মৃত্যুর চেয়ে বিষ্ময়কর কিছু নেই : কেকা অধিকারী 

মৃত্যুর চেয়ে বিষ্ময়কর কিছু নেই : কেকা অধিকারী 

মৃত্যুর চেয়ে বিষ্ময়কর কিছু নেই : কেকা অধিকারী 

কেকা অধিকারী : নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। আমাকে হাসান ভাই 1 August মেসেজ দিয়েছিলেন সবাইকে করোনা ও বন্যাকালে  সাহায্যের আহ্বান জানিয়ে। জানতাম তাঁর নিজেরই সাহায্য দরকার। আমি কোন উত্তর দেইনি সে মেসেজের। ভেবেছিলাম কিছু টাকা পাঠিয়ে তারপর ফোন করব। প্রদীপকে তার নাম্বার,  টাকা গুছিয়ে দেই দেই করে দেয়া হয়নি বিকাশ করতে । অথচ রোজই ভেবেছি কাজটা করার কথা। এখন আর কোনদিন কাজটা করতে হবে না। ফোন করতে হবে না।  কেন আমি ম্যাসেজের উত্তরে একটা লাইন লিখলাম না? আমি কেন বিকাশ করলাম না? কিম্বা একটা মাত্র ফোন ?

একটু আগে জুলিয়া আপার মেসেজ Julia Ahmed পেলাম। জানলাম আজ ভোরে হাসান ভাই অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন। দুুই মেয়ে আর এক নাবালক ছেলেকে  পিছনে ফেলে। 

হাসান ভাই  Mahmud Hasan আমার সহকর্মী। একসাথে অনেক রিসার্চের কাজ করেছি জুলিয়া আপার নেতৃত্বে। আলাদাও করেছি আমি আর হাসান ভাই।  কাজ ভালো জানতেন। কিন্তু সংসার সামাল দিতে জানতেন না। ভুল হয়ে যেত তার। ভুলের মাসুল দিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

যদি হিসেব ঠিক থাকে বিগত দুই বছর যাবত কিছুটা প্যারালাইজড ছিলেন। হাত দিয়ে ঠিক মতো কোন কাজ করতে পারতেন না। ফলে কন্সাটেন্সির কাজও করা সম্ভব হতো না। অনলাইন পত্রিকায় কোনমতে আঙুল টিপে প্রতিবেদন লিখে আয়ের চেষ্টা করতেন মানুষটা। তা দিয়ে ছেলেকে নিয়ে বাঁচা সহজ হত না। বন্ধু সহকর্মীদের সহায়তা লাগতো তাঁর। বিষয়টা লুকাতেন না হাসান ভাই কখনও।  ফেসবুকে ওপেন পোস্টে সবাইকে মাঝে জানিয়ে দিতেন মোট কত টাকা সহায়তা পেলেন বন্ধুদের কাছ থেকে।  লিখতেন রিকসাওয়ালা থেকে শুরু করে কত সাধারণ মানুষ তাঁকে সাহায্য করেছেন। 

কিন্তু এভাবে কি জীবন চলে ঢাকা শহরে?  চলে চিকিৎসা খরচ? না চলে না। দুটি খেয়ে না খেয়ে প্রাণে বাঁচা হয়তো যায় কিছু দিনের জন্য। হাসান ভাই তাই  কিছু দিনই বেঁচে থাকলেন। কীই বা বয়স হয়েছিল তাঁর? বড়জোর ৫৫/৫৬ বছর। 

নেত্রকোণা বাড়ি তাঁর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কলেজে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছেন, চাকরি করেছেন। স্বাধীনচেতা মানুষটি পরে স্বাধীন ভাবে কাজ করাকেই বেছে নিয়েছিলেন। 

এমন কাজ করতে করতে আমার হাসান ভাইকে চেনা। মনে করতে পারছি না তাঁর সাথে কোন কাজটি করতে গিয়ে প্রথম পরিচয়। রাজনীতি সচেতন,  সমাজ সচেতন একজন মানুষ ছিলেন আমাদের হাসান ভাই। কোন এক জঙ্গি মোনার বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। সরল ছিলেন খুব, প্যাঁচ কষতে জানতেন না। চিন্তা ও কাজে ভীষণ সৎ। অপ্রয়োজনীয় একরোখাও। ডিভোর্সের পরে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারিননি এতোটুকুও। মসজিদের ইমামের সন্তান তিনি। মানুষকে ভালোবাসতে জানতেন। 

আমাকে শুধু বলতেন ছেলেটাকে কোন হস্টেল, অরফানেজে দেয়া যায় কি না। আমি পারি কি না ওর একটু দায়িত্ব নিতে। এসওএস শিশু পল্লী - ঢাকা ও খুলনায় চেষ্টা করেছিলাম। হয় তো হয়েও যেত। কিন্তু তাঁর সন্তান বাৎসল্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ম নীতি মানতে নারাজ। দেশের উন্নতির কথা খুব ভাবতেন যে মানুষটি তাঁর এভাবে চলে যাওয়া মেনে নেয়া যায় না। আহা আমাদের দেশ যদি তাঁর অসুস্থ জীবনের দায়িত্ব নিতে পারত!  কতো না ভালো হত যদি হাসান ভাই সব অস্থিরতা কাটিয়ে শেষ কটা দিন  একটু নিশ্চিন্ত  সুস্থির জীবন কাটাতে পারতেন! 

হাসান ভাই, ক্ষমা করেন। সেভাবে আপনার ভরসার জায়গা হতে পারলাম না।  ওপারে শান্তিতে থাকুন আপনি,  এপারে ভালো থাকুক আপনার নয়নমণি সন্তানেরা। আবারও দেখা হবে। সেদিন আপনার বাঁজখাই উচ্চ কন্ঠে আবারও বলতে ভুলবেন না যেন, 'দিদি, কেমন আছেন? "

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : কেকা অধিকারী 

পাঠকের মন্তব্য