এক প্রকার 'বাধ্য হয়েই' জন্মভূমি ছাড়লেন ড. বিজন

এক প্রকার 'বাধ্য হয়েই' জন্মভূমি ছাড়লেন ড. বিজন

এক প্রকার 'বাধ্য হয়েই' জন্মভূমি ছাড়লেন ড. বিজন

ড. বিজন কুমার শীল, বাংলাদেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে নামটি বেশ পরিচিত। কারণ ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর পরই তা সহজে শনাক্তকরণ কিট আবিষ্কারের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন কিট উদ্ভাবনও করেন। কিন্তু নানা কারণে সেটা আজও উৎপাদনে যেতে পারেনি।

সেই কষ্ট চেপে রেখে এবং ওয়ার্ক পারমিট পেলে ফের বাংলাদেশ তথা নিজের জন্মভূমিতে ফেরার প্রত্যাশা নিয়ে আজ রোববার সিঙ্গাপুর গেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ বিজ্ঞানী। সকাল সাড়ে ৭টার ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুর চলে গেছেন বলে জানা গেছে। তবে সাময়িকভাবে গেলেন, নাকি একেবারে চলেন গেলেন- সেটা তিনি নিজেও জানেন না।

এদিকে, বাংলাদেশ ছাড়ার আগের দিন গতকাল শনিবার রাতে দেশের একটি জাতীয় গণমাধ্যমকে নিজের নানা অভিব্যক্তির কথা জানান।

নিয়মিত বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এবারের যাওয়াটা যেন অন্যরকম লাগছে। গলা ভারি হয়ে আসে ড. বিজনের। বলেন, এবার সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে কেন জানি বিষণ্ন ও খানিকটা কষ্ট অনুভূত হচ্ছে। তবে তিনি নিজেও জানেন না- একেবারে চলে যাচ্ছেন, না সাময়িকভাবে যাচ্ছেন। তবে বাংলাদেশে ফিরে আসতে চান তিনি।

ড. শীল বলছেন, ‘সব সময়ই তো আমি আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম। কিন্তু এবার যাওয়ার আগে কেন যেন মনটা বিষণ্ন লাগছে। খুব কষ্ট অনুভব করছি।’ তিনি বলেন, তার ওয়ার্ক পারমিট যে হবে না- সেটা কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তার মতে, কষ্টের কারণটা হয়তো অন্যখানে। আর সেটা হলো- এত মানসম্পন্ন একটা কিট উদ্ভাবন করলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার অনুমোদন পেলেন না। অল্প সময়ের মধ্যে হয়তো ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে যাবেন- এমন একটা ধারণা ভেতরে ভেতরে জন্ম নিয়েছিল।

জানা যায়, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ড. বিজনের ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ট্যাক্সসহ যাবতীয় কাগজপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে। তার পদের জন্য নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দিতে বলা হয়েছিল। সেটাও সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়া ওয়ার্ক পারমিট পেলে বাংলাদেশের বাইরে থেকে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তার পরই আসতে হবে বলে জানানো হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এক প্রকার ‘বাধ্য হয়েই’ জন্মভূমি ছাড়লেন ড. বিজন।

তিনি বলেন, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তার ওয়ার্ক পারমিটের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তবে যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ‘প্রক্রিয়া বা আইনের প্রতি আমি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।’

‘বিশেষ কারণে আমি অন্য একটি ভৌগলিক অংশের বাসিন্দা। কাগজপত্র অনুযায়ী আমি সিঙ্গাপুরের নাগরিক। কিন্তু আমার জন্মভূমি তো বাংলাদেশ। যে দেশে জন্ম, বেড়ে উঠা, কাদামাটির গন্ধ- সেই দেশের ওয়ার্ক পারমিট পাব না, এটা কল্পনাও করতে চাই না। আর বিষয়টা তো এমন নয় যে, অর্থের জন্য চাকরি করতে এসেছি আমি। এর চেয়ে ৫-৭ গুণ বেশি সুবিধা নিয়ে সিঙ্গাপুর বা অন্য কোনো দেশে কাজ করা আমার জন্য মোটেই কঠিন কিছু নয়।

কিন্তু জন্মভূমির জন্য আমি কাজ করতে চাই। অর্থ-সম্পদের তো আর আমার দরকার নেই। যাই হোক, ওয়ার্ক পারমিট যদি আমাকে দেওয়া হয়, তাহলে সেই কাগজপত্র সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা দিতে হবে। তারা এমপ্লয়মেন্ট ভিসা দেবে। হয়তো আবার ফিরে আসব প্রিয় জন্মভূমিতে,’ বলছিলেন ড. বিজন।

তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে উদ্ভাবিত অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি কিট রয়ে গেল। যদি অনুমোদন পায়, তাহলে উৎপাদনে যেতে পারবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ‘অবশ্য কিছু কারণে আমার উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে। তবে সেটা সম্ভব না হলেও সিঙ্গাপুর থেকেই সহায়তা করার চেষ্টা করব।’

প্রখ্যাত এ বিজ্ঞানীর আক্ষেপ, পৃথিবীতে সবার আগে কিট উদ্ভাবন করলো বাংলাদেশ, কিন্তু বাজারে আনা সম্ভব হলো না। তার সারাজীবন এই দুঃখ থাকবে।

তবে তার মতে, সুসংবাদ হলো যে, কিটের পেটেন্ট করে ফেলেছেন। ফলে তাদের উদ্ভাবিত কিট ইউনিক, যা চাইলেই কোনো দেশ তৈরি করতে পারবে না। শুরু থেকেই কিছু দেশ তাদের মাটিতে কিট উৎপাদন করতে চায়। সেই চাহিদা এখনো আছে।

‘দেখুন, খুব সাধারণ একজন মানুষ আমি। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ বলে বোঝাতে চাই না। সত্যি করে বলছি, অন্য কোনো দেশে এই কিট উৎপাদন হোক- তা আমরা কখনো চাইনি। স্যার (ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী) চান, দেশের মানুষ সবচেয়ে কম মূল্যে এই কিটের সুবিধা পাক। কিন্তু অনুমোদন যদি শেষ পর্যন্ত নাই মেলে, তাহলে হয়তো বিকল্প চিন্তা করা ছাড়া উপায় থাকবে না,’ বলেন ড. বিজন কুমার শীল।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে জন্ম, বেড়ে উঠা এবং লেখাপড়া করলেও চাকরির সুবাধে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ বিজ্ঞানী। আর সিঙ্গাপুরে দ্বৈত নাগরিকের কোনো অনুমোদন নেই। বাধ্য হয়েই জন্মভূমির নাগরিকত্ব ছাড়তে হয় তাকে। ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গণবিশ্ববিদ্যালয় ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের হয়ে কাজ করছিলেন তিনি।

পাঠকের মন্তব্য