“রংপুরের টারিকাহিনী”

“রংপুরের টারিকাহিনী”

“রংপুরের টারিকাহিনী”

কামারটারি : বর্তমান কামার পাড়ার নাম আগে ছিল কামারটারি। লোহা লক্কড়ের কাজ করা কামারদের কারণে কামার টারি। তবে ঐ অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও কামারটারি নামটাই প্রচলিত আছে।

খড়িয়াটারি : খড়ির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঐ অঞ্চলের নাম হয়ে যায় খড়িয়াটারি, যা বর্তমানে আদর্শ পাড়া। ১৯৮২ সালে ঐ পাড়ায় একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় “আদর্শ যুব সংঘ” নামে। সেই ক্লাবের উদ্যোগেই খড়িয়াটারি নাম পাল্টিয়ে করা হয় নিউ আদর্শ পাড়া। এবং পাড়ার ভিতরে কয়েকটি দেয়ালে নিউ আদর্শ পাড়া লিখে রাখে ক্লাবের সদস্যরা। এই লেখা আমি নিজেও দেখেছি। সেই নিউ আদর্শ পাড়াই এখনকার আদর্শ পাড়া।

আকালীটারি : আকালী (মরিচ) ব্যবসায়ীদের বাস এবং ঐ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকার নাম হয়ে যায় আকালীটারি, যা বর্তমানে কলেজ রোড হাবিব নগর। এই হাবিব নগর নামকরণ খুব বেশী দিনের নয়। আদর্শ পাড়া নাম পরিবর্তন করায় পার্শ্ববর্তী পাড়া হিসেবে ঐ পাড়ারও নাম পরিবর্তন করে স্থানীয়রা। আকালীটারি হয়ে যায় হাবিব নগর। তবে খড়িয়াটারি, কামারটারির মতো এই পাড়ার এবং আশে পাশের আদি বাসিন্দাদের মুখে এখনও আকালীটারি নাম শোনা যায়।

পানাতিটারি : নিউ সেন পাড়া সংলগ্ন এলাকায় ছিল পানের ব্যবসা ও পান ব্যবসায়ীদের নিবাস। ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের ছোঁয়া রংপুরেও গেলেছিল যার প্রমাণ পাওয়া যায় নগরীর মূল সড়কের সালেক পাম্প এলাকা থেকে সম্প্রতি মুন্সীপাড়ায় স্থানান্তরিত সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম শহীদ ওয়ালীদাদ মোহাম্মদ এর করব থেকে। ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধাচরণ করায় নিজ এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে ছদ্ম নামে রঙমহলের (বর্তমান রংপুর শহর) সেন পাড়ার পাশে বসতি স্থাপন করেন সিপাহী বিদ্রোহের দুই সমর্থক। সেখানেই তাঁরা শুরু করেন পানের ব্যবসা। এই পানের ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই ঐ অঞ্চলের নাম হয়ে যায় পানাতিটারি, যা বর্তমানে করঞ্জাই রোড। ঐ পাড়ার জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তি করঞ্জাই বাবুর নামানুসারে করঞ্জাই রোডের নামকরণ হয়।

গুড়াতিটারি : গুড় ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঐ অঞ্চলের নাম হয়ে যায় গুড়াতিটারি। আজ থেকে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগে এই নামেই পরিচিত ছিল ঐ অঞ্চল। পরে যা গুড়াতিপাড়া নাম ধারণ করেছে। তবে অন্যান্য টারিগুলোর তুলনায় অনেক পূর্বে গুড়াতিটারি নাম ধারণ করেছে গুড়াতিপাড়া।

চকেরটারি : কারমাইকেল কলেজের পূর্ব পাশের মহল্লায় উৎপাদিত হতো “চক”। আর এই কারণেই ঐ অঞ্চলের নাম হয়ে যায় চকেরটারি, যা বর্তমানে চকবাজার, আশরতপুর নাম ধারণ করেছে। আজ থেকে ২৫ বছর পূর্বেও চকেরটারি নামেই পরিচিত ছিল আজকের মেস এলাকা আশরতপুর।

গাড়িয়ানটারি : জেলা প্রশাসকের বাসভবন থেকে কেরানী পাড়া পুলিশ সার্কেল অফিসের সামনে দিয়ে একটু দক্ষিণে গেলে যে চৌরাস্তা মোড়, সেই মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে যে রাস্তাটা গেছে ঐ এলাকার নাম গাড়িয়ানটারি। ওখানে ভাড়ায় গরুর গাড়ী পাওয়া যেতো বলেই এমন নামকরণ। এখনো অনেকেই ঐ চৌরাস্তা মোড়টাকে গাড়িয়ানটারি মোড় বলে থাকে।

নাউয়াটারি : নগরীর প্রায় প্রাণকেন্দ্রেই নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়ার অবস্থান। সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছন দিকে এই মহল্লার নাম কিন্তু এক সময় নাউয়াটারি ছিল। কেননা সেখানে ছিল নরসুন্দরদের আবাস। তবে অনেক অনেক দিন আগের থেকেই এই নাউয়াটারি ইঞ্জিনিয়ার পাড়া নাম ধারণ করেছে। এখনও নাউয়াটারি শব্দটা ব্যবহার হয়, তবে তা ঠাট্টা করে।

বালাটারি : কারমাইকেল কলেজের উত্তরে বাবুখাঁ সংলগ্ন মহল্লাটার নাম বালাটারি। এলাকাটির জমিতে বালির আধিক্যের কারণে বালাটারি নামকরণ হয়েছে এটা অনুমান করা যায়। স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় বালিকে বালা বলা হয়। তাছাড়া এই নামকরণের ব্যাপারে প্রাচীন ও বয়স্ক ব্যক্তিগণ একই ধারণা পোষণ করেন। এখনও বালাটারি নামটা চালু আছে।

শ্যাখটারি (শেখটারি) : মডার্ন মোড় সংলগ্ন (মডার্ন মোড়ের পশ্চিম দিকের মহল্লার নাম আজও শ্যাখটারি। জানা যায় জনৈক শেখ সাহেবের নামানুসারে হয় শ্যাখটারি। কিন্তু কোন শেখ সাহেব তা জানতে পারিনি। কেউ যদি জানেন তাহলে জানাবেন।

খলিফাটারি : আরকে রোডের পশ্চিমে একটা মহল্লা এখনও খলিফাটারি নামেই পরিচিত। অনুমান করা যায় যে দর্জিদের আবাস হওয়ার কারণে এমন নাম হয়েছে। তবে আমি নিশ্চিতভাবে জানিনা এই নামকরণ কেন হয়েছে। কেউ জানলে জানাবেন।

বাদিয়াটারি : শাপলা চত্বর থেকে বাস টার্মিনাল যাওয়ার পথে অবস্থান হাজী পাড়ার। স্থানটি চামড়া ব্যবসায়ের জন্য বিখ্যাত এই এলাকাটিতে ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের (বাদিয়া) নিবাস। সেই কারণেই পূর্বে এই এলাকার বাদিয়াটারি নাম ছিল যা পরিবর্তিত হয়ে বাদিয়াপাড়া ও তারও পরে হাজী পাড়া নাম ধারণ করেছে।

এমন আরও কিছু টারি থাকতে পারে যা এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে না। এছাড়া বর্তমান রংপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় আবাসিক এলাকা ধাপের নাম পূর্বে ছিল মর্তুজানগর। তেমনি মাহীগঞ্জ থেকে নবাবগঞ্জ, রাধাবল্লভ কেন্দ্রীক বর্তমান রংপুর শহরের পত্তনের সময় তৎকালীন রংপুরের মুসলিম শিক্ষিত সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা যে স্থানটি আবাস গড়ে তোলেন সেই মুন্সীপাড়ার নাম পূর্বে ছিল নৌসেরাবাদ। মুলাটোলের নাম আগে ছিল মোগলটুলি, সেটা ক্রমেই বিবর্তিত হয়ে হয়েছে মুলাটোল।

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : Riyadh Anwar Shubho

পাঠকের মন্তব্য