ববিতারাই এখনও চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল সময়ের মধুর স্মৃতি

ফজলুল বারী

ফজলুল বারী

ফজলুল বারী : শিশুশিল্পী হিসেবে ‘সংসার’ ছবি দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন ববিতা। পুরো নাম ফরিদা আখতার পপি। গেন্ডারিয়ার মনিজা রহমান গার্লস হাইস্কুলে পড়তেন। রাজ্জাক ও ববিতাকে নিয়ে জহির রায়হান তৈরি করেন চলচ্চিত্র ‘শেষ পর্যন্ত’।

এটিই নায়িকা হিসাবে ববিতার মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি। জহির রায়হান ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি। এরপর থেকেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এ নক্ষত্রের উত্থান। মুক্তিযুদ্ধের সময় জহির রায়হান বানাতে শুরু করেছিলেন স্টপ জেনোসাইড।

ছবিটি তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। দেশ স্বাধীন হবার পর অভিভাবক জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে হারিয়ে গেলে সংকটের মুখে পড়ে। কিন্তু তখন নিবিড় কিছু কাজ তাঁকে হারিয়ে যেতে দেয়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর নারায়ন ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘আলোর মিছিল’ নামের একটি ছবি সুপার ডুপার হিট হয়। রাজ্জাক-সুজাতা ছবিতে থাকলে ববিতা সেখানে ছবির মূখ্য চরিত্র। ছোট মামা ছোট মামা বলে তাঁর চা বানিয়ে চা-গরম বলে বলে বাড়ি ঘুরে বেড়ানো, হারমনিয়াম টেনে ধরে ‘এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে আর ঝরে গান গাওয়া’ গানটি মানুষের মন কাড়ে।

অবশেষে ছবির শেষ দৃশ্যে কালোবাজারি বড়মামা খলিলের গুলিতে তাঁর মৃত্যুদৃশ্যে দর্শক চোখের পানি আটকাতে পারেননি। সুভাষ দত্ত ববিতাকে নায়িকা করে বানান মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘অরুনোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী’।

‘আবার তোরা মানুষ হ’ সহ নানা ছবির গুনে ববিতাও হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্র তারকা। শহুরে নাগরিক চরিত্রে তিনি হয়ে ওঠেন অনেকের স্বপ্নকুমারী। এরমাঝে একটি ঘটনা ববিতার জীবন বদলে দেয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কলকাতার ছবির পাড়ার মানুষজনের বাংলাদেশে যাতায়াত বাড়ে। তাদের কারও কারও জন্ম এদেশে। গৌতম ভট্টাচার্য নামের একজন সিনে ফটো সাংবাদিকও তখন ঢাকায় এসে ববিতার কিছু ছবি তুলে নিয়ে যান। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করতেন গৌতম। ববিতার ছবিগুলো তিনি সত্যজিৎ রায়কে দেখান। ছবিগুলো দেখে ববিতার তাঁর অশনি সংকেত ছবির অনঙ্গ বৌ চরিত্রের জন্যে নির্বাচিত করেন সত্যজিৎ রায়।

ববিতাকে তিনি চিঠি লিখলেন, ‘চুল কাটবেনা এবং মোটা হবেনা’। কলকাতার মিডিয়াকে সত্যজিৎ জানালেন ‘আমি আমার অনঙ্গ বৌকে খুঁজে পেয়েছি। এই অনঙ্গ বৌকে আমি ষোল বছর ধরে খুঁজছিলাম’।

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কাজ করার সুযোগ পাওয়া তখন একটি গৌরবের ব্যাপার। তাই ববিতাকে নিয়ে হৈচৈ শুরু হয়ে যায় দুই বাংলায়। ছবির কাজ শুরু হয়।

যথারীতি সত্যজিৎ রায়ের অন্যসব ছবির মতো এ ছবির নায়কও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। চুয়াল্লিশের দূর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে ছবি। মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে ‘অশনি সংকেত’ ছবিটি পুরষ্কৃত হয়। সত্যজিতের সঙ্গে তখন মস্কো যান ববিতা। তাঁর নামের পাশে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন নায়িকার তকমা লাগে। সেই থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বানিজ্যিক ও শিল্পমান সম্মত ছবির অনিবার্য চরিত্র হয়ে ওঠেন ববিতা।

রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-শাবানা, আলমগীর-শাবানা জুটির তখন জয়জয়কার। পাশাপাশি রাজ্জাক-ববিতা, ববিতা-জাফর ইকবাল, ববিতা-ফারুক, ববিতা-বুলবুল আহমদ, ববিতা-ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিগুলোও জনপ্রিয়তা পায়।

ববিতা-জাফর ইকবাল জুটি নিয়ে প্রেমবিরহের নানা কাহিনী হয়েছে। রাজ্জাক তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘অনন্ত প্রেম’এর নায়িকা করেন ববিতাকে। সে ছবিতে তখন প্রথম চুম্বন দৃশ্য সংযোজন নিয়ে অনেক হৈচৈ হয়। আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নাম্বার তৈলচিত্র’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘বসুন্ধরা’ ছবিটি বানান সুভাষ দত্ত। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। এ ছবির জন্যে ববিতা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পান।

মিতার 'লাঠিয়াল', আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র ‘নয়নমনি’, ‘সুন্দরী’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এসব ছবির নায়িকা ববিতা একের পর এক জাতীয় পুরষ্কার পেতে থাকেন। জাতীয় পুরষ্কার পাওয়াটা তাঁর এক রকম অভ্যাসে পরিনত হয়।

চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের সংগঠন ‘বাচসাস’এর পুরষ্কার কন্যা হিসাবেও তাঁর নামডাক হয়। আবার ইবনে মিজানের মতো বাজার কাটতি পরিচালকের ‘নিশান’, ‘এক মুঠো ভাত’এর নায়িকাও ছিলেন ববিতা। ববিতাকে ‘লাইলি’, রাজ্জাককে ‘মজনু’ করে বানানো হয় ‘লাইলি মজনু’। আরেক ইতিহাসখ্যাত প্রেমের ছবি ‘আনারকলি’র নায়িকাও ববিতা। তখন যৌথ প্রযোজনার ছবির পরিকল্পনা হলেই ববিতার ডাক পড়তো।

এমন একটি ছবি ‘দূরদেশ’ বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে হৈচৈ ফেলে। এখনও অনেকে গুনগুন করে সে ছবির গানটি গান, ‘যেও না সাথী, চলেছো একলা কোথায়’। ‘লাভ ইন সিঙ্গাপুর’, ‘নেপালি মেয়ে’ এসব ছবির নায়িকাও ববিতা।

রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ববিতা, ফারুক, আলমগীর সহ অনেক জনপ্রিয় তারকার বয়স হয়ে যাওয়া, জাফর ইকবালের অকালমৃত্যু, প্রযুক্তির পরিবর্তন সহ নানা কারনে বাংলাদেশের সিনেমার জগত দিনে দিনে জনপ্রিয়তা হারায়। তাদের পর যারা ছবির জগতে এসেছেন তারা এখানে থিতু হতে পারেননি। অথবা জনপ্রিয়তা ধারন করতে পারেননি। সালমান শাহ এক পর্যায়ে অনেক দর্শককে সিনেমার হলে ফেরত নিয়েছিলেন।

কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পথ হারিয়ে ফেলে। এরপর আর কেউ নতুনপথের সন্ধান দিতে পারেনি। ববিতারাই তাই এখনও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল সময়ের মধুর স্মৃতি।

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক :  ফজলুল বারী 

পাঠকের মন্তব্য