ হত্যাকান্ড। দীর্ঘ ৪৫ বছর পার হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ১৫ খন্ডের দলিলের পাতায় আজো লেখা হয়নি চুকনগর গণহত্যার ইতিহাস। স্বীকৃতি দেয়া হয়নি শহীদদের সন্তানদের। বধ্যভূমিতে পূর্ণাঙ্গ একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলেও ৩ বছর ধরে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে। চুকনগর গণহত্যা ’৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম জানান, আমাদের ৫ দফা দাবি আজো পূরণ হয়নি। আজো চুকনগর রয়েছে অবহেলিত। তিনি জানান, ২০০৯ সালের ২০ মে গণহত্যা দিবসের স্মরণসভায় জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলীর কাছে চুকনগরে বৃহত্তম গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ পৃথকভাবে তৈরিসহ ৫ দফা দাবি পেশ করে স্মৃতি রক্ষা পরিষদ। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল-বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ১৫ খন্ডের দলিলে চুকনগর গণহত্যার ইতিহাস যথাযথভাবে উল্লেখ করা, বধ্যভূমিতে জাদুঘর, লাইব্রেরি, কমপ্লেক্স নির্মাণসহ এখানে পর্যটন এলাকা গড়ে তোলা ও কেয়ারটেকার নিয়োগ, ২০ মে-কে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনে সরকারি ঘোষণা প্রদান এবং চুকনগর বাজার থেকে বধ্যভূমি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ।]

(তরুণদের প্রতি আবেদন : একটিবার হলেও যাও না চুকনগর। “সেই চুকনগর, ছুই ঝাল দিয়ে খাসীর মাংস রান্না হয় হোটেলে”, এ গল্পটি শুনেছো সমাজের ছুতিয়া শীলদের কাছে, কিন্তু কোন ছুতিয়া শীল বলেনি তোমায়, চুকনগরে দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলো একসাথে, শুনে আসো না প্রত্যক্ষদর্শী কারো কাছে। 

সঙ্কলনে: মো: মাহমুদ হাছান (১৯৮২-৯০এর সামরিক শাষণ বিরোধী আন্দোলনের রাজপথের সৈনিক, ভূতপূর্ব কলেজ অধ্যক্ষ ও সমাজ গবেষক), ঢাকা, তারিখ, ২৩শে এপ্রিল, ২০১৭, সময়: ভোর ০৩.২০ মিনিট। 

পাঠকের মন্তব্য