দুর্নীতি ও নিয়োগ বানিজ্যের সেরা জনপ্রতিনিধি; এর জন্য দায়ী কে ? 

ইকবাল আহমেদ লিটন

ইকবাল আহমেদ লিটন

ইকবাল আহমেদ লিটন : যে জাতি একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে পেরেশান হয়ে পড়ে কোন সোর্সে টাকা দিলে চাকুরী কনফার্ম হবে। সেই জাতির অসৎ রাজনীতিবিদ, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে হক উপদেশ মানায় না। মূলত বৃহৎ অসৎ জনগোষ্ঠীই একটি দূর্নীতি সহায়ক বাজার সৃষ্টি করে আর সৎ, যোগ্য, মেধাসম্পন্ন আর প্রতিশ্রুতিশীলরা হতাশায় ভোগে। বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ে যখন আমরা আলোচনা করি তখন সর্বপ্রথম রাজনীতিবিদদের একহাত নিই কারণ আমরা বিশ্বাস করি রাজনীতিবিদ মাত্রই চোর, মহাচোর। এদের নিজেদের আর পরিবারের মুখ রাবনের মতো দশটি, সব গিলে খায়। প্রকৃতপক্ষে, কতগুলো সেক্টরে একটি রাজনীতিবিদের অবদান থাকে বা রাখতে হয় এটা শুধু নিঃস্বার্থ রাজনীতিবিদগণই টের পান। রাজনীতিবিদ মানেই যে চোর তা নয় আবার সবাই যে সাধু তাও নয়। বেশ কতকগুলো ঘটনার বিশ্লেষণ দুর্নীতি সম্পর্কে আমাদেরকে ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তার সুযোগ করে দেবে আশা করা যায়। সাভারের সাবেক এমপি তৌহিদ জং মুরাদের সময় বিপুল পরিমাণ উন্নয়ন সাধিত করেন এবং আজকের এই ডিজটাল সাভারেও তার ভূমিকা সবচেয়ে বেশী অথচ তাকে পরপর দুই টার্মে নমিনেশন থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই বেচারা তার ব্যবসায়ের সব রোজগার ব্যয় করতো এলাকার বুভুক্ষ জনগনের পিছনে।

এবার আসা যাক সাভারের বর্তমান এমপি ড. এনাম প্রসঙ্গে একথায় তিনি প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ তবে এই প্রখ্যাত তথাকথিত বললে ভুল হবেনা। যার অধিকাংশ সময় কেটেছে মদ জুয়া আর নারী নিয়ে, তিনি এসি রুমে বসে ঢাকা শহরের সিকিউরিটি ম্যানের চাকুরীর তদবীর করতেও লজ্জা পেতেন না। অবশ্যই এটি নিঃসন্দেহে বিনামূল্যে তো নয়"ই এবং দলমত নির্বিশেষেতো প্রশ্নই উঠে না। যাদের চাকুরী হতো তারা সকলে আওয়ামী বিরোধী এর প্রমাণ আমার নিকট আছে। তিনি এই তদবির কাযর্ক্রম চালিয়ে যেতেন নিঃসংকোচে, অবশেষে তার এই অনৈতিক কর্মকান্ডের চাপে পার্টি প্রধান তার উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তদবির, সুপারিশ বন্ধ করতে। সরকার একদা চিন্তা করলো দেশে ব্যবসা, বানিজ্য বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে একটি বোর্ড গঠন করা দরকার। পরিকল্পনা মোতাবেক বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এই বিষয়ে দক্ষ বিশেষজ্ঞ একজন প্রবাসী দেশের টানে বাইরের চাকুরীর থেকে ছুটি নিয়ে সাক্ষাতকারে অংশ নিলেন, কর্তৃপক্ষ তার অভিজ্ঞতায় চমৎকৃত হলেন। জয়েন এর জন্য কিছুদিন দেশে অবস্থান করে তিনি বুঝতে পারলেন বাংলাদেশে শুধু পেশাদারী যোগ্যতা থাকলেই চাকুরী হয় না। অত:পর তিনি পুনরায় প্রবাসে তার কর্মস্থলে ফিরে গেলেন। কিছুদিন পরে তার প্রতিষ্ঠানে স্বল্প সময়ের জন্য একজন দক্ষ ট্রেইনার চেয়ে বাংলাদেশ থেকে একটি অফার আসলো। কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশী বিবেচনায় তাকে সিলেক্ট করলেন। ভদ্রলোক খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলেন, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর জন্য দেশে গিয়েছিলেন এটি সেই প্রতিষ্ঠানের অফার এবং চুক্তিভিত্তিক দুই বৎসর চাকুরী হলে তিনি যা বেতন পেতেন মাত্র এক মাসের ট্রেনিং প্রোগ্রামে তিনি তার থেকে বেশী সম্মানী পেতে যাচ্ছেন। সেখানে তার প্রশিক্ষনের বিষয় হচ্ছে তার পছন্দের পোস্টে যে প্রাক্তন সচিব নিয়োগ পেয়েছেন তাকে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কলাকৌশলে রপ্ত করা। আমাদের দেশে গরু মহিষের শিং ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হলেও চায়নায় সেগুলো পরম ভক্তিভরে প্রক্রিয়াজাত করে হারবাল ঔষধ তৈরী করে। একবার আমাদের দেশের এক ব্যবসায়ী দুই কনটেইনার শিংয়ের অর্ডার সংগ্রহ করেছে। এবার রপ্তানী অনুমতির জন্য সরকারী বিভিন্ন টেবিলে নিয়মিত তাওয়াফ শুরু করলেন কিন্তু সরকারী কর্মকর্তাদের হারবালের গুরুত্ব বোঝাতে ব্যর্থ হলেন। অন্যদিকে চায়না পার্টি তাদের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীকে জানালে তারা একটি টিম পাঠাতে চাই হারবালের বৈশ্বিক গুরুত্ব বোঝানোর জন্য কিন্তু রপ্তানী ব্যুরোর লোকজন যে নগদ নারায়ণের বেশী আসক্ত তা ঐ ব্যবসায়ী বুঝতে পারে নাই, ফলশ্রুতিতে টাইম পাসের কারণে অর্ডারটি বাতিল হয়ে যায়। ইপিজেডে তাইয়ানের এক কোম্পানীতে বাংলাদেশী এক দুর্নীতিবাজ একাউন্টস অফিসার চাকুরী করতো। কোম্পানী প্রধান তাকে হিসাব গরমিল এবং আলুর দোষের জন্য শো-কজ করে। ধূর্ত একাউন্টস অফিসার থানায় যেয়ে কোম্পানী প্রধানের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও দেশে এখন অবৈধভাবে অবস্থান করছে এমন তথ্য প্রদান করে অসৎ পুলিশ লেলিয়ে দেয়। তখন আবার তাইওয়ানের সাথে চায়নার খুব খারাপ সম্পর্ক যাচ্ছিল, বাংলাদেশ থেকে তাইওয়ানের পাসপোর্ট রেন্যু করা ভিসা এক্সটেন্ট করা প্রায় বন্ধ। অবশেষে বাধ্য হয়ে ঐ দুর্নীতিবাজ অফিসারকে চাকুরীতে পূর্ণবহাল করে তাইওয়ানী কোম্পানী।

সরকারী এক দপ্তরে ড্রাইভারদের তেল চুরি করা বাধ্যতামূলক। হয় ভাগের চোরাই তেল নিতে হবে নতুবা তেল বিক্রয় করে ক্যাশ টাকা নিতে হবে। চুরির টাকা আবার দান খয়রাত হিসেবে চালানোতে হুজুরদের ব্যাপক আপত্তি। তাই চোরাই তেলের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে নিজস্ব বাইক কিনেছে কিছু ড্রাইভার। এখন এই তেলে বাইক চালিয়ে উঠাও, পাঠাও এর ইনকামও যে হারাম তা বুঝাবে কে?

দেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকা স্বত্ত্বেও অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারে না শুধুমাত্র টাকার জন্য। কুমিল্লার এক মুক্তিযোদ্ধা তার সহযোগী যোদ্ধা মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে দেখা করে তার সার্টিফিকেট জটিলতার কথা জানালে ন্যূনতম একটি অফিস খরচার এ্যামাউন্ট জানায়। বন্ধু মন্ত্রী হওয়ার পরও যদি ঘুষ দেয়া লাগে এমন সার্টিফিকেট লাগবে না রাগ করে বললেও আসলে প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে অবসর গ্রহনের পর মাত্র ৮,০০০ টাকা বেতনে সংসার চালানোর পর ঘুষ দেওয়ার মতো আর অবশিষ্ট কিছু ছিলোনা। মাগুরার এক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা ট্র্যাস্ট থেকে ঋণ নেওয়ার পরও ৫০,০০০ টাকা ঘুষ না দিতে পারাতে মুক্তিযোদ্ধা হালনাগাত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার শিকার হন। বরিশালের এক মুক্তিযোদ্ধার নাম জাতীয় পরিচয়পত্রে ভূল আসায় সকল ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তার সন্তান অনেকবার মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়িতে কোন ফল হয় নাই। কারন ছেলে আবার মসজিদের ইমাম সাহেব, হুজুর মানুষের কাছে কেউ ঘুষ চেয়ে গুনাহগারও হতে চায় না আবার সোয়াবের আশায় ফ্রীতে কাজটি করেও দেয় না।

বাংলাদেশে একটি অঞ্চলের লোক নিজেদেরকে মানবজাতির সর্বচ্চো বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এলিয়েন প্রজাতির অংশ মনে করে। সেখান থেকে একজন ছাত্র এসেছে ঢাকায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে। অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়াতে আগেই ভাগেই ১৪ লক্ষ টাকায় প্রশ্নফাঁসের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। পরীক্ষার দিন দেখলো পূর্বে সরবারহকৃত পাওয়া প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার প্রশ্নের কোনো মিল নাই। মন খারাপ করে মেসে ফিরে দেখে বিছানার নিচে রেখে যাওয়া ১৪ লাখ টাকা উধাও সাথে উধাও হয়েছে মেসের ৩ মেম্বার। বাড়িতে ফোন করে জানানোর ৪ দিন পর বাবা স্টোক করে মারা যায়। এভাবেই জাতি বঞ্চিত হলো এক করিৎকর্মা চিকিৎসকের সেবা থেকে। সরকারী কোনো দপ্তরে যদি মাত্র ১টি পোস্টে চাকুরীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পায় তাহলে শ’খানেক লোক বাঁকাপথে ঐ নিয়োগ প্রাপ্তির তদবির করে। দশ থেকে পনেরজনের জোর তদবিরকারীর মাঝে একজন সৌভাগ্যবান চাকুরীর হরিণ শিকার করতে পারেন। সবাই টাকা দিতে রাজি শুধু নিশ্চিত একটি উৎস খোঁজে, যে টাকা নিজের মনে করে আত্বসাৎ না করে ঈমানদারীতার সাথে চাকুরী ফাইনাল করবে। অথ্যাৎ চুরির জগতেও মুমীন চোরের ডিমান্ড ভালো। আজকাল চুরির টাকা ভাগাভাগির রেশিও পাকা করার জন্য হেভিওয়েটরা ধর্মীয় মযার্দাপূর্ণ স্থান বেছে নিচ্ছে।

পড়াশুনা করে, মেধায়, প্রতিযোগিতায় জিততে এ জাতির বড়ই অনীহা, শর্টকাট, ডাইরেক্ট, হটলাইন পেতে জাতি খুবই উদদ্রীব। খামোকা রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগ, বিএনপির নিকুঁচি না করে এই জাতির নিজস্ব চরিত্র নিয়ে গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তবে সাভারের এমপি ড. এনামের আলুর আর লিচুর দোষ কোনদিন শেষ হবেনা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখতে গেলে উপজেলা পর্যায়ে সর্বপ্রথম দলীয় লোকজনের দৌরাত্ব কমাতে হবে! একজন দলীয় লোক কোন ধরণের সরকারি নিয়োগ না পেয়েও কিভাবে অল্প সময়ে অনেক সম্পদের মালিক হয়? স্থানীয় এমপিরা এক্ষেত্রে দারুণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এমপি সাহেবদের মনে রাখা উচিৎ, তিনি যাকে প্রতিনিধিত্ব বা দায়িত্ব দিচ্ছেন তিনি আসলে কতটা সৎ! একজন এমপি বা মন্ত্রীর সব দিকে নজর রাখা সম্ভব নয়! আবার এমপিদের না জানিয়ে স্থানীয় নেতারা অনেক কিছুই করে থাকেন। যেগুলো বর্তমান সময়ে এমপি মন্ত্রীদের সম্মানের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

অনেক স্থানীয় নেতা আছেন উপজেলার সব বিষয়ে নাক গলান। একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারও অনেক সময় নানামুখী চাপে এমপির প্রতিনিধিদের খারাপ কাজ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেন না। প্রতিটি উপজেলার ভেতরের চিত্র একই রকম! অথচ অনেক এমপি মন্ত্রী এই স্থানীয় নেতারা কি করছেন এগুলোতে মনোনিবেশ খুব একটা দেন না! বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের দলীয় সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকদের দৌরাত্ব মারাত্বকভাবে ক্ষতিকর!

সরকারি খাবিকা, টাবিকা, বিশেষ বরাদ্দ নামে বেনামে নিয়ে থাকেন স্থানীয় নেতারা। দল পরিচালনা করার কথা বলে মূলত এসব অনেক অকাজের বরাদ্দ নেন নেতারা। সত্য কথা বলতে, দশ টাকা খরচ করে ৫০টার ফায়দা হাসিল করেন এসব নেতারা! আপনারা যদি আপনাদের এলাকায় একটু দেখেন তাহলেই বুঝতে পারবেন কি অবস্থা দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশের তৃণমূল নেতাকর্মীদের! এমপি বা নেতাদের অপর্কমের ফলে বেশির ভাগ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা এমপির বিশেষ বরাদ্দের তালিকা কাউকেই দেখাতে চান না! এতে অবশ্য অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা একটা পার্সেন্টেন্স বা ভাগ নেন! সব উপজেলায় এমনটা নাও হতে পারে। আবার অনেক উপজেলায় পিআইও"দের বাধ্য করানো হয় এসব কাগজে সই করার জন্য।

তাই দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সবার আগে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাদের দৌরাত্ব বন্ধ করতে হবে! স্থানীয় এমপি মন্ত্রীদের কাছে অনুরোধ থাকবে, আপনারা একটু খোজখবর রাখবেন আপনাদের মনোনীত লোকদের উপর। দলীয় খরচের নামে যেনো লুটপাট না হয়! যতদিন আমি বা আপনি ঠিক না হচ্ছি? যতদিন আমি বা আপনি ওনাদের মত অসৎ এমপিদের বর্জন না করছি? ততদিন আমাদের শিক্ষার কোন মূল্য নাই। আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে আসল বার্তা পৌঁছে দেওয়া অতিব জরুরি। কেননা ড. এনামের মত অসৎ রাজনীতিবিদ হাজারে দশ জন থাকলেও বাংলাদেশ মাজা খাড়া করে দাড়াতে পারবেনা আর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াতো অনেক দূরের ব্যাপার।

লেখকঃ আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ সদস্য সচিব

পাঠকের মন্তব্য