করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সফলতা ব্যর্থতা এবং করণীয়

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান : করোনা হয়তো কখনোই নির্মূল হবে না। একে সঙ্গী করেই বাঁচার পথ খুঁজতে হবে-বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ অমোঘ বাণী। গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী তোলপাড় করে চলেছে। বেড়েই চলেছে সংক্রমণের সংখ্যা, বেড়েই চলেছে মৃত্যুর মিছিল। ২০ মে, ২০২০ পর্যন্ত বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৫০ লাখ দুই হাজার ৪৩৯ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছে তিন লাখ ২৫ হাজার ২১৪ জন। বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ২৬ হাজার ৭৩৮ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছে ৩৮৬ জন। পাশের দেশ ভারতে আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৮৮৬ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছে তিন হাজার ৩০৩ জন। এ পর্যন্ত বিশ্বের ২১৩টি দেশ-অঞ্চল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে এসেছে। প্রতিদিন গণমাধ্যমে সংস্থার মহাপরিচালক তেদরস আধোনম গেব্রায়সুম বিশ্বের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ক্লান্তিহীনভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা শুরু থেকেই লক্ষ্য করছি, যে সমস্ত দেশ এসব দিকনির্দেশনা গুরুত্বসহকারে অনুসরণ করেছে সেসব দেশ করোনাভাইরাস সফলতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে আর যে সমস্ত দেশ শুরুতে গুরুত্ব দেয়নি বা ঢিলেঢালাভাব নিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে সেসব দেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাগুলো- ১) পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা-যতবেশি সম্ভব সন্দেহজনক মানুষের করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করতে হবে।

২) আক্রান্ত রোগীকে বিচ্ছিন্ন করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে। 
৩) উৎপত্তি স্থল নিয়ন্ত্রণ (লকডাউন) করতে হবে। ৪) ঘরে অবস্থান (হোম কোয়ারেন্টাইন) 
৫) প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। 
৬) চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের সংক্রমণ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, 
৭) করোনা প্রতিরোধ কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাজ করতে হবে, 
৮) দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করতে হবে, 
৯) নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে, 
১০) ১/২ মিটার শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে, 
১১) হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে, 
১২) নাক-মুখ-চোখ হাত দিয়ে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, 
১৩) সর্বশেষ করোনা পরিস্থিতি বিষয়ে অবহিত থাকতে হবে, 
১৪) করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা মানুষদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে, 
১৫) ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে, 
১৬) ঘরের বাইরে বেরোলে অবশ্যই পরিষ্কার মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

যে সব দেশ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে তাদের মধ্যে প্রথমেই আসে ভিয়েতনামের নাম। যে দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে একজন মানুষের মৃত্যুও হয়নি। এখানে প্রথম কভিড রোগী শনাক্ত হয় ২৩ জানুয়ারি। তখন থেকে ভিয়েতনাম সরকার স্বাস্থ্য বিধি মোতাবেক ত্বরিত সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে। এ দেশের জনসংখ্যা ১০ কোটি। অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি মোটেই সবল নয়। চীনের সঙ্গে দূরত্ব মাত্র এক হাজার ৩০০ কিমি। চীনের সঙ্গে রয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ২ লাখ ৬১ হাজার জন মানুষের পিসিআর টেস্ট করেছে। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩২০ জন এবং ইতিমধ্যে ২৬০ জন সুস্থ হয়েছেন। কোয়ারেন্টাইনে রেখেছেন প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। শুরুতেই স্বাস্থ্যবিধির পাশাপাশি যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে-১) সীমানা বন্ধ ২) বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহার ৩) বিমানবন্দরে ভাইরাস পরীক্ষা ৪) দ্রুত সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্তকরণ (Contact tracing)। এ ছাড়া পরীক্ষা কিট উদ্ভাবন করে দেশে ব্যবহার করেও বিদেশে রপ্তানি করেছে। ভিয়েতনামে ৪৭টি কেন্দ্রীয় হাসপাতাল এবং প্রায় এক হাজার স্থানীয় পর্যায়ের ছোট হাসপাতাল রয়েছে। ভিয়েতনাম প্রমাণ করেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুব মানসম্মত না হলেও করোনা মোকাবিলায় সফল হওয়া যায়। ভিয়েতনামের মাস্ক বুথ ও চাল বুথ স্থাপন ছিল অনন্য পদক্ষেপ যেখান থেকে জনগণ প্রয়োজনমতো মাস্ক এবং চাল নিতে পারত।

এর পেছনে মূল কারণ ছিল-দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বচ্ছতা।

চীন থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ উৎপত্তি হলেও সফলতাও দেখিয়েছে চীন। প্রথম দিকে রোগটি এবং ভাইরাসটি বুঝতে কিছুটা সময় পার হয়েছে চীনের। কিন্তু যখনই বুঝতে পেরেছে তাৎক্ষণিক শক্ত কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। যে কারণে সংক্রমণের রেখচিত্র মধ্য ফেব্রুয়ারিতে শিখরে উঠলেও মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে একেবারে নিম্নপর্যায়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধিসহ চীন ১২টি কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে যা চীনের জনগণ পুরোপুরি অনুসরণ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-দ্রুত বিনামূল্যে সহজে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পরীক্ষার ব্যবস্থা করা, অতি স্বল্প সময়ে (৬-১৫ দিনে) দুটি ১০০০-১৩০০ বেডের হাসপাতাল নতুন প্রস্তুত করা, দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থার সংস্কার, কার্যকর লকডাউন, পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, সংস্পর্শে আসা মানুষদের দ্রুত শনাক্ত করার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া, রোগ গোপনকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

করোনা শনাক্ত শূন্য হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু হয়েছে দক্ষিণকোরিয়ায়। দেশটির বড় কোনো সংকটে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকদের মতামতের ভিত্তিতে স্ট্র্যাটিজিক প্ল্যান তৈরি করে এবং সে অনুযায়ীই বাস্তবায়ন করে। সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ মোকাবিলায় কোনো প্রকার লকডাউন ছাড়াই দেশটি অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছে। চীনের পরে করোনাভাইরাসের epicentre হতে বসেছিল দক্ষিণ কোরিয়া, সেই দেশটিতে এখন নতুন করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় শূন্য। তাদের সফলতার মূল জায়গা ২০১৫ সালের মার্স ভাইরাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। তখন মার্স ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে দক্ষিণ কোরিয়াকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রামক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার আলাদা ইউনিট করা হয়। তারা প্রথমেই বুঝতে পারে সফলতা পেতে হলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে প্রথমেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পাশাপাশি তাদের উৎসাহ প্রদান করা হয়। কোরিয়া সরকার স্বাস্থ্যকর্মীদের এতটাই সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে যে, দাবি করা হয় এখন পর্যন্ত কোরিয়ায় কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া লকডাউন স্ট্র্যাটিজিতে না গিয়ে ফোর টি স্ট্র্যাটিজিতে যায়-Test, Tracking, Tracing Ges Treatment. . তারা দ্রুত করোনাভাইরাস কিট তৈরি করে ফেলে। সারা দেশে ৬০০-এর বেশি করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয় যেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের মানুষ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করে।

লকডাউন না করা আরেক দেশ হংকং। জনগণের সচেতনতায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করোনা প্রতিরোধে বড় উদাহরণ। সরকারের পদক্ষেপের আগেই সামাজিক দূরত্ব, বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহার, ভিড় এড়িয়ে তারা পার্কে বেড়াতে গিয়েছে, শিশুদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছে। পাশাপাশি সরকার তাদের পদক্ষেপ যথাযথভাবে নিয়েছে। ফলে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ১০৪১ এবং মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ৪ জন।

একইভাবে সরকার এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রেখেছে তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, লাইবেরিয়া, সেনেগাল, নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকার অনেক দেশ।

শুরু থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গুরুত্ব না দেওয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধি অনুসরণ না করা এবং জনগণকে যথাসময়ে উদ্বুদ্ধ না করা দেশগুলোকেই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথমেই আসে যুক্তরাষ্ট্রের নাম যেখানে ২০ মে পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১৫ লাখ ৭০ হাজার ৯০৮ জন আর মৃত্যুবরণ করেছে ৯৩ হাজার ৫৩৭ জন। এরপরের দেশগুলো হচ্ছে-যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ইরান, রাশিয়া ও ব্রাজিল। ইতিমধ্যে কিছু সফল দেশ যেমন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি লকডাউন শিথিল করার কারণে সংক্রমণ আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫০ লাখ পরিবারকে পরিবার প্রতি সরাসরি ২৫০০ টাকা করে অর্থ সহযোগিতা করেছেন যাতে উপকৃত হবে দুই কোটি মানুষ। এ ছাড়া ৭৬ লাখ পরিবার মানে প্রায় তিন কোটি মানুষ ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে সহযোগিতা পেয়ে আসছেন। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবাভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা তো চলমান আছেই। ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। ৪২টি কেন্দ্র থেকে পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে করোনাভাইরাস শনাক্ত কার্যক্রম চলছে। ১২টি হাসপাতাল কভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকায় বসুন্ধরা গ্রুপ ২০০০ বেডের সম্পূর্ণ হাসপাতাল চালু করেছে। সরকার জেলা-উপজেলায় আইসোলেশন ইউনিট চালু করেছে। ড. সমীর সাহা-সেঁজুতি সাহা Genome sequence আবিষ্কার করেছে। গণস্বাস্থ্য অ্যান্টিবডি কিট উদ্ভাবনের প্রক্রিয়ায় আছে। প্লাজমা থেরাপির ট্রায়াল চলছে। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় ১০০০।

রমজান মাস ও ঈদকে ঘিরে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করার প্রবণতা লক্ষণীয়। বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণের এবং মৃত্যুর সংখ্যার রেখচিত্র ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে অর্থনীতির চাকা যতটা সম্ভব চালু রাখা প্রয়োজন। ঘরবন্দী মানুষের মানসিক অবস্থাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয়

যে কোনো পরিস্থিতিতেই সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। একদিকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ, অন্যদিকে জীবন-জীবিকা, অর্থনীতির চাকা ন্যূনতম সচল রাখা বিবেচনায় রেখেই বাস্তব কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। তবে মনে রাখতেই হবে সবার আগে জীবন। এটা প্রমাণিত যে, লকডাউন সংক্রমণ ধীর করে দেওয়া ও জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা এনেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা লকডাউন শিথিল করার জন্য তিনটি প্রশ্ন রেখেছে স্ব স্ব দেশ তার উত্তর খুঁজে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

১) মহামারী নিয়ন্ত্রণে এসেছে কিনা ? 
২) সংক্রমণ বাড়লে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বাড়তি চাপ নিতে সক্ষম কিনা? 
৩) জনস্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থা কি রোগী ও তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ও সংক্রমণ বৃদ্ধি চিহ্নিত করতে সক্ষম?

বাংলাদেশও কয়েকটি জায়গায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অসামান্য সফলতা দেখিয়েছে। যেমন মিরপুরের টোলারবাগ, মাদারীপুরের শিবচর এবং রাঙামাটি জেলা। যে সমস্ত দেশ সফলতা অর্জন করেছে তার পেছনে রয়েছে-ঘরে অবস্থান, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, ঘরের বাইরে বেরোলে বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহারের মতো বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন।

বিশ্বে এই প্রথমবার রোগপ্রতিরোধে সামাজিক চিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা একই রকম গুরুত্ব পেয়েছে বরং বলা যায়, সামাজিক চিকিৎসা (বিধি)ই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

করণীয় 

১) ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে সমন্বয় এবং সহযোগিতা বাড়াতে হবে। 
২) যতক্ষণ পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যুর লেখচিত্র ঊর্ধ্বমুখী থাকবে ততক্ষণ স্বাস্থ্যবিধি শিথিল করা যাবে না।
৩) জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়ার কাউকে অনুমতি দেওয়া যাবে না। বাইরে যেতে হলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে হবে।  
৪) পুরো দেশকে সংক্রমণের মাত্রা অনুযায়ী সবুজ, হলুদ, লাল অঞ্চল (জোন)-এ ভাগ করতে হবে। এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে লকডাউন (ছুটি) প্রত্যাহার করতে হবে। যেমন ইংল্যান্ডে সাত সপ্তাহে পাঁচ ধাপে লকডাউন প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়েছে। 
৫) সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্তকরণ : দেশব্যাপী জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সমন্বয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, নগর পর্যায়ে ৫-৭ সদস্য বিশিষ্ট দল করে সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করতে হবে এবং তাদের পরীক্ষার পর পজিটিভ হলে আইসোলেশন/ কোয়ারেন্টাইনে রেখে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে। দ্রুত শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা প্রদান-দ্রুত সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। 
৬) পবিত্র ঈদ ঘিরে স্বাস্থ্যবিধির কঠোর প্রয়োগ করতে হবে নইলে গোটা দেশ নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সৌদি আরবে ঈদের সময় পাঁচ দিন কার্ফু জারি করা হয়েছে। 
৭) চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে হবে মানসম্মত সামগ্রী সরবরাহ করে। নইলে চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৮) গণমাধ্যমের মাধ্যমে আরও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সহজ বোধগম্য ভাষায় ব্যাপক প্রচার দিতে হবে। 
৯) নন-কভিড রোগীদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। 
১০) ট্রায়েজ/ফ্লু কর্নার/ ফিভার ক্লিনিক সব হাসপাতালে নিশ্চিত করতে হবে যাতে সাধারণ রোগীদের অহেতুক ঘোরাঘুরি করতে না হয়।  
১১) অতি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক চাকা চালু রাখার স্বার্থে উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হবে।

বাংলাদেশ একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ-রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা উন্নত-অনুন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের যতটুকু সামর্থ্য-সুযোগ আছে তার পুরোটাই স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে, সঙ্গে অবশ্যই জন-মানুষের আন্তরিক সম্পৃক্ততা উৎসাহিত করতে হবে। জনগণের প্রসারিত সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশই সফল হতে পারেনি। করোনাভাইরাসের এ ভয়ঙ্কর আগ্রাসনে সরকার-জনগণ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতেই হবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠকের মন্তব্য