এথেন্স থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

এথেন্স থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

এথেন্স থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

সোহেল তাজ : ২৩শে জুলাই ২০২০ বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী তাজউদ্দীন আহমদের ৯৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটা লিখা দেওয়ার জন্য যখন আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত একজন সাংবাদিক বন্ধু অনুরোধ করলেন, আমি তখন চিন্তায় পরে গেলাম। বাংলাদেশ সহ সারা পৃথিবীর মানুষ যখন করোনাভাইরাস মহামারীতে দিশেহারা, যখন অর্থনৈতিক ও মানসিক ভাবে সবাই অনেকটা বিপর্যস্ত, যখন ভবিষ্যতের পথটা অনেকটাই অন্ধকার ঠিক সেই মুহূর্তে কি লিখতে পারি আমার বাবা সম্পর্কে ? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পরে গেল ৪৩০ খ্রীষ্ট পূর্ব এথেন্স এর কথা। সেই বছর এথেন্স আক্রান্ত হয় ভয়াবহ "প্লেইগ" মহামারীতে। সেই সময় যুদ্ধ চলছিল স্পার্টার সঙ্গে (পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধ) এবং আত্মরক্ষার জন্য এথেন্স এর সকল জনগোষ্ঠী দেয়াল ঘেরা এই শহরে আশ্রয় নেয় যা কিনা হীতে বিপরীত হয়ে যায় যখন এই ভয়াবহ ছোয়াচে রোগ আফ্রিকার ইথিওপিয়া থেকে এথেন্সে ছড়িয়ে পরে। সেই সময় এথেন্সের নেতৃত্বে ছিলেন পেরিক্লেস। ৪৬১ খ্রীষ্ট পূর্ব থেকে পেরিক্লেস এর নেতৃত্বে এথেন্সের ব্যাপক উন্নতি হয় এবং ইতিহাসবিদরা সেই সময়কে আখ্যায়িত করেছে "পেরিক্লেস এর যুগ" উপাধি দিয়ে। এই মহামারীতে এথেন্সের ২৫% মানুষের মৃত্যু ঘটে এমনকি পেরিক্লেসও মারা যান ৪২৯ খ্রীষ্ট পূর্বে এবং যুদ্ধ চলে আরো ২৫ বছর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে এত বিপর্যয় আর প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্তেও, কি করে তারা দৃঢ়তার সাথে ভবিষৎকে মোকাবেলা করতে এগিয়ে চললো ? কেন তারা পরাজয় কে মেনে নিলো না ?

এর কারণ জানতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে তাদের সামাজিক মূল্যবোধ এবং জীবন বা জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা। তারা ছিল গর্বিত জাতি, তাদের গর্ব ছিল তাদের ইতিহাস, তাদের গর্ব ছিল ব্যক্তি স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্ত চিন্তা/বাক্স্বাধীনতার ইতিহাস,গণতন্ত্রের ইতিহাস-, ভাষা/সাহিত্যের ইতিহাস, যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ইতিহাস, উন্নত সংস্কৃতির ইতিহাস এবং তাদের অনুপ্রেরণা ছিল সেই ইতিহাসের চরিত্ররা (থেলিস, পাইথোগোরাস, সক্রেটিস, প্লেইটো, এরিস্টটল, হেরোডোটাস, হিপোক্রেটিস সহ আরো অনেকেই) যাদের দিয়ে তৈরী হয়েছিল সেই গর্বিত ইতিহাস এর অধ্যায়।

আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগে কেমন ছিল আমাদের এই পৃথিবী ?
  
বর্তমান যুগে বাক স্ববাধীনতা, মানবাধিকার, ন্যায় বিচার/আইনের শাসন, সম অধিকার ইত্যাদি আমরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার হিসেবে ধরে নিয়েছি কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হতো তার জন্ম থেকেই- হয় রাজা নয়ত প্রজা। নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করার কোন সুযোগ ছিল না। সেই সময় ভারত উপমহাদেশে রাজাদের রাজত্ব, মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল পারস্য সাম্রাজ্য (মরুভূমি বেষ্টিত আরব ভূখণ্ড ব্যাতিত- বর্তমান সৌদি আরব- সেখানে সেসময় বেদুইন জনগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের প্রায় আরো ১০০০ বছর অপেক্ষা করতে হয় নবী করিম হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর আগমনের জন্য এবং পরবর্তীতে তার নেতৃত্বে আরব জাতি তথা বিশ্ব আলোকিত হয়) মিশরে ফারাওদের রাজত্ব, বাদবাকি আফ্রিকা তখনও সভ্যতার ছোয়া পায়নি। উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকায় তখন আদি মায়ান রাজত্ব এবং ছড়ানো ছিটানো আদি মানুষ। বাকি ইউরোপের বেশির ভাগ মানুষ ছোট ছোট গোষ্ঠী দ্বারা নূন্যতম জীবন যাপন করছে এবং চীন দেশে জু বংশের রাজত্ব। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে শুধু মাত্র আদিবাসীদের বসবাস। এমন অবস্থায় এথেন্সে ঘটে যায় যুগান্তকারী কিছু ঘটনা যা চিরকালের জন্য পাল্টে দেয় মানুষের ভবিষ্যৎ চলার পথ।
 
এথেন্সের গল্প কাহিনী থেকে জানা যায়, ৫৬১ খ্রীষ্ট পূর্বে সেই শহরে ব্যাপক অশান্তি বয়ে আসে এবং জানা যায় এর কারণ ছিল সেই সময়কার ক্ষমতাবান অভিজাত পরিবার শাসক গোষ্ঠীর অন্তর দ্বন্দ্ব, অত্যাচার এবং নির্যাতন। এর থেকে রেহাই পেতে যখন এথেন্স বাসি দিশেহারা ঠিক তখন পাইসিসট্রাটাস নামক একজন শক্তিধর সুদর্শন ব্যাক্তি হাজির হন এবং এথেন্সবাসীকে এই দূর্যোগ থেকে মুক্তিদানের প্রতিজ্ঞা করেন। এথেন্সবাসী তাকে গ্রহণ করে নেয় এবং পাইসিসট্রাটাস প্রথম "টাইরান্ট" অর্থাৎ স্বৈরশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তার জীবদ্দশায় তিনি তার প্ৰতিজ্ঞা অটুট রাখেন এবং সাধারণ মানুষের জীবন উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যাপক কাজ করেন এবং পাশাপাশি অভিজাত গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনেন। পাইসিসট্রাটাসের নেতৃত্বে এথেন্সের অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এথেন্স বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠে। এই সময় সামাজিক পরিবর্তনের একটা উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মেধা এবং যোগ্যতা। যেকোনো পেশা বা কাজে মেধা আর যোগ্যতাই ছিল সমাজে একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় এবং সম্মানের আসন আর এই দুইয়ের প্রতিযোগিতাই হয়ে উঠে সমাজের মূলমন্ত্র বা চালিকা শক্তি। ৫২৭ খ্রীষ্ট পূর্বে তার মৃত্যুর পর তারই দুই ছেলে সন্তান হিপ্পিয়াস এবং হিপ্পার্কাস যৌথ ভাবে ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়। প্রথম দিকে তারা বাবা পাইসিসট্রাটাসের পথ অবলম্বন করে কিন্তু ৫১৪ খ্রীষ্ট পূর্বে হিপ্পার্কাসকে ষড়যন্ত্রকারীরা হত্যা করলে তার ভাই হিপ্পিয়াস প্রতিশোধের নেশায় মগ্ন হয়ে যান এবং ষড়যন্ত্রকারীদের সহ অনেক নিরীহ মানুষেকে হত্যা ও নির্যাতন করেন। এর ফলে এথেন্সের জনগণ তার বিপক্ষে চলে যায় এবং একক শাসক চালিত প্রথার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। অভিজাত পরিবারতন্ত্রের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে তারা সেই পদ্ধতিকেও প্রত্যাখ্যান করে। গড়ে উঠে জনতার আন্দোলন এবং ৫১০ খ্রীষ্ট পূর্বে গণঅভুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার হিপ্পিয়াসের পতন ঘটলে তাকে এথেন্স থেকে প্রবাসে বিতাড়িত করা হয়। এই গণঅভুত্থানের নেতৃত্ব দেন ক্লায়স্থেনিস। ক্লায়স্থেনিস যদিও অভিজাত পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে জনতার কাতারে যোগ দিয়েছিলেন নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু অভিজাত পরিবার গোষ্ঠী তা মেনে নিতে পারেনি এবং তাদের প্রতিনিধি আইসাগরাস ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এথেন্সের শত্রু শহর স্পার্টার সঙ্গে মিলে। স্পার্টার রাজা ক্লিওমেনেস এর সহযোগিতায় আইসাগরস স্পার্টার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ক্ষমতা দখল করে এবং ক্লায়স্থেনিসকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে আবারও এথেন্স এবং এথেন্সের নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় স্বৈরাচার শাসন।

কিন্তু এথেন্স বাসি ভুলতে পারে নি মুক্তির ঘ্রাণ আর তাই দুই বছর যেতে না যেতেই ৫০৮ খ্রীষ্ট পূর্বে তারা আবারো বিক্ষোভে ফেটে পরে এবং আবারো গণআন্দোলনে মেতে উঠে। সাধারণ মানুষের তোপের মুখে আইসাগরাস এবং তার সমর্থকরা পাহাড়ের উপর অবস্থিত এক্রোপলিসে আশ্রয় নেয়। দুই দিন সেখানে ঘেরাও অবস্থায় থাকার পর আত্মসর্পন করলে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং সাধারণ জনতার দাবি অনুযায়ী ক্লায়স্থেনিসকে আবারও তারা ফিরিয়ে নিয়ে আসে তাদের নেতা হিসেবে। গণঅভুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা সাধারণ জনগণের হাতে আসার ঘটনা মানব ইতিহাসে এই প্রথম।

এই পরিস্থিতিতে ক্লায়স্থেনিসের পরবর্তী যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত চিরকালের জন্য বদলে দেয় শুধু এথেন্স বাসীরই নয় সাথে সমগ্র মানব সমাজের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রা। তিনি অনুধাবন করতে চেষ্টা করলেন এথেন্স বাসীর আশা আকাঙ্খা। তিনি বুঝতে পারলেন যে মুক্তিপ্রীয়, স্বাধীনচেতা এথেন্স বাসির স্বপ্ন কোনদিনও পূরণ করা সম্ভব হবে না পুরোনো শাসনব্যাবস্থা দ্বারা- তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব তাদের হাতেই দিতে হবে। এই মর্মে তিনি একটা নাগরিক সভার আয়োজন করলেন এক্রোপলিস পাহাড়ের পাশে এবং সেই সভায় সকল নাগরিকদের আমন্ত্রণ করলেন তাদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে ব্যবস্থা করলেন ইতিহাসের প্রথম ভোট ও নির্বাচন - সাদা পাথরের টুকরা "হ্যা" আর কালো পাথরের টুকরা "না" ভোট পদ্ধতিতে। এভাবেই জন্ম হয় গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও পদ্ধতির- এটাই হচ্ছে আমাদের বর্তমান যুগের পার্লামেন্ট, কংগ্রেস বা সেনেট্ এর সূত্রপাত। ক্লায়স্থেনিসকে ইতিহাসবিদরা গণতন্ত্রের জনক হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

চলবে ..................
 
লেখক : সোহেল তাজ, একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তিনি।
তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২০

পাঠকের মন্তব্য