মন, বিবেক যা সায় দেয় তাই আমি লিখি : ফজলুল বারী

মন, বিবেক যা সায় দেয় তাই আমি লিখি : ফজলুল বারী

মন, বিবেক যা সায় দেয় তাই আমি লিখি : ফজলুল বারী

আমি প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখি। লেখাটা আমার কাছে এক রকম এবাদতের মতো। আপনি যেমন সময় করে এবাদত করেন, আমিও তেমন সময় বের করে লিখি। মন, বিবেক যা সায় দেয় তাই আমি লিখি। ইনবক্সে প্রতিদিন এটা লিখেন সেটা লিখেন বলে অনুরোধ করেন। আমি চুপ করে থাকি। কারন আমি কখনও ফরমায়েশি লেখা লিখিনা। মন, বিবেক সায় না দিলে লেখা যায়না।

অস্ট্রেলিয়ায় আমার ক্লাসে একবার দ্য অস্ট্রেলিয়ানের এক কলামিস্ট লেকচার দিতে আসেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে আমি জানতে চাইলাম, তিনি যখন লিখেন তখন পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি মাথায় থাকে কিনা। এমন প্রশ্ন শুনে তিনি অপ্রস্তুত হন। অনেকক্ষন আমার দিকে অবাক তাকিয়ে থাকেন।

আমার বিভাগের ডীন তাঁর পাশে বসা ছিলেন। ডীন তাঁকে বলেন, এই ছাত্র বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করতো। এরজন্যে হয়তো তাঁর দেশের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের প্রশ্ন করেছে। সেই কলাম লেখক তখন হেসে দিয়ে বলেন, আমিতো ওই পত্রিকায় চাকরি করিনা। কাজেই পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতি কী তা আমার জানার প্রয়োজন নেই।

আমি লিখি আমার পাঠকদের জন্যে। আমি দায়বদ্ধ আমার পাঠকদের কাছে। লেখার সঙ্গে আমার ই-মেইল ঠিকানা ছাপা হয়। পাঠকের প্রতিক্রিয়া আমি ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের কাছে পেয়ে যাই। তা ছাড়া পাঠক পছন্দ না করলে পত্রিকা আমাকে মোটা পারিশ্রমিক দিয়ে লেখা ছাপবেইবা কেনো।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা সে পর্যায়ে এখনও পৌঁছতে পারেনি। এরজন্যে এগুলো পাঠকদের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ন প্রয়োজনীয় নয়। আমরা যখন পত্রিকার পাঠক ছিলাম তখন পত্রিকার জন্য স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতাম। মোটামুটি পত্রিকা না পড়লে খাবার হজম হতোনা। এখন সে অবস্থা পাল্টেছে। তথ্য পাবার নানা সূত্র পাঠকের হাতের মুঠোয়। এটা সেটা না বেরুলে পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যায় না।

আমি যখন পত্রিকায় কাজ করতাম তখন লেখা বা রিপোর্ট হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী। আমার যে কত রিপোর্ট ছাপা হয়নি। এরজন্যে একাকি কত কেঁদেছি। চাকরিও ছেড়েছি বহুবার। কোন দিন তাদের কাছে বেতন চাইতেও যাইনি। পত্রিকা বা মিডিয়া কেউ বেহেস্তে যাবার উদ্দেশেও বের করেননা। চালাননা।
নানান এথিক্স অথবা উচ্চমার্গীয় কথা শুনবেন। কিন্তু এর সবকিছুর সঙ্গে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক অথবা ব্যক্তিগত নানা স্বার্থ কাজ করে। এরজন্য আমি একটা কথা বিভিন্ন সময়ে লিখি, তাহলে সরকার যেটা চায় না তা ইনিয়ে বিনিয়ে লেখা যায়। কিন্তু মালিক বা সম্পাদক যা চায় না তা কোনভাবে লেখা বা প্রকাশ করা যায়না।

এখন আমি কোন মিডিয়ায় চাকরি করিনা। স্বাধীনভাবে লিখি। একটা লেখা তৈরি করতে আমার তিন-চার ঘন্টা সময় লাগে। এর সবগুলো মান সম্পন্নও হয়না। আমি আমার লেখায় কখনও সন্তুষ্টও হইনা। কারন আমি জানি নিজের লেখায় কেউ সন্তুষ্ট হয়ে গেলে তিনি শেষ। প্রতিজন লেখক একজন শিল্পীও। অসন্তুষ্টি লেখককে মরতে দেয় না। সচল রাখে। আমিও প্রতিদিন শিখি। নিজেকে ভাঙ্গি গড়ি প্রতিদিন।

কিন্তু এখন লেখা ছাপা নিয়ে নানান সমস্যা হয়। যারা ছাপেন তাদের সঙ্গে প্রায় সৃষ্টি হয় নানান সমস্যার। নানান স্বার্থ চিন্তার কারনে অনেক শব্দ বা বাক্যও অনেকের হজম করতে সমস্যা হয়। এরজন্য আমাকে সবার সহ্য করা কঠিন। প্রায় দেখা যায় অমুকে এই লেখা সেই লেখা প্রকাশ করছেননা। 'ভুলে যাচ্ছেন অথবা ই-মেইল চেক করছেননা'। এতে যে কোন লেখক মন বিদ্রোহ করে। আমি যত ছোট ও সাধারন মানের লেখক হইনা কেনো মন বিদ্রোহ আমারও করে। এ ছাড়াতো একজন লেখকের নিজস্ব কোন সম্পদ বা অস্ত্রও নেই।

দীর্ঘ পেশা জীবনের কারনে নানান অভিজ্ঞতায় আমি তাদের সমস্যাগুলোও বুঝি। জগতের সকল প্রানী সুখি হোক। এরজন্যে এসব গায়ে না মেখে লিখেই তা পোষ্ট দেই ফেসবুকে। এমনিতে নানা মিডিয়ার এখন এমন পরিস্থিতি যে আপনি যেখানে যাই লিখেন না কেন তা পাঠককে পড়াতে হলে ফেসবুকে পোষ্ট দিতেই হয়। ফেসবুকে পোষ্ট না দিলে অনেক পাঠক এখন জানেনইনা কোথায় কে লিখেছে বা কী ছাপা হয়েছে। আর আমার সব লেখা ফেসবুকে যেহেতু পাবলিক করা তাই যার যেটা অনুকূল মনে হবে তা তারা ফেসবুক থেকেই নিয়ে নিতে পারেন। অনেকে নিয়মিত না নিচ্ছেনও। কেউ ইনবক্সে লিঙ্ক দেন। কেউ দেননা। এটা তাদের বিষয়। আমার কাছে পাঠক বড়। ছোটখাটো একটি পাঠকগ্রুপ আছে আমার লেখার। তারাই আমার সুন্দর অনুভূতি। সমালোচক। আমার নমস্কার।

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : ফজলুল বারী

পাঠকের মন্তব্য