গরুর লাম্পি রোগে আর আতঙ্ক নয়, আছে ভ্যাকসিন 

গরুর লাম্পি রোগে আর আতঙ্ক নয়, আছে ভ্যাকসিন 

গরুর লাম্পি রোগে আর আতঙ্ক নয়, আছে ভ্যাকসিন 

দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গরুর ভাইরাসজনিত রোগ লাম্পি স্কিন ডিজিজের (এলএসডি) প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় খামারিরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। বিশেষ করে আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে যারা ষাঁড় গরু লালন-পালন করছেন তাদের দুশ্চিন্তাটা একটু বেশি। কারণ কোরবানির গরু ঘা বা যেকোনো দাগ থাকলে তা চালানো কঠিন।

খামারিরা জানান, সামনে সময় আছে আর মাত্র ৪০ দিন। এখন কোনো গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হলে সেটা কোরবানির বাজারে নেয়া সম্ভব হবে না। তবে পশুচিকিৎসকরা বলছেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ নিয়ে বেশি আতঙ্ক হওয়ার কারণ নেই। এ রোগের টিকা এসেছে, এটা নিরাময়যোগ্য রোগ। চিকিৎসা করলে এবং একটু যত্ন নিলেই এ রোগ ভালো হয়ে যায়।

কথা হয় শেরপুর জেলার ডেইরি ও গরু মোটাতাজাকরণ খামারি তৌহিদুর রহমান পাপ্পুর সঙ্গে। তিনি খুব আতঙ্কের মধ্যে আছেন। তার খামারে ছোটবড়, গাভী-ষাঁড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০ গরু আছে। বিশেষ করে কোরবানিকে সামনে রেখে যেসব পশু তৈরি করা হয়েছে তাদের নিয়ে তিনি খুব দুশ্চিন্তায় আছেন।

তিনি বলেন, আমার ফার্মে এ পর্যন্ত ১০টা গরু আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিন দু-একটি করে যোগ হচ্ছে। কোরবানিযোগ্য পাঁচটি গরুর শরীরে ঘা হয়ে গিয়েছিল। প্রতিদিন ড্রেসিং করে ওষুধ দিয়ে ভালো করেছি। এখন যদি নতুন করে কোরবানির কোনো গরু আক্রান্ত হয় তাহলে সেটা আর বাজারে তোলা সম্ভব হবে না। কারণ ঘা সারতে অনেক দিন সময় লাগে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ছোট দুটি বাছুরও আক্রান্ত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অফিসে গিয়েছিলাম। এ রোগের জন্য কোনো ভ্যাকসিন নেই। তবে আমি নিজে এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা করছি। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে ঠিকমতো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এ কারণে বাইরের চিকিৎসক এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় নিজে যা জানি সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা করছি। পাঁচটি ইতোমধ্যে ভালো করেছি আর পাঁচটিও ভালো হওয়ার পথে।

পশুচিকিৎসকরা বলছেন, মশা ও মাছির মাধ্যমে ভাইরাসজনিত লাম্পি স্কিন ডিজিজ আক্রান্ত গরুর শরীর প্রথমে ফুলে গুটি-গুটি হয়। কয়েকদিন পর গুটিগুলো ফেটে রস ঝরতে থাকে। ফলে ফেটে যাওয়া স্থানেই ক্ষত সৃষ্টি হয়ে গরুর শরীরে প্রচণ্ড জ্বর হয় এবং গরুর খাবারের রুচি কমে যায়। এ ধরনের অসুখে গরু মারাও যাচ্ছে।
তারা আরও বলছেন, এ রোগে আক্রান্ত গবাদি পশুর মৃত্যুহার কম হলেও এর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনও পাওয়া যায়নি।

তবে চিকিৎসকরা জানান, এ রোগে লক্ষণ দেখে পেনিসিলিন, অ্যান্টিহিস্টামিন, আইভার মেকটিন জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কৃষকদের এ নিয়ে চিন্তিত না হয়ে গরুর পরিচর্যাসহ প্রাণিসম্পদ বিভাগকে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনে গরু নিয়ে প্রাণিসম্পদ অফিসে আসতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় গবাদি পশু লাম্পিং রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গত তিন সপ্তাহে বেশ কিছু গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারাও গেছে। তবে আসন্ন ঈদুল আজহায় এসব আক্রান্ত গরু অনেকে বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে।

জেলার উলিপুর উপজেলার কয়েকটি এলাকায় লাম্পি স্কিন ডিজিজের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামের নুর ইসলামের একটি গাভী, কালিরপাঠ গ্রামের জগদীশ চন্দ্র বর্মনের একটি গাভী, হোকডাঙ্গা গ্রামের ফজলুল হকের একটি ষাঁড় ও নতুন অনন্তপুর গ্রামের সাজু মিয়ার একটি গাভী ও একটি বাছুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ ভাইরাসে আক্রান্ত।

দিনাজপুর প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরে নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত খামার রয়েছে প্রায় দুই হাজার। এতে গরু রয়েছে প্রায় ১৭ লাখ। এই রোগটি বিশ্বে পুরাতন হলেও গত বছর বাংলাদেশে এই রোগ দেখা দেয়। তবে এ জেলায় রোগটি চলতি মাসের জুনের শুরুর দিকে সদর, বোচাগঞ্জ ও খানসামা উপজেলায় বেশ কিছু গরুর গায়ে দেখা দেয়। গরুর গায়ে প্রথমে পক্সের মতো বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো গায়। এরই মধ্যে বেশ কিছু গরুর মৃত্যু ঘটেছে। নতুন এই রোগটি নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিসহ গৃহস্থরা।

চিকিৎসকরা জানান, এই রোগে গরু মরে না। তবে রোগটি হয়ে ফেটে যাওয়ার পর ঘন ঘন ড্রেসিং না করলে এবং পশুর যত্ন না নিলে গরু মারা যায়।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ঢাকার উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ কে এম আতাউর রহমান বলেন, গরুর লাম্পি রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই। এই রোগে গরু মরে না। তা ছাড়া ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে। সারাদেশে এই রোগের ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে। মহাখালী থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হচ্ছে সারাদেশে।

তিনি বলেন, লাম্পি ও গোট পক্স একই ধরনের রোগ। এই রোগে আক্রান্ত পশু ভালো হয়। মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয়ের নির্দেশ সারাদেশে এর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় টিম করে দেয়া হয়েছে। এই টিম ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কাজ করছেন। কোন দিন কার কয়টি গরু চিকিৎসা করা হলো সে লোকের মোবাইল নম্বরসহ কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে ফোন করে তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এখানে ফাঁকি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ডা. এ কে এম আতাউর রহমান বলেন, গত বছর চট্টগ্রাম থেকে এই রোগ সৃষ্টি হয়। পরে এই রোগ শনাক্ত করা হয় এবং চিকিৎসার জন্য ওষুধও বের করা হয়।

পাঠকের মন্তব্য