একটি অচিন্তনীয় হত্যাকাণ্ড বনাম পুলিশের বুদ্ধিদীপ্ত তদন্ত

একটি অচিন্তনীয় হত্যাকাণ্ড বনাম পুলিশের বুদ্ধিদীপ্ত তদন্ত

একটি অচিন্তনীয় হত্যাকাণ্ড বনাম পুলিশের বুদ্ধিদীপ্ত তদন্ত

হত্যাকাণ্ডের রহস্য এভাবে উন্মোচিত হবে কে ভেবেছিলো! বগুড়ার সোনাতলা থানায় মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীর হারিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত জিডির অনুসন্ধানের কাজে পুলিশ ওই গ্রামসহ আশপাশের ইউনিয়নে খোঁজ খবর নেয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশ অনেকের সাথে কথা বলে। তথ্য সংগ্রহের এক পর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, সোনাতলা সদর ইউনিয়নের রানিরপাড়া গ্রামে রফিকুল (৪৫) নামে এক মরিচ ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রায় বছর খানেক ধরে রফিকুলের কোনো খবর নেই। রফিকুলের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও তাঁকে খোঁজ করার তেমন উদ্যোগ নেই। এমন তথ্য পেয়ে পুলিশের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। নিখোঁজ রফিকুলের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে শুরু করে পুলিশ।

এদিকে,অন্য একটি সূত্রে পুলিশ জানতে পারে, নদী পাড় হয়ে পাশের ইউনিয়নের একটি ছেলে প্রায় প্রতি সপ্তাহে সোনাতলা রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় আসেন। সেখানে থাকা একটি ব্রিজে বসে সিগারেট খান। এরপর কাউকে কিছু না বলে আবার নদী পাড় হয়ে চলে যান। পুলিশ এই যুবক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। এতে জানা যায়, যুবকটির নাম শাকিল (২১)। তিনি প্রতি সপ্তাহে ওই একই জায়গায় আসেন। পুলিশ এটাও জানতে পারে, নিখোঁজ রফিকুলের স্ত্রী সম্পর্কে শাকিলের খালা। কিন্তু তিনি খালা বাড়ির গ্রামে এলেও খালার বাড়িতে যান না। শাকিলের এমন আচরণ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ।

একদিন শাকিলকে ডেকে পাঠানো হয়। তাঁর খালা রেহেনার স্বামী রফিকুলের পরিবারের সম্পর্কে পুলিশ তার কাছে জানতে চায়। কিন্তু স্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর দিতেও শাকিল পুলিশকে অসহযোগিতা করেন। শাকিলের এমন আচরণে পুলিশের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। এবার শাকিলের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ। এতে দেখা যায়,বছর খানেক আগেও খালা বাড়িতে শাকিলের নিয়মিত যাতায়েত ছিলো। কিন্তু তার খালু নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে শাকিল আর সেখানে যান না। শাকিলকে দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে পুলিশের কাছে শাকিল বলেন, তাঁর খালু রফিকুলের নিখোঁজের ব্যাপারে মহিদুল (৪৭) কিছু জেনে থাকতে পারেন।

মহিদুলের বাড়ি ও তাঁর খালা বাড়ি একই গ্রামে। এবার মহিদুলের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহকালে জানা যায়,মহিদুলের সাথে শাকিলের খালা রেহেনার পরকীয়া সম্পর্কের একটি গুঞ্জন রয়েছে। এবার আরও আট-সাঁট বেঁধে তদন্তে নামে পুলিশ। নানা সূত্রের তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ বিভিন্ন সমীকরণ মেলাতে থাকে। সব তথ্য বিশ্লেষণে পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত হয়, রফিকুলের নিখোঁজের সাথে শাকিল ও মহিদুল কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্টতা আছে।

এবার ভিন্ন এক কৌশল নেয় পুলিশ। একই সময়ে দুটি ভিন্ন জায়গায় পুলিশ শাকিল ও মহিদুলকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক খুঁজে পাওয়া যায়। এবার পুলিশের সংগ্রহ করা সাক্ষ্য প্রমাণ তাদের সামনে উপস্থাপণ করা হয়। তখন তারা দুজনেই রফিকুলকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান এবং তারা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন বলে স্বীকার করেন। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে রফিকুলের স্ত্রী রেহেনা (৩৭) ও তার ৩য় ছেলে জসিম(১৮) যুক্ত রয়েছেন বলে তারা দুজনেই পুলিশকে তথ্য দেন। এবার রেহেনা ও জসীমকে শাকিল ও মহিদুলের মুখোমুখি করে পুলিশ। আর এতেই বেরিয়ে আসে রফিকুল হত্যাকাণ্ডের এক নৃশংস বিবরণ।

রফিকুলের স্ত্রী রেহেনা পুলিশকে জানায়, রফিকুল ব্যবসার কাজে প্রায়ই জেলার বাইরে থাকতেন। তিনি অনেকদিন ধরে বাড়িতে আসতেন না। এই সুযোগে মহিদুলের সাথে তাঁর পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু রফিকুল বাড়ি ফিরে বিষয়টি জানতে পেরে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তাঁকে মারধরও করেন। অন্যদিকে,রফিকুল গাইবান্ধার ফুলছড়ি এলাকায় আরেকটি বিয়ে করেছেন বলে খবর বের হয়। এ কারণে রফিকুলের ওপরে ক্ষিপ্ত ছিলেন তিনি। তাই, মহিদুলের সাথে মিলে রফিকুলকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তাঁরা।

রেহেনা আরও জানান, বাবা রফিকুলের দ্বিতীয় বিয়ের খবরে ছেলে জসিম বাবার ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। একটু বোকা স্বভাবের জসিমকে তিনি বোঝাতে সক্ষম হন,তার বাবা রফিকুল এই সংসারের সব টাকা নিয়ে বাইরে খরচ করছেন। এভাবে চলতে থাকলে তাদের কপালে কিছুই জুটবে না। মায়ের থেকে এমন কথা শুনে বাবাকে হত্যার পরিকল্পনায় সায় দেন জসিম। অন্যদিকে, শাকিল তাদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়েত করতেন। সে তার অনেক বিশ্বস্ত ছিলো। তাই,শাকিলকে ডেকে এই হত্যা পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

হত্যা পরিকল্পনা অনুযায়ী মহিদুল বাজার থেকে ঘুমের ওষুধ কিনে আনেন। এরপর তা রেহেনার কাছে দেন। রেহেনা রাতের খাবারের সাথে রফিকুলকে তা খাওয়ান। ওষুধের প্রকোপে রফিকুল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। গত বছরের ১৪ জুন রাতে রফিকুলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তাঁরা। হত্যার পর রফিকুলের লাশ বস্তায় ভর্তি করা হয়। এরপর তাদের বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সোনাতলা রেললাইনের পাশের (যেখানে শাকিল প্রতি সপ্তাহে যেতেন) নিচু জমিতে মাটি খুঁড়ে করে মহিদুল, শাকিল ও জসিম রাতের আঁধারে লাশটি চাপা দেন।

রফিকুলকে হত্যার পর নতুন এক গল্প তৈরি করেন তারা। রফিকুলের আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসীদের কাছে তারা প্রচার করে বেড়ান, গাইবান্ধার ফুলছড়িতে যাওয়ার উদ্দেশে রফিকুল জামা কাপড় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে আর তাঁর খবর নেই। অন্যদিকে, কৌশলে এটাও তারা প্রচার করেন যে, রফিকুল সেখানে আরেকটি বিয়ে করেছেন। তাই, তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখতেই রফিকুল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন।

কথায় আছে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। সত্য কখনো চাপা থাকে না। শুক্রবার (২৯ মে) মহিদুল, শাকিল ও জসিমের দেখানো স্থান থেকে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দী অবস্থায় রফিকুলের দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর নমুনা সংগ্রহসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তা মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় ওই চারজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে। এভাবেই,রফিকুল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। সর্বদাই জনগনের পাশে, বাংলাদেশ পুলিশ।

পাঠকের মন্তব্য