স্মৃতিতে অম্লান সাংবাদিক রেবেকা ইয়াসমিন রেবা

স্মৃতিতে অম্লান সাংবাদিক রেবেকা ইয়াসমিন রেবা

স্মৃতিতে অম্লান সাংবাদিক রেবেকা ইয়াসমিন রেবা

মান্নান ফরিদী : নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার আল মবিন রোডস্থ বিশিষ্ট সমাজসেবক ও ডাক্তার মরহুম বদরউদ্দিন আহমেদের মেয়ে অধ্যাপিকা রেবেকা ইয়াসমিন। রেবা তাঁর ডাকনাম। কিন্তু এই ছোট্ট নামটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের খুব কম লোকই জানত। মোহনগঞ্জ-নেত্রকোণাবাসীর মুখে এই নামটি যতটা উচ্চারিত হতো ময়মনসিংহে ঠিক তা নয়। এখানকার মানুষের কাছে তিনি রেবেকা ইয়াসমিন নামেই বহুল পরিচিত। সংবাদপত্রের জগতে এক কিংবদন্তী নাম রেবেকা ইয়াসমিন। বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহে।

যে মানুষটির সাথে দীর্ঘদিন সংসার করেছেন তাঁরও পরিচিতি ছিল অত্র এলাকার জনেজনে। মরহুম হাবিবুর রহমান ছিলেন একজন কৃষিবিদ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এমনকি বাকসুর ছাত্র সংসদের ভিপিও ছিলেন। এই সাবেক ছাত্রনেতা নিজ এলাকার মেয়ে রেবেকা ইয়াসমিন রেবার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পসেই অবস্থানরত রেবা আপার এক আত্মীয়ের জি-২/২ নং বাসায়। কৃষি বিশ্ববিদ্যলয়ের কর্মকর্তা দুলাভাই লোকমান হাকিম খান বিয়ের সমস্ত আয়োজন করেন। সেই থেকেই তাঁদের একসাথে পথ চলা।

নেত্রকোণার আটপাড়ার সন্তান হাবিবুর রহমান হাবিব কৃষি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত হয়েও কোনো সরকারি চাকরি না করে পা বাড়ান সাংবাদিকতার জগতে। নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দৈনিক জাহান’, ‘বাংলার দর্পণ’ ও ‘ডেইলী ইকনোমিক পোস্ট’ পত্রিকা। তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের মফস্বল সাংবাদিকতার এক কিংবদন্তি পুরুষ। আশির দশকে স্বৈরশানসামলে এই পত্রিকাটি ময়মনসিংহ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমি আনন্দ মোহেন কলেজের ছাত্র থাকাবস্থায় ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকায় অনিয়মিতভাবে সংবাদদাতার কাজ করতাম আর কবিতা লিখতাম। তখনও রেবা আপার সাথে আমার কোনো পরিচয় হয়ে ওঠেনি।

রেবা আপার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৪ সালের কোনো এক সময়ে। আমি তখন বি. কে. বি. কলেজের বাংলার শিক্ষক এবং বিভাগীয় প্রধান। তৎকালে তিনি কিছুসময় অত্র কলেজের বাংলার শিক্ষক ছিলেন এবং অল্পদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেছেন। খুব হাসি-খুশি অমায়িক ব্যবহারের অধিকারি বেরা আপা অল্প সময়েই সবার সাথে মিশে গিয়েছিলেন। আমরা একই বিষয়ের (বাংলা) শিক্ষক হলেও বয়সগত কারণে উনি আমার বেশ সিনিয়র ছিলেন। তবুও রেবা আপা আমাকে 'মান্নান ভাই' বলেই সম্বোধন করতেন। উনি থাকাকালীন সময়ে কোনো বিষয়েই কখনও আমাদের দ্বিমত হয়নি। আমার আর এক বন্ধু ও সহযোদ্ধা ইতিহাসের শিক্ষক আবদুল জলিল (বর্তমানে অধ্যক্ষ) ছিলেন নেত্রকোণার মোহগঞ্জের মানুষ। আমাদের তিনজনের মধ্যে একটা আলাদা ভাব ছিল। নেত্রকোণা অঞ্চলের আরও ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক পারভীন আপা ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক সাথী। তারা দু'জন পরবর্তীতে অন্যত্র চলে যান।

রেবা আপা এখানে আর বেশিদিন অবস্থান করলেন না। ফিরে গেলেন স্বামীর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকায়। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন ময়মনসিংহের মাসকান্দায় বিসিক শিল্প নগরীতে। সামনে পত্রিকা অফিস আর পিছনে বাসা।

পথ চলতে চলতে হাবিবুর রহমান ভাই হঠাৎ এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলেন। মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। তবুও নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সব কিছু সামাল দিয়ে নিজ কাঁধে তুলে নেন পত্রিকার সমস্ত দায়-দায়িত্ব। সামনে শুধু স্বামী নামক মানুষটি নেই। সবকিছু চললো ঠিক আগের মতোই। ব্যবসা, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ইত্যাদিতে তাঁর অগ্রনী ভূমিকায় মানুষের মন জয় করতে পেরেছিলেন অতি সহজেই। ময়মনসিংহস্থ নেত্রকোণা সমিতির সাথেও জড়িত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

বছর দেড়েক আগে কোনো এক কার্য উপলক্ষে আমি বিসিক শিল্প নগরীতে ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকা অফিসে যাই। অফিসের কর্মকর্তা সাইদুর রহমান সাহেবের সাথে দেখা করে কাজটা সম্পন্ন করি। পরে সাইদুর রহমান সাহেবের সহযোগিতায় খোঁজ নেই- রেবা আপা বাসায় আছেন কিনা। তিনি অফিস থেকে খানিকটা দূরে দু’তলা বাসায় গিয়ে আমার কথা জানালে রেবা আপা সাদরে গ্রহণ করে বাসায় যাবার অনুমতি দেন। সাইদুর রহমান সাহেব আমাকে বাসায় পৌঁছে তিনি ফিরে এলেন। আমাকে পেয়ে রেবা আপা খুবই উল্লসিত হলেন। দীর্ঘদিন পর দেখা। দেখলাম ঠিক আগের রেবা আপা নেই। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ায় শরীরটা ভেঙে গেছে। তবু আন্তরিকভাবে অনেকক্ষণ আমার সাথে কথা বললেন। পরিবারের খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম উনার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তাদের সাথে নাতিও আছে। আমার মেয়েটাকে দেখেছিলেন খুবই ছোট্ট। মেয়ে বিয়ে দিয়েছি এবং এক নাতি আছে যেনে খুব খুশি হন। বললেন, “ওদের নিয়ে বাসায় আসবেন।”

কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, “ময়মননিংহ তো এখন বিভাগীয় শহর, আপা আমার ইচ্ছা এখানে একটা বাংলা সমিতি গড়ে তোলা যায় কি না?” উনি খুশি হয়েই বলেছিলেন, “আপনারা সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করুন। আমার পক্ষ থেকে যা করার আমি করব। কোনো সমস্যা হবে না।” এভাবেই কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় গড়িয়ে গিয়েছিল। দুপুর বেলা খাবারের জন্য তিনি খুব জোরাজুরি করলেন কিন্তু না আমি শুধু এক গ্লাস পানি পান করে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। প্রসঙ্গত বলতে হয়, পরবর্তী সময়টুকুতে আমি ‘মুসলিম ইনস্টিটিউট’, ময়মনসিংহ এবং ময়মনসিংহস্থ ‘গফরগাঁও চাকরিজীবী কল্যাণ ফোরাম’ ও অন্যান্য সাংগঠনিক কাজে ব্যাপকভাবে ব্যস্ত থাকায় বাংলা সমিতির কাজ শুরু করলেও সময়ের অভাবে আর রেবা আপার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। বাংলা সমিতির কাজে হাত দিয়ে যাই যাই করে করোনা পরিস্থিতিতে আটকে গেলাম।

আজ বিকেল বেলায় রেবা আপার মৃত্যুর আধ ঘণ্টার মধ্যেই ফেইসবুক মারফত খবরটা পেয়ে যাই। নামটা দেখার সাথে সাথেই এক চিৎকার দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ি। ছুটে যাই আমার স্ত্রীর কাছে। তাকে খবরটা জানাই। আমার স্ত্রী জানতে চাইলেন যে, কী কারণে তিনি মারা গেলেন! কিন্তু আমি তৎক্ষণাত কারণ বলতে পারিনি। উল্লেখ্য যে, রেবা আপার বিয়ের আগে এক সময় হাবিব ভাই (রেবা আপার স্বামী) আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টারে ৫৬/বি, বাউন্ডারি রোডে আমার স্ত্রীর বড় বোনের বাসায় ভাড়া থাকতেন। সে সুবাধে হাবিব ভাই সম্পর্কে আমার স্ত্রীর কিছুটা জানাশোনা ছিল। পরবর্তীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বাসায় রেবা আপার বিয়ে হয়েছিল সে ফ্যামিলির সাথেও আমাদের বেশ সুসম্পর্ক ছিল। আমরা আগে পাশাপাশি এবং বর্তমানে একই বিল্ডিংয়ের বাসিন্দা ছিলাম। যদিও অনেক আগে লোকমান সাহেব ফ্যামিলিসহ ক্যাম্পাস ছেড়ে ময়মনসিংহ শহরে গোলকীবাড়ি রোডে চলে গিয়েছেন। সব মিলিয়ে একটা সামাজিক প্রচ্ছন্ন সম্পর্ক ছিল আমাদের মাঝে।

মৃত্যু সংবাদ শোনার সাথে সাথে রেবা আপার ছবিসহ ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিই। পরবর্তীতে নিউজগুলোতে জানতে পারি যে, গত ২৬ জুন ২০২০ তারিখে স্ট্রোকজনিত কারণে প্রথমে তাঁকে চুরখাই কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (সিবিএমসিবি) আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দ্বিতীয়বারের মতো স্ট্রোক হয়। চিকিৎসা চলতে থাকে। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে ১৮ জুলাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ১৯ তারিখে ল্যাব পরীক্ষায় তাঁর শরীরে কোভিড-১৯-এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সেই করালগ্রাসী রোগে কাতর হয়ে অদ্য (২৭/৭/২০২০) সোমবার বিকাল ২.৫০ মি. শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না ........... রাজিউন)।

তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলার নারী সাংবাদিকদেও অগ্রপথিক। সেইসাথে ‘দৈনিক জাহান’ পত্রিকার সম্পাদক, ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি, সংবাদ পত্র শিল্প মালিক সমিতি ময়মনসিংহ জেলার সভাপতি এবং ময়মনসিংহস্থ নেত্রকোণা সমিতির উপদেষ্টা ছিলেন।

মৃত্যুকালে মরহুমার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি এক ছেলে, দুই মেয়ে, নাতি-নাতকর, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৈনিক জাহানের নির্বাহী সম্পাদক মোঃ আবুল হাসেম সাহেবের বরাত দিয়ে যতদূর জানা গেছে মোহনগঞ্জ পৌর শহরে দৌলতপুরে আজ রাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জানাজা সম্পন্ন হয়। তারপর পিতার পারিবারিক কবরস্থানে লাশের দাফন করা হয়েছে।

আমরা মরহুমার আত্মার শান্তি কামনা করছি। তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবার যেনো এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন সেই দোয়াও করছি। আমীন।

২৭ জুলাই ২০২০, মধ্যরাত; ময়মননিংহ

অধ্যক্ষ মান্নান ফরিদী খোকা
সভাপতি
বিশ্বকবিতা পরিষদ
ময়মনসিংহ বিভাগীয় শাখা

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : অধ্যক্ষ মান্নান ফরিদী খোকা

পাঠকের মন্তব্য