নিজামীর এলাকার পাইকরহাটির নাম ১৯৭১-এ পরিবর্তিত হয়ে শহীদনগর

নিজামীর এলাকার পাইকরহাটির নাম ১৯৭১-এ পরিবর্তিত হয়ে শহীদনগর

নিজামীর এলাকার পাইকরহাটির নাম ১৯৭১-এ পরিবর্তিত হয়ে শহীদনগর

মোঃ মাহমুদ হাছান : ১৯৭১ সালে মইত্যা রাজাকার (ফাঁসির দন্ড কার্যকর হওয়া মতিউর রহমান নিজামী) এর এলাকা- পাবনা জেলার সাথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর ইউনিয়নের বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়ক সংলগ্ন পাইকরহাটি গ্রামটির নাম পরিবর্তিত হয়ে শহীদনগর হয়ে যায়।

বৃহত্তর পাবনা জেলার (পাবনা ও সিরাজগঞ্জ মহকুমার) প্রতিরোধ যুদ্ধ-পাইকারহাটি পর্ব

মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাবনা ও সিরাজগঞ্জ মহকুমার অধিকাংশ এমএনএ ও এমপিএ আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যুনিষ্ট পার্টি, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীবৃন্দ ও সাধারন মানুষকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। এ অঞ্চলে একটি বিশাল ইতিবাচক দিক ছিলো, পাবনার জেলা প্রশাষক এম নূরুল কাদের খান ও সিরাজগঞ্জের মহকুমা প্রশাষক শামছুদ্দিন আহমেদ এবং এখানকার অধিকাংশ পুলিশ মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১লা মার্চ, ১৯৭১ হতে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। যার দরুন, পাকবাহিনী পাবনা জেলা শহরে ২৫শে মার্চ রাতে প্রবেশ করেও বীর বাঙ্গালীর প্রতিরোধ যুদ্ধে ৫ দিনে পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

পরবর্তীতে, ঢাকা হতে আরিচা ঘাট হয়ে পাবনা ও উত্তরবঙ্গে প্রবেশের জন্য পাক হানাদার বাহিনী মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলো জল, স্থল ও আকাশপথে। মুক্তিযোদ্ধাদের দু’টি অংশ নগরবাড়ি ও শাহজাদপুর হতে এসে কাশিনাথপুরের ১০ কিলোমিটার উত্তরে পাইকরহাটির ডাব বাগানে এসে সেখানে অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল শক্ত রাখা এবং ডাব বাগানের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার জন্য ট্রাকযোগে কিছু খাদ্যসামগ্রী, অস্ত্র, গুলি ও লোকবল নিয়ে সিরাজগঞ্জের এসডিও সামসুদ্দীন আহমেদ ও এমপিএ আ: রহমান ডাব বাগানে পৌঁছেন। সেখানে গিয়ে তারা ট্রাকযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাশিনাথপুরে স্থাপিত পাকবাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনাটি ট্রাক ড্রাইভারের মন:পুত না হওয়ায় সে কৌশলে গোপনে ট্রাকের ইঞ্জিনে যান্ত্রিক ত্রুটি তৈরি করে রাখে। সেদিন বারবার চেষ্টা করেও ট্রাকের ইঞ্জিন চালু করা যায়নি। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামবাসীর সহায়তায় বগুড়া নগরবাড়ী মহাসড়কের পাইকরহাটি ব্রিজের কাছে বৃহৎ অংশ কেটে মহাসড়ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। গ্রামের মধ্যে মহাসড়কের পশ্চিমপাড়ে জগৎ বিশ্বাসের বাড়ীর পাশের ডাব বাগান ও পুকুর পাড়ে এবং মহাসড়কের পূর্বপাড়ের জনবসতির বাড়িগুলোতে বাংকার তৈরী করে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু বিধি বাম ! 

১৯শে এপ্রিল ১৯৭১, দুপুর। মুক্তিযোদ্ধাদের যে গ্রুপ যে অবস্থানে ছিল সেখানে দু’একজনকে সশস্ত্র পাহারা বসিয়ে সবাই খাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ গোসল সেরে খাবার খেতে বসেছেন, কেউ গোসল করতে পুকুরের পানিতে নেমেছেন, কেউ নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন সময় পাকবাহিনী একাধিক কনভয় ও জিপ গাড়ী নিয়ে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। দালালদের সহায়তায় তারা মাঠের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ক্যাম্পগুলো ঘিরে ফেলে। প্রায় ৪ ঘন্টা ব্যাপী এ প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে। এ যুদ্ধে আত্মাহুতি দেন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসী। আহত হয় কয়েক’শ নিরপরাধ মানুষ। যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কেউ বাংকারের মধ্যে, কেউবা গ্রামের বাইরে বিভিন্ন স্থানে এমনকি মাঠের মধ্যেও লাশ পড়ে থাকে। ঐ যুদ্ধে পাকবাহিনীর একটি কনভয় ও একটি জীপ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পাকবাহিনীরও বেশ কিছু হতাহত হয়। এ যুদ্ধে পাকবাহিনী কিছু সময়ের জন্য পিছু হটে। জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে স্থান ত্যাগ করে দূরবর্তী গ্রামে আশ্রয় নেয়। পাকবাহিনী শক্তি সঞ্চয় করে সন্ধ্যায় বিনা বাঁধায় পুনরায় গ্রামে হামলা চালায়। নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয় ডাব বাগান, পার্শবর্তী গ্রাম রামভদ্রবাটি, কুড়িয়াল, সাটিয়াকোলা ও বড়গ্রাম। চালায় এক বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ। রাতভর পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে কাশিনাথপুর ক্যাম্পে ফিরে যায়। 

সাটিয়াকোলার কুখ্যাত দালালেরা

ওইদিন পাকবাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল সাটিয়াকোলা গ্রামের আব্দুল বাছেদ ও বড় গ্রামের কোকিল মুন্সি। এরা দু’জন পাকবাহিনীর দালাল ছিল। 

পাইকরহাটি ডাববাগান যুদ্ধের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধারা

সকালের দিকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া গ্রামবাসী একজন দু’জন করে গ্রামে ফিরে আসতে থাকে। তারা এলোপাথাড়ি পড়ে থাকা মানুষের লাশ ও পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া বাড়িঘর দেখে হতাশ হয়ে পড়ে। তারা প্রথমেই মৃত লাশগুলোকে যেখানে যে অবস্থায় পড়েছিল সেখানে গণকবর দিতে থাকে। নিজেদের তৈরী বাংকারে ঠাঁই মেলে চেনা অচেনা মুক্তিযোদ্ধাদের। ডাব বাগান এবং বাঘাবাড়ী প্রতিরোধ যুদ্ধে যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন সেই এসডিও সামসুদ্দিন সাহেবকে পরবর্তীতে পাকবাহিনী ১৫ মে ১৯৭১ নির্মমভাবে হত্যা করে পতিশোধ নেয়। তিনি শহীদদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। ডাব বাগানের নেতৃস্থানীয় দুই হাবিলদার মোঃ আকবর আলী (শান্তিডাঙ্গা, কুষ্টিয়া) ও আব্দুল আলী (নোয়াখালী) আহত হয়েছিলেন। দুজনই ইপিআর ৭ উইং নওগাঁর সদস্য ছিলেন। আহত হাবিলদার আকবর আলী পরবর্তীতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের যে লাশগুলো সনাক্ত করেছিলেন তারা হলেন, হাবিলদার মোঃ এমদাদ আলী (পাবনা), নায়েক মোঃ মফিজউদ্দিন (ঢাকা), নায়েক মোঃ গোলান আনজাতোন (কুষ্টিয়া), ল্যান্স নায়েক মোঃ সালেহ আহমেদ (নোয়াখালী), সিপাহী মোঃ নুরউদ্দিন (বরিশাল), সিপাহি ইলিয়াস (রাজশাহী), সিপাহি আবু হোসেন (রাজশাহী), সিপাহি রফিকুল ইসলাম (রাজশাহী), সিপাহি আবুল কাশেম (রাজশাহী), সিপাহি ইদ্রিস আলী (রাজশাহী), সিপাহি নেফারুল হক (রাজশাহী), সিপাহি আমির হোসেন (রাজশাহী), সিপাহী মোঃ সাইবুর রহমান (রাজশাহী), সিপাহী গোলাম মোস্তফা (সিলেট), সিপাহী আব্দুর রাজ্জাক (যশোর), সিপাহী রমজান আলী (যশোর), বাদবাকি অচেনা লাশ সনাক্ত করা যায়নি। স্থানীয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের যে লাশ সনাক্ত করা হয়েছিল তারা হলেন, ডাঃ আফাজ উদ্দিন (সমাশনারী, সাথিয়া), ইমান (মহিষখোলা, সাথিয়া), জগৎ নারায়ন বিশ্বাস (পাইকরহাটী, সাথিয়া), আ: লতিফ (সাথিয়া), পিয়ার মন্ডল (সাথিয়া), কাজেম প্রামানিক (সাথিয়া), মহর পাগল (পাইকরহাটি, সাথিয়া), জাকের আলী শেখ (সাথিয়া), সন্তোষ (সাথিয়া), শাহজাহান বিএসসি (সৈয়দপুর, সুজানগর), সৈয়দ আলী (আতোপসোভা, সাথিয়া), বাদবাকিদের সনাক্ত করা যায়নি। সনাক্ত করা না গেলেও তারা আজো চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন পাইকরহাটি ডাব বাগানের (শহীদ নগরের) এই রক্তস্নাত মাটিতে। ঐ যুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ৭০ জন সৈন্য নিহত হয়েছিল। ‘স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে এ যুদ্ধের ঘটনা প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে বীর শহীদদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ওই গ্রামের অংশবিশেষ শহীদনগর নামকরণ করা হয়। 

পাইকরহাটি ডাববাগান মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলগত স্থান-সহযোগিতা ও গাদ্দারি

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর জেলা, মহকূমা, থানা শহরগুলোতে এমনকি গ্রাম-গঞ্জেও পাকবাহিনীর সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ছাত্র-জনতার সম্মিলিত পূর্বপ্রস্তুতি চলতে থাকে। প্রতিরোধের প্রধান শর্ত ছিল, “যে কোনমূল্যে পাকহানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হবে। নিজ নিজ এলাকাকে স্বাধীন ও মুক্ত রাখতে হবে।“ ছাত্র-জনতা বাঁশের লাঠিকেই রাইফেল মনে করে শুরু হলো প্রশিক্ষণ। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকহানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে রাজধানীর ঢাকায় পরিচালনা করে ইতিহাসের বিভীষিকাময় জঘণ্য হত্যাযজ্ঞ। চারিদিকে গুলির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে ঢাকাবাসী দেখেন রাতের অন্ধকার ভেদ করে আকাশ জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে প্রজ্জলিত গোলাগুলি আর দাউ দাউ করে জ্বলছে বস্তি এলাকার কাঁচা বাড়িঘর। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ও তার চত্বর এবং রাজধানীর রাস্তাঘাট ও অলিগলি লাশের স্তুপে ভরে যায়। ঘুমের মধ্যেই শহীদ হয়ে যান হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষ। জানতেও পারেন না কি ছিল তাদের অপরাধ। শুরু হয় মূমূর্ষু পাকিস্তানের দ্বিখন্ডিত হওয়ার শেষ দৃশ্য, শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেয়ার প্রসব বেদনা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, গ্রেফতার, ঢাকার ক্রাকডাউন/ম্যাসাকার এবং সারা বাংলাদেশে পাকবাহিনী মুভ করছে এ খবর টেলিগ্রাম টেলিফোন ও অয়্যারলেস মেসেজ মারফত ২৫শে মার্চ রাতেই অনেক জেলা, মহুকূমা, থানা সদর ও ইপিআর ক্যাম্পগুলোতে পৌঁছে যায়। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ সকাল ৮ টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার তার বার্তাটি (ডিকোড ম্যাসেজ) শাহজাদপুরে পৌঁছেছিল। তারবার্তাটি পাওয়ার পরপরই ওসি আব্দুল হামিদ শাহজাদপুর এলাকা থেকে নির্বাচিত এমপিএ আব্দুর রহমানকে তার কপি প্রদান করেন। তাৎক্ষনিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার ঐ বার্তাটি বাংলায় অনুবাদ করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়। তারবার্তার সূত্র ধরে ২৬শে মার্চ এলাকার নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, গণপরিষদ সদস্য ও আওয়ামীলীগ দলীয় নেতৃস্থানীয়দের শাহজাদপুর থানায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। সকাল ১০ দশটার দিকে সেখানে উপস্থিত হন সিরাজগঞ্জ-৭ এলাকা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য আব্দুর রহমান এবং নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে আবুল চৌধুরী। অনেক বেলায় আসেন নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য সৈয়দ হোসন মনছুর, এর অনেক পরে আসেন সিরাজগঞ্জ-৬ এলাকা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য লে. কমান্ডার (অবঃ) মাহবুবুল ইসলাম খোকা। থানায় অনুষ্ঠিত নেতৃবৃন্দের আলোচনায় সিন্ধান্ত নেয়া হয় এই মুহুর্তে সেনাবাহিনীর গতিপথ বন্ধ করে দেযার জন্য বাঘাবাড়ীর বড়াল নদীর ফেরী পারাপার বন্ধ করে দিতে হবে। সিন্ধান্ত মোতাবেক বাঘাবাড়ীতে গিয়ে ফেরিচালকদের ফেরি নিয়ে দূরবর্তী কোথাও চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তারা ফেরি নিয়ে ডেমরার দিকে চলে যায়। 

কিছুক্ষণ পর পুনরায় বসার সিন্ধান্ত হয়। সৈয়দ হোসেন মনছুর ৫০০ কর্মি নিয়ে আসার কথা বলে বাসায় ফিরে যান। পুনরায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিবৃন্দ, প্রশাষনিক কর্মকর্তারা ও রাজনৈতিক নেতারা থানায় মিলিত হলে সেখানে সৈয়দ হোসেন মনছুর ও লে. কমান্ডার (অবঃ) মাহবুবুল ইসলাম খোকা আর আসেননি। মাহবুবুল ইসলাম খোকা যাওয়ার সময় ঠাট্টা করে বলে যান “আপনারা যুদ্ধ করবেন পাকবাহিনীর সঙ্গে? আমি তাদের ফায়ারিং পাওয়ার জানি, আপনারা জানেন না।” এরপর থেকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাস তাদের দু’জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে জানা গিয়েছিল, তারা দু’জনই পাকবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

২৬শে মার্চ বিকেলেই রবীন্দ্র কাছারিবাড়ীর ঐতিহাসিক বকুলতলায় অনুষ্ঠিত জনসভায় এলাকাব্যাপী সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিন্ধান্ত হয়। ঐ জনসভায় গণপরিষদ সদস্য আব্দুর রহমান, চাটমোহর-ফরিদপুর থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য আবু ইউছুপ মিয়া, আব্দুল লতিফ খান, ছাত্রনেতা আব্দুল গফুর সরবত, গোলাম আজমসহ অন্যান্য নেতাকর্মিরা উপস্থিত ছিলেন। ২৭শে মার্চ সিরাজগঞ্জের মহকূমা প্রশাসক সামসুদ্দীন সাহেব শাহজাদপুরে এসে স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এক সভায় মিলিত হলেন। যেহেতু পাকবাহিনী ঢাকা থেকে বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে সড়ক পথে আসার একমাত্র রাস্তা আরিচা-নগরবাড়ী ঘাট ও বড়াল নদীর ফেরিঘাট সে কারনে এ দুটি স্থানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিন্ধান্ত নেয়া হয়। এর মাঝে বিভিন্ন জায়গা থেকে পিছিয়ে আসা সশস্ত্র ও নিরস্ত্র ইপিআর এবং পুলিশবাহিনীর সদস্যরা বিচ্ছিন্নভাবে বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী ঘাটে জমায়েত হতে থাকে। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত অস্ত্র ও বগুড়া আড়িয়ার বাজার ক্যান্টনমেন্ট থেকে আনা অস্ত্রগুলি নিরস্ত্র ইপিআর, পুলিশ ও ছাত্রজনতার সম্মিলিত বাহিনীর মাঝে বিতরণ করা হয়। এদের বড় একটি অংশকে কাশিনাথপুর পাইকরহাটি মহাসড়ক সংলগ্ন জঙ্গল পরিপূর্ণ ডাব বাগানে, বাকিদের শাহজাদপুর বাঘাবাড়ীর বড়াল নদীর ফেরিঘাটে পাকবাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য বসানো হয়। এ সময় এ পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালিন জেলা প্রশাসক এম নূরুল কাদের খান, মহকূমা প্রশাসক সামসুদ্দীন, ক্যাপটেন হুদা ও গণপরিষদ সদস্য আব্দুর রহমান। এ সেময় জেলা ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে আরো একটি দল বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর ফেরী ঘাটে স্থানীয়দের সাথে একত্রিত হয়ে নদীর উত্তর পাড়ে বাংকার খুড়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রতিরোধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতিদিন আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে সংগৃহীত খাদ্য ও রসদ আসতে থাকে।

পাইকরহাটি ডাববাগান যুদ্ধে শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলা

স্মৃতিচারকরা বলেন, রাষ্ট্রচালকেরা এ যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরাতো দুরে থাক, পরবর্তীতে এলাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কিম্বা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা শহীদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করতেও আজ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি। তাদের ভাগ্যে আজো মেলেনি কোনো বীর প্রতীক, বীর বিক্রম কিম্বা বীর শ্রেষ্ঠ নামক রাষ্ট্রীয় উপাধি। ডাব বাগানে সংঘটিত ঐ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে নানা ক্ষোভ, দুঃখ, আশা, প্রত্যাশা ও হতাশার নানা কাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস রচনার প্রধান দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সে ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থ। বীর মুক্তিযোদ্ধারা কোন ধনীর দুলাল কিম্বা অভিজাত শ্রেণীর সন্তান ছিলেন না। সিংহভাগ মুক্তিযোদ্ধাই ছিল খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের পরিবারের সন্তান। এ কারণেই ইতিহাসে তাদের যথাযোগ্য স্থান মেলেনি, মেটেনি ক্ষুধার জ্বালা। তাই জীবিত মুক্তিযোদ্ধার কখনো ভিক্ষুক, কখনো রিক্সাচালক কিম্বা দিনমুজুর। আর শেখ হাসিনা সরকার যখন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করলেন। ঠিক তখনই সুবিধাভোগী মানুষের ভীড় ক্রমাগত বাড়তেই থাকলো। রাজাকার স্বাধীনতাবিরোধীরা সহ যারা কোনদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি, তারাও মুক্তিযোদ্ধা সেজে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দেওয়া সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। ক্রমাগত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বেড়েই চলেছে; নকলের ভীড়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা হারিয়ে যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হচ্ছে কলংকিত। অপরদিকে শহীদ পরিবারের মায়েরা, বোনেরা, ভাইয়েরা আজো খুঁজে ফিরছেন তাদের বীর সন্তানদের।

ডাব বাগান যুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ এলাকার মানুষকে এখনও শিহরিত করে। আগামী দিনের প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখার জন্য শহীদনগরে একটি স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে; যেটি ১৯ এপ্রিল, ২০০১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ উদ্বোধন করেন। বিভিন্ন সময়ে এই ঐতিহাসিক যুদ্ধের যারা স্মৃতিচারণ করেছিলেন তারা হলেন, শাহজাদপুর থেকে নির্বাচিত প্রয়াত সাবেক গণপরিষদ সদস্য আব্দুর রহমান, (৭৫) প্রয়াত আবুল চৌধুরী (৭৮)), পাইকরহাটী ডাব বাগান গ্রামের মোঃ হোসেন আলী (৭১), আয়েনউদ্দিন ফকির (৭৩), মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন (৬২), কাজী আজম (৬১) বড়গ্রামের আজিজল প্রামানিক (৭৬), আতপসোভা গ্রামের আ: ছামাদ মুন্সি (৮৫) প্রমুখ।

মানবতা ধর্মের প্রতীক-ব্যতিক্রমী গণকবর পাইকরহাটি ডাববাগানে 

একই কবরে শায়িত রয়েছেন ১০/১২ মুক্তিযোদ্ধাসহ গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা জগৎ নারায়ন বিশ্বাস। তাদের ১৬ শরিকের (পরিবার) বিশাল এলাকার নিজ বসতবাটিতেই নাম না জানা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একই গণকবরে শায়িত রয়েছেন তিনি। সেখানে ধর্মের কোন বিরোধ নেই। মানবতাই ধর্মের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া গ্রামবাসী গ্রামে ফিরে এসে গ্রামের ভিতর এবং মহাসড়কে এলাপাথাড়ি পড়ে থাকা লাশগুলোর দ্রুত দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। যে লাশগুলো শিয়াল-কুকুর এদিক সেদিক টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল সেই ক্ষবিক্ষত লাশগুলো একত্রিত করে বিভিন্ন স্থানে তারা পূঁতে ফেলে দাফন করেছিল। 

তরুণদের প্রতি আবেদন : একটিবার হলেও যাও না মইত্যা রাজাকারের এলাকা শহীদনগর; শুনে এসো না ঐ এলাকায় মার্চ-এপ্রিলের প্রতিরোধ যুদ্ধে বীর বাঙ্গালীর সাহসী ভূমিকা ও বিজয়ের কাহিনী এবং এপ্রিলের মধ্যভাগ হতে মইত্যা রাজাকার সহ তার অনুগামী দালাল-রাজাকারদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কাহিনীগুলি। 

তরুণরা একটু ভাবো : পাবনা-সিরাজগঞ্জের প্রবীণদের মুখে মুখে এখনো যেভাবে ডিসি এম নূরুল কাদের খান ও এসডিও শামছুদ্দিন আহমেদ এর নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয় ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের এমএনএ, এমপিএ এবং ন্যাপ, কমুনিষ্ট পার্টি, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের নামের পাশাপাশি, এমন নজির পাওয়া যায় মেহেরপুর এসডিও তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরী, পিরোজপুরের এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ, ঝিনেদার এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ এর ক্ষেত্রে—কিন্তু, বাংলাদেশের অনেক জেলা ও মহকুমারই ১৯৭১ এর ডিসি, এসপি, ও এসডিও, এসডিপিওদের নাম কেউ জানে না কেন? হয়তো এটি খুঁজলে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর পাবে ১৯৭১ এর শুধু নয়, ২০১৭ এরও। 

সঙ্কলনে: মো: মাহমুদ হাসান (ভূতপূর্ব কলেজ অধ্যক্ষ ও সমাজ গবেষক), ঢাকা, তারিখ, ১১ই মে, ২০১৭

পাঠকের মন্তব্য