প্রাণের ধরলা নদীর গপ্পো

প্রাণের ধরলা নদীর গপ্পো

প্রাণের ধরলা নদীর গপ্পো

যখন সেভেন এইটে পড়ি তখন দুরন্তপনার মধ্য দিয়ে কাটছিল সময়গুলো। খেলাধুলোর ফাঁকে ফাঁকে দল বেঁধে পুকুরে গোসল করা ছিল আনন্দঘন কিছু মূহুর্তের মধ্যে অন্যতম। তখন জেলায় সবচেয়ে বড় পুকুর হিসেবে পরিচিত ছিল সিও’র দীঘি। যা বর্তমানে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসের সামনের পুকুরটি। 

পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা দীর্ঘ পুকুরটিতে সাঁতার কেটে বিজয়ী হওয়ার জন্য দল বেঁধে এখানে গোসল করতে আসতাম সবাই। এই দুষ্টু প্রতিযোগিতার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ইন্টার স্কুল কম্পিটিশনে সাঁতার প্রতিযোগিতায় রংপুর ও রাজশাহী যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। এছাড়াও আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তৎকালিন ধরলা নদীর সিএন্ডবি ঘাটের পাশে গিয়ে প্রমত্তা ধরলা নদী সাঁতড়ে পাড়ি দেয়া। বেশ কয়েকবার এই চ্যালেঞ্জমূলক কাজটি করেছি আমাদের বন্ধুদেরকে নিয়ে। সেই ধরলা নদীর কাছাকাছি থাকার সুযোগ হয়েছিল বেশ কয়েকটি বছর। অনেক স্মৃতি এই ধরলা নদীকে ঘিরে। তখন যদি লেখালেখির অভ্যাসটি চালিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে এক একটা নদী নিয়ে এক একটা গল্প রচনা করা যেত। অনেক মানুষের সান্নিধ্য। কাছ থেকে মানুষগুলোকে দেখা ও জানার সুযোগ। তাদের জীবন-যাপন, রান্না-বান্না, বিচার-সালিশ, সামাজিক রীতি-নীতি, বিভিন্ন দুর্যোগকে স্থানীয়ভাবে মোকাবেলার কৌশল সবকিছু একটু একটু করে অনুধাবণ করতে পারছিলাম। কিন্তু টুকরো ঘটনাগুলো ডায়রিতে নোট করে রাখা হয়নি। ফলে অনেক নাম, অনেক স্থান ও অনেক ঘটনা স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। সবকিছু এখনো মনের চোখে দেখতে পাচ্ছি কিন্তু নামটা মুখে আসছে না। ধরলা নদীতে আমরা প্রথম কাজ শুরু করি ১৯৯৬ সালে। সেটা উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের আফতাবগঞ্জ, শিমুলতলি, নামানির চর ও বিন্দুরচরে। এই ৪টি গ্রামকে ঘিরে চলছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ। সে এক মহাযজ্ঞ। একসাথে সব ধরণের কাজ করার মানসে মুখস্ত করতে হল ‘এফপিএইচএনই।’ অর্থটা দাঁড়ায়, ফ্লাড প্রিপারডনেস, হেল্থ, নিউট্রেশন এন্ড এডুকেশন। বাপরে! যাক সেটা নাহয় পরে বললাম।

২০০১-২০০২ সালের কথা। একদিন ৭/৮জনের একটি টিমসহ পৌঁছলাম কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের ধরলা নদীর ঘাটে। তখন এখানে খুব একটা আসা হয়নি। ঘাটের নাম ‘কাউয়াহাগা।’ কেন যে অদ্ভুদ এই নামটি রাখা হয়েছে তা জানা হয়নি। কাউয়া হাগা ঘাট দিয়ে ফারাস দিয়ে পাড় হলাম ছোট্ট নদীটি। অপর পাড়ে গিয়ে খুঁজে বের করা হল ইউপি সদস্য আশরাফ ভাইকে। লোকটির সাথে কথা বলে বেশ ভাল লাগল। তিনি আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন তার বাড়ির পাশেই বড় ভাই মোসলেম মিয়ার বাড়িতে। সেখানেই নারী-পুরুষের দলটি অবস্থান করলাম। জায়গার নাম সারডোব। ইউনিয়ন হলোখানা। এখানে ৪টি গ্রামে আমাদের কাজ করার কথা। গ্রামগুলো হচ্ছে, সারডোব, ছাটকালুয়া, কাগজিপাড়া ও চর হলোখানা।

অল্পদিনের মধ্যে জায়গাটি আমাদের পছন্দ হয়ে গেল। এখানে একটি বাজার রয়েছে নাম আরডিআরএস বাজার। ছোট্ট বাজারটিতে মাটি কেটে কিছুটা বৃদ্ধি করা হল। এরপর কাগজি পাড়ায় কাজ করতে গিয়ে জানা গেল এখানে একটি ছিটমহল রয়েছে। যেখানে লোকবসতি নেই। অনেক চেষ্টা করেও ছিটের জায়গাটি কেউ দেখাতে চাইল না। পরে এখানে রাঙামাটি গ্রামের লোকজনের সাথে কথা হল। বেশ চমৎকার গ্রামের নামটি। জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের একটি ছোট্ট গ্রাম রাঙামাটি।

সারডোবে থাকতে থাকতে ছোট্ট একটি টিম সড়িয়ে নেয়া হল সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নে। থাকার জায়গা ঠিক করা হল সর্দারপাড়ায়। সেটি এখন ধরলা নদীর বুকে মিশে গেছে। সর্দারপাড়ার সাথে ছিল চৌধুরীর হাট। সেটিও এখন ইতিহাস। এখানকার ৩/৪টি গ্রাম ধরলা নদীর ভাঙনে বিলিন হয়ে গেছে। পরে আমরা সড়ে গেলাম বড়াইবাড়ির দিকে। বর্তমানে ভোগডাঙ্গা ইউনিয়ন থেকে কুমরপুর বাজার হয়ে ভাঙ্গামোড় যেতে পাটাধোয়া ব্রীজের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে ছিল গ্রামগুলি। বর্তমানে তা আর নেই।

এখানে কাজ শেষে আমরা দক্ষিণে আরো সড়ে গিয়ে জায়গা নিলাম ভোগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন পাটেশ্বরীতে। দ্বিতীয় টিম ধরলা নদীর পশ্চিম প্রান্তে হলোখানা ইউনিয়নের হেমেরকুটি গ্রামে অবস্থান নিল। পাটেশ্বরীতে থাকাকালিন ধরলা ব্রীজ পর্যন্ত কয়েকটি ছোট্ট গ্রামকে ঘিরে কাজ করা হচ্ছিল। গ্রামগুলো হচ্ছে, নন্দ দুলালের ভিটা, জগমোহনের চর, পাঙ্গারচর, কুড়ারপাড়, সর্দারপাড়া, কাচিরচর, মাঝেরচর প্রমুখ। 
ধরলার অপর পাড়ে কাজ করা হচ্ছিল হলোখানা ইউনিয়নের লক্ষীকান্ত, আঠারঘরিয়া, বারোঘড়িয়া, হেমেরকুটি, চর বড়াইবাড়ি, চর সুভারকুটি প্রমুখ গ্রামে।

এভাবে ধরলা নদীকে ঘিরে সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি থেকে হলেখানা ও ভোগডাঙ্গায় কাজ শেষে দলসহ সড়ে এলাম পৌরসভা ও পাঁচগাছি ইউনিয়নে। পৌরসভায় আমাদের ৪টি গ্রাম ছিল। গ্রামগুলো হলো, ভেলাকোপা, নামা ভেলাকোপা, টাপু ভেলাকোপা ও পূর্বচর ভেলাকোপা। এছাড়াও ধরলা নদীর অপর পাড়ে পাঁচগাছী ইউনিয়নে যেসব গ্রামে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে, মাঝেরচর, কাচিরচর, উত্তর নওয়াবশ, দক্ষিণ নওয়াবশ, ছড়ারপাড়, চৌধুরীপাড়া, হাজানির কুড়া, কদমতলা, আরাজি কদমতলা, রেলবাজার, চর গোবিন্দপুর প্রমুখ। এরপর মোগলবাসা ইউনিয়নে এবং অপরপাড়ে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নেও কাজ করা হয়েছিল। মোগলবাসার গ্রামগুলো হলো, চরসিতাইঝাড় এলাকার গাড়িয়ালপাড়া, বাহাদুরপাড়া, বালাবাড়ী, কৃঞ্চপুর, রেডক্রিসেন্ট পাড়া, তেলীপাড়া, মুন্সিপাড়া, ফকির মোহাম্মদ প্রমুখ। 

বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রামগুলো হচ্ছে, সরদারপাড়া, কালিগঞ্জ, বালাডোবা, সরকারপাড়া, মাস্টারপাড়া, পশ্চিম বেগমগঞ্জ, পোড়ারচর, লালচান্দের গ্রাম প্রমুখ।  

এরপর ধরলা নদীর সাথে উলিপুরের বুড়াবুড়ি ইউনিয়ন শেষে হাতিয়া ইউনিয়নেও বেশ কয়েকটি গ্রামে কাজ করা হয়েছে। এসব এলাকার নামগুলো ও নদীর বুকে অবস্থিত চরগুলোর নাম আমি সংরক্ষণে রেখেছি। ইচ্ছে আছে নদনদী ও চর নিয়ে একটা লেখা প্রকাশ করার। যাতে চর সম্পর্কে, নদী সম্পর্কে, তাদের জীবন যাপন সম্পর্কে মানুষ একটা প্রাথমিক ধারণা পেতে পারে। আমার এ লেখার মাধ্যমে কারো যদি কোন উপকারে লাগে তাতেই আমি খুশি। সেই কাজটি শুরু করেছি। নানান ব্যস্ততার কারণে সেটি শেষ করা কতটুকু সম্ভব হবে জানি না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি আপনাদের ভালবাসায় সেটি শেষ করতে পারবো। শুভ রাত্রী বন্ধুরা।

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিঙ্ক : Humayun Kabir Surjo
লেখক : সাংবাদিক 

পাঠকের মন্তব্য